পশ্চিম তীরের দক্ষিণে অবৈধ ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে নতুন তিনটি ফাঁড়ি গড়ে তুলেছে। গত সোমবার ফিলিস্তিনি এক অধিকার গোষ্ঠী এ তথ্য জানিয়েছে।
বেদুইনদের অধিকার রক্ষায় কাজ করা ‘আল-বাইদার অর্গানাইজেশন’ এক বিবৃতিতে বলেছে, হেবরনের বিরিন গ্রামের পূর্ব দিকের জমিতে বসতি স্থাপনকারীরা কয়েক ডজন মোবাইল হোম বসিয়েছে। এর ফলে কার্যত তিনটি নতুন সাইট তৈরি হয়েছে।
সংস্থাটি জানায়, এ সম্প্রসারণের কারণে বিরিন, পাশের বনি নাইম এবং হেবরন শহরের অংশবিশেষসহ প্রায় ৬ হাজার ৪০০ দুনুম জমি দখল হয়েছে। এটি প্রায় ৬ দশমিক ৪ মিলিয়ন বর্গমিটার ভূমি।
অধিকার গোষ্ঠীর অভিযোগ, দুই মাস ধরে এ অঞ্চলে বসতি স্থাপনকারীরা চাপ বাড়িয়ে চলেছে। তারা নতুন রাস্তা নির্মাণ করছে, ব্যাপক জমি দখল করছে এবং ফিলিস্তিনিদের কৃষিজ ফসল ও জলের কূপ ধ্বংস করছে। বিবৃতিতে বলা হয়েছে, এ পদক্ষেপগুলো ফিলিস্তিনিদের উপস্থিতিকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলছে।
ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের ‘বসতি স্থাপন ও প্রাচীর প্রতিরোধ কমিশন’ গত মাসে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছিল, শুধু জুলাই মাসেই পশ্চিম তীরজুড়ে বসতি স্থাপনকারীরা ৪৬৬টি হামলা চালায়। এসব হামলায় চার ফিলিস্তিনি নিহত হয়। পাশাপাশি জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করা হয় দুটি বেদুইন সম্প্রদায়কে, যেখানে প্রায় ৫০টি পরিবার বসবাস করত।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, ওই মাসে বসতি স্থাপনকারীরা অন্তত ১৫টি নতুন ফাঁড়ি গড়ে তোলার চেষ্টা করেছে।
ফিলিস্তিনি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরায়েলের গণহত্যামূলক যুদ্ধ শুরুর পর থেকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বাহিনী ও বসতি স্থাপনকারীদের আক্রমণে অন্তত ১ হাজার ১৫ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আহত হয়েছে ৭ হাজারের বেশি মানুষ।
ফিলিস্তিনি নেতৃত্ব বলছে, পশ্চিম তীরের এই হামলা ও দখলদারি গাজায় চলমান আগ্রাসনের সঙ্গে একসূত্রে গাঁথা। তারা মনে করে, দখলদার ইসরায়েল একই সঙ্গে পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনপদগুলো খালি করে বসতি স্থাপনকারীদের জন্য নতুন জমি তৈরি করছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বলছে, ইসরায়েল পরিকল্পিতভাবে পশ্চিম তীরকে বসতি বিস্তারের মাধ্যমে বিভক্ত করছে। এর উদ্দেশ্য হলো ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ভৌগোলিক সংহতি ধ্বংস করা।
এই প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) গত জুলাই মাসে এক ঐতিহাসিক রায়ে জানাযন, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরায়েলের দখল অবৈধ। আদালত পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের সব বসতি খালি করার আহ্বান জানান।
তবে ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ আদালতের এ রায় প্রত্যাখ্যান করে। বরং যুদ্ধের অজুহাতে আরও বেশি জমি দখল ও ফাঁড়ি স্থাপনের গতি বাড়িয়েছে।
ফিলিস্তিনি পর্যবেক্ষকরা জানান, পশ্চিম তীরে প্রতিটি নতুন ফাঁড়ি মানে নতুন সহিংসতা, নতুন বাস্তুচ্যুতি। আর এর ফলে ফিলিস্তিনিদের টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠছে।
গাজায় তিন ফিলিস্তিনির অনাহারে মৃত্যু
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় অনাহারে তিনজনের মৃত্যুর রেকর্ড করা হয়েছে। এ নিয়ে ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে অনাহারে মৃতের সংখ্যা দাঁড়াল ৩০৩ জনে; যার মধ্যে ১১৭ শিশু।
নাসের হাসপাতালে ইসরায়েলের হামলায় গত সোমবার ছয় সাংবাদিকসহ ২১ জন নিহত হযন। কানাডা, মিশর, ইরান ও সৌদি আরবসহ বিভিন্ন দেশ এই হামলার নিন্দা জানিয়েছে। তেহরান এটিকে ‘বর্বর যুদ্ধাপরাধ’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে।
ডক্টরস উইদাউট বর্ডার্স (এমএসএফ) এবং ফরেন প্রেস অ্যাসোসিয়েশনসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই হামলায় ‘ক্ষোভ’ ও ‘মর্মাহত’ প্রকাশ করেছে। হামলায় চিকিৎসাকর্মীরাও লক্ষ্যবস্তু ছিলেন। ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু হামলাকে ‘একটি দুঃখজনক দুর্ঘটনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
গাজায় চলমান সংঘর্ষে ইসরায়েল কমপক্ষে ৬২ হাজার ৮১৯ জনকে হত্যা করেছে এবং ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬২৯ জনকে আহত করেছে। সূত্র: আল-জাজিরা ও মিডল ইস্ট মনিটর