২১৩ বছর আগের কথা। ১৮১২ সালের জুন মাসে পাঁচ লাখের বেশি সেনা নিয়ে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণ করেছিলেন ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ন বোনাপার্ট। সৈন্য নিয়ে মস্কোয় পৌঁছেও গিয়েছিলেন। কিন্তু রুশ সৈন্যদের সঙ্গে যুদ্ধ না করেই তাকে ফিরতে হয়েছিল দেশে। ফেরার অন্যতম কারণ ছিল সৈন্যদের অসুস্থতা। এতদিন পর্যন্ত জানা গিয়েছিল, অসুস্থতার নেপথ্যে ছিল ‘টাইফাস’ মহামারির সংক্রমণ। তবে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় জানা গেছে, শুধু টাইফাসই নয়, আরও ‘দুটি ভাইরাস’ কাবু করেছিল ফরাসি সম্রাটের ‘গ্র্যান্ড আর্মিকে’।
নেপোলিয়নের ‘গ্র্যান্ড আর্মিকে’ মোকাবিলার জন্য এক কৌশলী চাল চালেন রুশ সেন্যরা। তারা মস্কোকে পরিত্যক্ত শহর বানিয়ে সেখান থেকে পিছিয়ে যেতে থাকেন। পিছিয়ে যেতে যেতে পথে নিজেদের সব গ্রাম এবং চাষের খেত পুড়িয়ে দেন। সোভিয়েত ইউনিয়নের এই কৌশলী চালে, নেপোলিয়নের বাহিনী যখন মস্কোয় পৌঁছায়, তখন তাদের খাবারের ব্যাপক অভাব দেখা দেয়। সঙ্গে প্রবল শীতও কাবু করতে থাকে তাদের। এরই মধ্যে নানা রোগের সংক্রমণেও বাহিনী দুর্বল হয়ে পড়ে। সব মিলিয়ে রুশ অভিযানের সময়ে নেপোলিয়নের প্রায় তিন লাখ সৈন্য ক্ষুধা, শীত এবং রোগের কারণে মারা যায়।
নেপোলিয়নের সেনারা কী রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তা নিয়ে গবেষণাও চলে। এত দিন পর্যন্ত ধরে নেওয়া হতো, টাইফাস মহামারির কারণেই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন তারা। রাশিয়া অভিযান থেকে পিছু হটার সময়ে ইউরোপের লিথুয়ানিয়ার ভিলনিয়াসে ‘গ্র্যান্ড আর্মির’ মৃত সৈন্যদের কবর দেওয়া হয়েছিল। ২০০১ সালে ওই গণকবরটি আবিষ্কৃত হয়। পরে ২০০৬ সালের এক গবেষণায় ২১৩ বছরের পুরোনো ওই টাইফাস-বৃত্তান্ত সম্পর্কে প্রথম জানা যায়। সৈন্যদের কিছু কঙ্কালের দাঁত বিশ্লেষণ করেন বিজ্ঞানীরা। নমুনাগুলো থেকে জানা যায়, সৈন্যদের ‘রিকেটসিয়া প্রোয়াজেকি’ নামে এক ব্যাকটেরিয়ার (যা থেকে টাইফাস রোগ হয়) সংক্রমণ হয়েছিল।
২০০৬ সালের গবেষণায় প্রযুক্তিগত কিছু সীমাবদ্ধতা ছিল। ফলে ওই সময়ে ‘রিকেটসিয়া প্রোয়াজেকি’ ব্যাকটেরিয়াকে চিহ্নিত করা গেলেও, গবেষণা আর বেশি দূর এগোয়নি। পরবর্তী সময়ে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে গবেষণার ধরনে বদল আসে। সম্প্রতি গবেষকরা ‘হাই-থ্রুপুট সিকোয়েন্সিং’ নামে একটি পদ্ধতিতে মৃত সৈন্যদের কঙ্কাল থেকে পাওয়া দাঁতের নমুনা পরীক্ষা করেন। এই পদ্ধতিতে এক সঙ্গে লক্ষাধিক ডিএনএর নমুনা বিশ্লেষণ করা যায়। ২০০ বছরেরও বেশি পুরোনো ডিএনএর নমুনা বিশ্লেষণ করা যায় এই পদ্ধতিতে।
