গত কয়েক সপ্তাহে অন্তত চারবার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে ফোন করার চেষ্টা করেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু প্রতিবারই মোদি তার ফোন ধরতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছে জার্মান দৈনিক ফ্রাঙ্কফুর্টার অ্যালগেমাইনে। পত্রিকাটি বলছে, এই ঘটনাই প্রমাণ করে মোদির ‘‘শুল্ক ইস্যুতে অসন্তোষের গভীরতা’’।
ট্রাম্পের এই চেষ্টা আসে এমন সময়ে যখন তার প্রশাসন ভারতকে ৫০ শতাংশ শুল্কের মুখে দাঁড় করায়। যা আগামীকাল বুধবার থেকে কার্যকর হবে। একমাত্র ব্রাজিল ছাড়া অন্য কোনো দেশের ক্ষেত্রে এত বেশি শুল্ক নির্ধারণ করা হয়নি।
২৫ বছরের চর্চায় গড়ে ওঠা ভারত-আমেরিকা সম্পর্ক হোঁচট খায় ট্রাম্পের সময়েই, বিশেষ করে ভারতকে বাণিজ্য ঘাটতির জন্য নিশানা বানানোর পর। রাশিয়ার কাছ থেকে ভারতীয় তেলের আমদানির কারণেও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয় ওয়াশিংটন।
বার্লিনভিত্তিক গ্লোবাল পাবলিক পলিসি ইনস্টিটিউটের পরিচালক থরস্টেন বেনার এক্স-এ পোস্ট করে লেখেন, “ফ্রাঙ্কফুর্টার অ্যালগেমাইনে দাবি করেছে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প চারবার ফোন করেছেন, কিন্তু মোদি ধরেননি।’’
গত ৩১ জুলাই ট্রাম্প মন্তব্য করেছিলেন, “ভারত রাশিয়ার সঙ্গে যা খুশি করুক। তাদের মৃত অর্থনীতিকে একসঙ্গে ডুবিয়ে দিতে পারে।” এর জবাবে ১০ আগস্ট মোদি পাল্টা বলেন, ভারত বিশ্বের শীর্ষ তিন অর্থনীতির একটি হওয়ার পথে অগ্রসর হচ্ছে।
ফ্রাঙ্কফুর্টার অ্যালগেমাইনে লিখেছে, মোদি ট্রাম্পের কর্মকাণ্ডে আঘাত পেয়েছেন এবং ট্রাম্প সাধারণত অন্যান্য দেশের মার্কিন বাজার-নির্ভরতার সুযোগ নিলেও, মোদি তাতে সায় দেননি। বরং ট্রাম্পের সঙ্গে সহযোগিতা বজায় রেখেও ভারতের অর্থনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করেছেন। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ট্রাম্প বহুবার ফোন করে চাপ দেওয়ার চেষ্টা করলেও মোদি তা প্রত্যাখ্যান করেছেন।
পত্রিকাটি বলছে, মোদির সতর্কতার কারণ স্পষ্ট। ট্রাম্প এর আগেও ভিয়েতনামের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা করা একটি বাণিজ্য চুক্তি মাত্র একটি ফোনালাপে নতুনভাবে সাজিয়ে, সামাজিক মাধ্যমে “চুক্তি হয়ে গেছে” বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। ফ্রাঙ্কফুর্টার অ্যালগেমাইনে মন্তব্য করেছে—“মোদি একই ফাঁদে পড়তে চান না।”
নিউইয়র্কের নিউ স্কুল এর ভারত-চীন ইনস্টিটিউটের সহ-পরিচালক মার্ক ফ্রেজার বলেছেন, “আমেরিকার ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল ব্যর্থ হচ্ছে। এতে ভারতের ওপর নির্ভর করে চীনকে ঠেকানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু ভারত কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে চীনের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে রাজি হয়নি।”
মোদি-ট্রাম্পের সর্বশেষ ফোনালাপ
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ১৭ জুন ট্রাম্পের অনুরোধে মোদি তার সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এরপর জি-৭ সম্মেলনে কানাডায় দেখা হওয়ার কথা থাকলেও ট্রাম্প আগে ফিরে যান। তাই ১৭ জুলাই আবার ফোনে দুই নেতার প্রায় ৩৫ মিনিট কথা হয়।
সে সময় ট্রাম্প কাশ্মীরের পাহালগামে সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের জন্য সমবেদনা জানান এবং সন্ত্রাসবিরোধী সমর্থন দেন। মোদি ফোনালাপে বিস্তারিত জানান ভারতের ‘অপারেশন সিন্ধুর’ বিষয়ে।
কিন্তু ট্রাম্প দাবি করেন, তার মধ্যস্থতা ও বাণিজ্য প্রস্তাবেই নাকি ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতিতে রাজি হয়েছিল। নয়াদিল্লি বহুবারই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, মোদি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, “ভারত কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের কোনো মধ্যস্থতা মেনে নেয়নি এবং নেবে না। ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধবিরতির আলোচনা হয়েছিল দুই দেশের মধ্যে সরাসরি, পাকিস্তানের অনুরোধেই।”
চীনের ওপর শুল্ক আরোপের পরও ট্রাম্প আশা করেছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিন পিং তাকে ফোন করে শুল্কের বিষয়ে দফারফা করবেন। কিন্তু শি তাতে কোনো সাড়া দেন নি। সূত্র: ইন্ডিয়া টুডে
মাহফুজ/