রবিবার (২০ জুলাই) থেকে গাজাজুড়ে ইসরায়েলি হামলায় অন্তত ৮৪ জন ফিলিস্তিনি নিহত ও ২ শতাধিক আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ৭৩ জনই ত্রাণ সংগ্রহ করতে যাওয়া মানুষ বলে জানিয়েছে গাজায় থাকা চিকিৎসা সূত্রগুলো।
গাজার উত্তরাঞ্চলের জিকিম ক্রসিং এলাকায় যারা সাহায্যের আশায় গিয়েছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র একজন এক বস্তা আটা নিয়ে ফিরে এসেছে। বাকি প্রায় ৩০ জনকে প্রাণহীন বা গুরুতর আহত অবস্থায় ঘোড়ার গাড়িতে করে আল-শিফা হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। এ হামলায় হতাহতের সংখ্যা পরে আরও বেড়েছে।
উত্তর গাজার অন্য একটি ত্রাণকেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি গোলাবর্ষণে ৯ জন নিহত হয়েছেন, আহত হয়েছেন আরও ৫৫ জন। অন্যদিকে, দক্ষিণ গাজার রাফাহ শহরের উত্তরে একটি ত্রাণকেন্দ্রের কাছে ইসরায়েলি হামলায় আরও পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন।
এদিকে গাজা শহরের আল-শিফা হাসপাতালে অপুষ্টিজনিত কারণে আরও দুই ফিলিস্তিনির মৃত্যু হয়েছে, এর মধ্যে মাত্র ৩৫ দিন বয়সী একটি নবজাতক রয়েছে।
অনলাইন ও আল-জাজিরার দ্বারা যাচাই করা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, দক্ষিণ রাফার শাকুশ এলাকায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল পরিচালিত গাজা হিউম্যানিটারিয়ান ফাউন্ডেশন ত্রাণ বিতরণকেন্দ্রে খাদ্যের খোঁজে আসা ফিলিস্তিনিদের ওপর মার্কিন নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা মরিচ গ্যাস ছিটিয়ে দিচ্ছে। এদিকে পশ্চিম তীরের হেবরনেও ব্যাপক ধরপাকড় চালাচ্ছে ইসরায়েল। বুলডোজার দিয়ে সেখান বসতিদের উচ্ছেদ করে দিচ্ছে। এ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত ত্রাণকেন্দ্রে ৯০০ ফিলিস্তিনি প্রাণ হারান।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় ইসরায়েলের হামলায় অন্তত ১৩০ জন নিহত এবং ৪৯৫ জন আহত হয়েছেন। এর মাধ্যমে ইসরায়েলি আগ্রাসন শুরুর পর থেকে মোট মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৮ হাজার ৮৯৫ জনে এবং আহতের সংখ্যা ১ লাখ ৪০ হাজার ৯৮০ জনে।
গাজায় জাতিগত নির্মূলের পরিকল্পনা করেছে ইসরায়েল
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক গিদিওন লেভি অভিযোগ করেছেন, গাজা উপত্যকায় ‘জাতিগত নির্মূল’ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করেছে ইসরায়েল সরকার।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম হারেটজে প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে লেভি লিখেছেন, ‘এই পরিকল্পনা হঠাৎ করে আসেনি। কেউ এটা ভেবেছে, তার পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা হয়েছে, বিকল্প প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে- পুরো গাজা খালি করার পথ থেকে শুরু করে ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনাও ছিল। আর এই সবকিছু হয়েছে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কনফারেন্স কক্ষে বসে, যেখানে আলোচনার বিবরণ রাখা হয়েছে, সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে।’
তিনি বলেন, ‘প্রতিশোধের যুদ্ধে ইসরায়েল নামার পর এবারই প্রথম এটা স্পষ্ট যে, ইসরায়েলি সরকারের একটি সুস্পষ্ট পরিকল্পনা রয়েছে- আর সেটা ব্যাপক ও ভয়াবহ। এখন আর এই যুদ্ধকে লক্ষ্যহীন বলা যাবে না। এটা এখন একটি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত যুদ্ধ এবং সেই উদ্দেশ্য অপরাধমূলক। সেনাপ্রধানদেরও আর বলা যাবে না যে, তাদের সৈন্যরা অকারণে প্রাণ হারাচ্ছে- তারা জাতিগত নির্মূলের যুদ্ধে প্রাণ দিচ্ছে।’
লেভির দাবি, ইসরায়েলি সেনাবাহিনী গাজার পুরো জনগোষ্ঠীকে জোরপূর্বক উপত্যকার দক্ষিণাঞ্চলে একটি নির্ধারিত ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় সরিয়ে নিতে চায়। তিনি এটিকে তিনি এটিকে ‘কনসেনট্রেশন এলাকা (concentration zone)’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো গাজা থেকে জনগণকে জোরপূর্বক স্থানান্তরের চেষ্টাকে আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোও ইসরায়েলের সামরিক কার্যক্রম নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে।
সূত্র: আল-জাজিরা