সাম্প্রতিক গবেষণায় জানা গেছে, আরও অন্তত দুটি ভাইরাস নেপোলিয়নের সৈন্যদের কাবু করেছিল। এর একটি হচ্ছে ‘সালমোনেলা এনটেরিকা’। অপরটি হচ্ছে ‘বোরেলিয়া রেকারেনটিস’। এসব ভাইরাসের ফলে ‘প্যারাটাইফয়েড’ এবং ‘রিল্যাপসিং ফিভার’ (বার বার জ্বর ফিরে আসা) বাসা বাঁধে সৈন্যদের শরীরে। তারা অসুস্থ হয়ে পড়লে নেপোলিয়ন ফিরে আসতে বাধ্য হন। সম্প্রতি জীববিদ্যাসংক্রান্ত সাময়িকী ‘কারেন্ট বায়োলজিতে’ গবেষণাটির ফল প্রকাশিত হয়েছে।
নতুন গবেষণায় পাওয়া এই দুই ব্যাকটেরিয়ার পাশাপাশি আরও অন্য জীবাণুর সংক্রমণের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। কারণ নতুন গবেষণাটি করা হয়েছে মাত্র ১৩টি কঙ্কালের নমুনা নিয়ে। সে ক্ষেত্রে অন্য কঙ্কালগুলোর দাঁতের নমুনা থেকে অন্য কোনো সংক্রমণের খোঁজ পাওয়া যেতে পারে। তবে আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, ১৩টি নমুনার মধ্যে টাইফাসের সংক্রমণ পাওয়া যায়নি।
গবেষকদলের নেতৃত্বে রয়েছেন এস্তোনিয়ার ‘ইউনিভার্সিটি অব তারতু’র গবেষক রেমি বারবেরি। আগে তিনি ফ্রান্সের প্যারিসে ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউটের’ গবেষক ছিলেন। তার ভাষ্য, ‘এত দিন আমরা ভাবতাম যে, নেপোলিয়নের সৈন্যবাহিনীকে ধ্বংস করেছিল শুধু একটিই সংক্রামক রোগ- টাইফাস। তবে নতুন গবেষণায় একেবারে অপ্রত্যাশিত কিছু পাওয়া গেছে। সৈন্যবাহিনী ধ্বংসের নেপথ্যে আরও সংক্রামক রোগের যোগ থাকার সম্ভাবনার দিক খুলে দিয়েছে এই গবেষণা।’
গবেষকদলের অন্যতম সদস্য তথা ‘পাস্তুর ইনস্টিটিউটের’ মাইক্রোবিয়াল প্যালিওজেনোমিক্স শাখার প্রধান নিকোলাস রাসকোভান বলেছেন, ‘নেপোলিয়নের সৈন্যদের শরীরে যে বেশ কয়েকটি সংক্রামক রোগ ছিল, তা আমাদের এই গবেষণা থেকে স্পষ্ট।’
তবে নেপোলিয়নের সেনাবাহিনীর ওপর এই রোগগুলোর প্রভাব কতটা ছিল, তা জানতে গেলে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন রাসকোভান। কারণ, এই গবেষণায় মাত্র ১৩টি নমুনা পরীক্ষা করে দেখা হয়েছে। বস্তুত, ‘প্যারাটাইফয়েড’ বা ‘রিল্যাপসিং ফিভার’ বর্তমানে খুব বেশি দেখা যায় না। এগুলো এখন আর ততটা মারাত্মকও নয়।
১৮১২ সালে তার সৈন্যরা অসুস্থ হয়ে পড়ার জেরে ‘গ্র্যান্ড আর্মির’ সিংহভাগই ধ্বংস হয়ে যায়। নেপোলিয়ন যখন দেশে ফেরেন তখন তার সঙ্গে অর্ধেকের বেশি সৈন্য ফিরতে পারেননি। যারা ফিরেছিলেন তারাও দুর্বল হয়ে পড়েন। এর প্রভাব পড়ে ১৮১৫ সালে ওয়াটারলুর যুদ্ধে। ওই যুদ্ধে পতন হয় নেপোলিয়নের।
সূত্র: সিএনএন