ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন- দেশের কৃষক, দুগ্ধ খাত ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থে কোনো আপস নয়। রাশিয়ার কাছ থেকে তেল আমদানি অব্যাহত রাখার জেরে ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপকে কেন্দ্র করে ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে।
শুল্ক কার্যকর হতে বাকি মাত্র ২০ দিন, এই অল্প সময়ের মধ্যে ভারতকে কঠিন কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত নিতে হবে- ছাড় দেবে, নাকি নিজের অবস্থানে অনড় থেকে পাল্টা পদক্ষেপে যাবে। পরিস্থিতি ক্রমেই একটি সম্ভাব্য বাণিজ্যযুদ্ধের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, যার প্রভাব পড়তে পারে ভারতের অর্থনীতি, রপ্তানি খাত এবং বৈশ্বিক অবস্থানের ওপর।
যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতের রপ্তানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। তবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, দেশের কৃষক, দুগ্ধ খাত এবং মৎস্যজীবীদের স্বার্থে তিনি কোনো রকম আপস করবেন না।
দিল্লিতে এক সরকারি অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে মোদি বলেন, ‘আমাদের কাছে কৃষকদের কল্যাণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ভারত কখনো কৃষক, দুগ্ধ খাত ও মৎস্যজীবীদের স্বার্থ নিয়ে আপস করবে না। আমি জানি, ব্যক্তিগতভাবে এর জন্য আমাকে বড় মূল্য দিতে হতে পারে। তবু আমি পিছপা হব না।
যদিও তিনি তার বক্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র বা শুল্ক বৃদ্ধির বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি, তবুও তার কথায় ভারতের অবস্থান স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প প্রশাসনের দাবি, ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল কেনা অব্যাহত রেখেছে এবং এর ফলে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন ইউক্রেন যুদ্ধে অর্থনৈতিকভাবে সুবিধা পাচ্ছেন। এই কারণ দেখিয়ে ভারতকে ‘শাস্তি’ দিচ্ছেন বলে ট্রাম্প জানান। এর আগে ভারতীয় পণ্যের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫০ শতাংশে। এই শুল্ক কার্যকর হবে আগামী ২৭ আগস্ট থেকে, অর্থাৎ ভারতের হাতে সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য রয়েছে মাত্র ২০ দিন।
এই শুল্কের ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে ভারতের শ্রমনির্ভর রপ্তানি খাত। বিশেষ করে পোশাক, গয়না ও হস্তশিল্প। রপ্তানিকারকরা বলছেন, তারা সর্বোচ্চ ১০ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক সহ্য করতে পারেন, কিন্তু ৫০ শতাংশ শুল্কে তাদের যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।
বিশ্লেষকদের মতে, এই শুল্কের ফলে ভারতের প্রায় ৮৬ দশমিক ৫০ বিলিয়ন ডলারের বার্ষিক রপ্তানি হুমকির মুখে পড়বে। যুক্তরাষ্ট্রের বাজার ভারতের সবচেয়ে বড় রপ্তানি গন্তব্য, যা দেশের মোট রপ্তানির ১৮ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ২ শতাংশ। যদি এই প্রবাহে ছেদ পড়ে, তাহলে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপ ভারতের রপ্তানি, জিডিপি ও বাজারে বড় ধাক্কা আনতে পারে। ইতোমধ্যে ভারতের শেয়ারবাজারে পতন দেখা দিয়েছে, উদ্বেগ বেড়েছে শিল্প মহলে।
ভারত বলছে, এই শুল্ক ‘অন্যায়’ ও ‘অযৌক্তিক’। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে পাল্টা ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এই সংকটের মধ্যে মোদি শিগগিরই চীন সফরে যাচ্ছেন এবং ব্রিকস দেশগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের চেষ্টাও চলছে। এখন দেখার বিষয়, আগামী ২০ দিনে দিল্লি কী কৌশল নেয়- বাণিজ্যযুদ্ধ এড়ায়, না আরও রণংদেহী হয়ে ওঠে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব দাম্মু রবি বলেছেন, ‘এই শুল্ক বৃদ্ধির কোনো যৌক্তিকতা নেই। এটা সাময়িক সমস্যা। আমরা বিশ্বাস করি, বিশ্ব একসঙ্গে এই সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করবে।’ তিনি আরও বলেন, ভারত তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত।
