অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্থনি আলবানিজ ঘোষণা করেছেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে দেশটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেবে। সোমবার (১১ আগস্ট) তিনি জানান, নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) অধিবেশনে এ ঘোষণা দেওয়া হবে।
ক্যানবেরায় সংবাদ সম্মেলনে আলবানিজ বলেন, “দুই-রাষ্ট্র সমাধানই মধ্যপ্রাচ্যে সহিংসতার চক্র ভাঙার এবং গাজায় সংঘাত, ভোগান্তি ও অনাহার শেষ করার মানবজাতির শেষ আশা।”
অস্ট্রেলিয়ার এই সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এলো যখন কানাডা, ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যও আগামী মাসের বৈঠকে প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, যোগ দিচ্ছে জাতিসংঘের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য রাষ্ট্রের সঙ্গে। প্রায় এক সপ্তাহ আগে, ইসরায়েলের গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে লক্ষাধিক অস্ট্রেলিয়ান সিডনি হারবার ব্রিজে মিছিল করেছিলেন।
প্রতিবাদের পরদিন অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং এবিসিকে বলেন, “ঝুঁকি আছে—একসময় হয়তো স্বীকৃতির মতো কোনো প্যালেস্টাইন অবশিষ্টই থাকবে না।” তিনি আরও বলেন, “আমি এক বছরেরও বেশি সময় ধরে বলে আসছি, এটা ‘কখন’–এর প্রশ্ন, ‘হবে কি না’–এর নয়।”
বিরোধী দলের সমালোচনা
অস্ট্রেলিয়ার প্রধান বিরোধী দল লিবারেল পার্টি এই পদক্ষেপের সমালোচনা করে বলেছে, এটি যুক্তরাষ্ট্র-অস্ট্রেলিয়ার ঘনিষ্ঠ মিত্রতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং দুই দলের দীর্ঘদিনের ঐকমত্য ভেঙে দিয়ে লিবারেল পার্টি জানায়, হামাস গাজার নিয়ন্ত্রণে থাকা অবস্থায় ফিলিস্তিনকে কোনো স্বীকৃতি দেওয়া হবে না।
লিবারেল পার্টির নেতা সুসান লে বলেন, “আজকের ঘোষণায়ও সত্য এই যে, বন্দিরা এখনো গাজার টানেলে, আর হামাস এখনো জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ করছে—তবুও আলবানিজ সরকার প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিচ্ছে। এতে হামাসের অন্যতম কৌশলগত লক্ষ্য পূরণ হতে পারে।”
গ্রীন পার্টি ও সমর্থকদের প্রতিক্রিয়া
অস্ট্রেলিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম দল গ্রীনস এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানালেও বলেছে, এটি জনগণের জোরালো আহ্বান পূরণ করে না। দলের পররাষ্ট্রবিষয়ক মুখপাত্র ডেভিড শুব্রিজ বলেন, “লাখো মানুষ রাস্তায় নেমেছে, শুধু গত সপ্তাহান্তে সিডনিতে ছিল ৩ লাখ, যারা ইসরায়েলের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা ও অস্ত্র বাণিজ্য বন্ধের দাবি জানিয়েছে—কিন্তু সরকার এখনো সেই আহ্বান উপেক্ষা করছে।”
অস্ট্রেলিয়ান প্যালেস্টাইন অ্যাডভোকেসি নেটওয়ার্ক (এপ্যান) একে “রাজনৈতিক অজুহাত” আখ্যা দিয়ে বলেছে, এটি ইসরায়েলের গণহত্যা ও বর্ণবৈষম্য অব্যাহত রাখতে সুযোগ দিচ্ছে এবং অস্ট্রেলিয়ার ইসরায়েলি যুদ্ধাপরাধে সহযোগিতাকে আড়াল করছে।
প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের ওপর শর্ত
আলবানিজ জানান, স্বীকৃতির সিদ্ধান্ত প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষের (পিএ) কাছ থেকে পাওয়া অঙ্গীকারের ওপর ভিত্তি করে নেওয়া হয়েছে—যার মধ্যে রয়েছে ইসরায়েলের শান্তি ও নিরাপত্তায় টিকে থাকার অধিকার স্বীকার, নিরস্ত্রীকরণ এবং সাধারণ নির্বাচন আয়োজনের প্রতিশ্রুতি।
১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে প্যালেস্টাইন কর্তৃপক্ষ পশ্চিম তীরের কিছু অংশে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করছে, তবে ২০০৬ সালের পর থেকে কোনো সংসদীয় নির্বাচন হয়নি। ২০০৭ সালে হামাস গাজা দখল করার পর থেকে এ অঞ্চলটি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
আলবানিজের ভাষায়, এই পদক্ষেপ “হামাসকে বিচ্ছিন্ন, নিরস্ত্র এবং একবারে অঞ্চল থেকে বিতাড়িত করার পাশাপাশি প্যালেস্টাইনের জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের সুযোগ তৈরি করবে।”
নিউজিল্যান্ডের সিদ্ধান্ত আগামী মাসে
এদিকে, নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স সোমবার (১১ আগস্ট) বলেন, আগামী সেপ্টেম্বর মাসে তার দেশের মন্ত্রিসভা আনুষ্ঠানিকভাবে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে।
তিনি জানান, “আমাদের কিছু ঘনিষ্ঠ অংশীদার প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, কিছু দেয়নি। নিউজিল্যান্ডের স্বাধীন পররাষ্ট্রনীতি রয়েছে এবং আমরা আমাদের নীতি, মূল্যবোধ ও জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেব।”
জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্য দেশের মধ্যে ইতোমধ্যে ১৪৭টি প্যালেস্টাইনকে স্বীকৃতি দিয়েছে, যা বিশ্বের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ দেশ ও জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের এই ঘোষণা আসে কয়েক ঘণ্টা পর, যখন ইসরায়েলি হামলায় গাজা সিটিতে আল জাজিরার পাঁচজন সাংবাদিক নিহত হন। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, ইসরায়েলের যুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ৬১,৪৩০ জন নিহত হয়েছেন এবং অবরোধের কারণে অনাহারে প্রায় ২১৭ জন, যার মধ্যে ১০০ শিশু, মারা গেছে। সূত্র: আল জাজিরা
মাহফুজ/