এর মধ্যেই জানা গেছে, গত কয়েক মাসে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাঁচ দফা বাণিজ্য আলোচনা হয়েছে। কিন্তু তা ব্যর্থ হয়েছে। মূলত কৃষি ও দুগ্ধ খাত ভারতের মার্কেট খুলে দেওয়ার বিষয়ে এবং রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ করার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে মতবিরোধ থেকেই গেছে। এখন আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল আবার ভারতে আসছে আলোচনার জন্য। এই আলোচনা ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কের ভবিষ্যতের দিক নির্ধারণ করতে পারে।
এই সংকটের মধ্যে ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেও চাপ বাড়ছে। কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে বলেন, ‘ভারতের জাতীয় স্বার্থই সবচেয়ে বড়। যদি কেউ আমাদের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতির কারণে শাস্তি দিতে চায়, তবে তারা ভারতের শক্তি সম্পর্কে কিছুই জানে না।’ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী একে ‘অর্থনৈতিক ব্ল্যাকমেইল’ বলে অভিহিত করেছেন। মোদি সরকারকেও কংগ্রেস সতর্ক করে বলেছে- জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হলে কড়া পদক্ষেপ নিতে হবে।
এই ঘোষণার পর পরই ভারতের শেয়ারবাজার শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ পড়ে গিয়ে তিন মাসের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছেছে। রপ্তানিমুখী শিল্পগোষ্ঠীগুলোও এই সিদ্ধান্তে উদ্বিগ্ন। পোশাক রপ্তানিকারক সংগঠনের চেয়ারম্যান সুধীর সেকরি বলেছেন, ‘এত বড় শুল্ক হঠাৎ করে চাপিয়ে দেওয়া হলে আমাদের খাত টিকতে পারবে না। সরকার থেকে আমরা ত্রাণ প্যাকেজ বা আর্থিক সহায়তা চাইছি।’ ভারতের অন্যতম বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠান রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, এই ধরনের ভূ-রাজনৈতিক ও শুল্কসংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক বাণিজ্যপ্রবাহে বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
এই সংকটময় মুহূর্তে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী মোদি শিগগিরই চীন সফরে যাচ্ছেন। ২০১৮ সালের পর এই প্রথমবার তিনি বেইজিং সফর করবেন। অনেক বিশ্লেষকের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে উত্তেজনার মধ্যেই মোদি সরকারের এই পদক্ষেপ ভারতের কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার একটি অংশ। এদিকে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা জানিয়েছেন, তিনি ব্রিকস দেশগুলোর মধ্যে এই শুল্কনীতির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণের বিষয়ে আলোচনা করবেন এবং এ বিষয়ে মোদি ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিংয়ের সঙ্গে তার ফোনালাপের পরিকল্পনা রয়েছে।
২০১৯ সালেও একবার ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শুল্কসংক্রান্ত উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল, যখন ট্রাম্প প্রশাসন ভারতের জেনারেলাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্স (জিএসপি) সুবিধা প্রত্যাহার করে। সেই সময় ভারতও পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছিল ২৮টি মার্কিন পণ্যের ওপর। এবারও কি ভারত সেই পথে হাঁটবে? এখনো সরকারিভাবে কিছু ঘোষণা না এলেও সরকারের ভেতরে পাল্টা ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা চলছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
সব মিলিয়ে ভারতের সামনে এখন দুটি প্রধান পথ খোলা রয়েছে- একদিকে রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি আমদানি কিছুটা সীমিত করা, যাতে যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমে। অন্যদিকে নিজের অবস্থানে অনড় থেকে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা এবং প্রয়োজনে পাল্টা শুল্ক আরোপের পথে যাওয়া। এই মুহূর্তে সময় খুবই অল্প, মাত্র ২০ দিন। এর মধ্যেই সিদ্ধান্ত নিতে হবে দিল্লিকে।
এই পরিস্থিতি ভারতের জন্য শুধু অর্থনৈতিক নয়, কূটনৈতিক দিক থেকেও এক অগ্নিপরীক্ষা। মোদি সরকারের কৌশল এখন শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি নয়, বৈশ্বিক বাণিজ্য ও কূটনীতিতেও বড় প্রভাব ফেলবে। তাই গোটা বিশ্বের নজর এখন ভারতের পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই।
সূত্র: রয়টার্স, বিবিসি