পাকিস্তান সরকার দেশটির সংবিধানে ২৭তম সংশোধনী আনতে যাচ্ছে। এরই মধ্যে স্থানীয় সময় শনিবার (৮ নভেম্বর) দেশটির পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ সিনেটে এ বিষয়ক বিল উপস্থাপন করা হয়েছে। এতে দেশটির সেনাপ্রধানের ক্ষমতা বৃদ্ধিসহ বিচারব্যবস্থা ও সামরিক কমান্ড কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
ভারতের সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দু জানায়, পাকিস্তানের তিন বাহিনীর মধ্যে বৃহত্তর সমন্বয় এবং একীভূত কমান্ড নিশ্চিত করার জন্য প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রধানের একটি নতুন পদ তৈরির জন্য এই সাংবিধানিক সংশোধনী আসছে।
জানা গেছে, ফেডারেল সরকার ২৭তম সংবিধান সংশোধনী যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সংসদ থেকে পাস করার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে চলেছে। সূত্র অনুসারে, প্রস্তাবিত ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে পাকিস্তান সরকার সংবিধানের পাঁচটি মূল অনুচ্ছেদে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনতে চায়। অভ্যন্তরীণ সূত্রের মতে, সরকার ১৬০ (৩এ), ১৯১এ, ২১৩, ২৪৩ এবং বিচার বিভাগীয় পুনর্গঠন সম্পর্কিত একটি নতুন অনুচ্ছেদে সংশোধন চাইছে।
অন্যদিকে, পাকিস্তানের সংবাদমাধ্যম জিও নিউজের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আজারবাইজান থেকে ভার্চুয়ালি মন্ত্রিসভা বৈঠক পরিচালনা করে ২৭তম সংবিধান সংশোধনী খসড়ায় অনুমোদন দেন। এরপরই বিলটি সিনেটে উত্থাপন করা হয় এবং তা পাঠানো হয় আইন ও বিচারবিষয়ক স্থায়ী কমিটিতে।
আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার বিলটি উপস্থাপন করেন। তিনি জানান, ২৭তম সংশোধনী আসলে ২০০৬ সালে পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) ও পাকিস্তান পিপলস পার্টির মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘চার্টার অব ডেমোক্রেসির’ অংশ। কিন্তু ১৮তম সংশোধনীর সময় তা সম্পূর্ণ করা সম্ভব হয়নি।
সংশোধনী প্রস্তাব অনুযায়ী, সংবিধানের ২৪৩ ধারা, যেখানে বলা হয়েছে ‘সশস্ত্র বাহিনীর নিয়ন্ত্রণ ও কমান্ড ফেডারেল সরকারের হাতে থাকবে’ এবং ‘সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক হবেন রাষ্ট্রপতি’-এ কিছু পরিবর্তন আনা হবে। খসড়া অনুযায়ী, সশস্ত্র বাহিনীর ‘চেয়ারম্যান জয়েন্ট চিফস অব স্টাফ কমিটি’ (CJCSC) পদটি বাতিল করে নতুন একটি পদ তৈরি করা হবে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস।’
এ ছাড়া বিলটিতে বলা হয়, সেনা কর্মকর্তা বা বিমান ও নৌবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের দেওয়া সম্মানসূচক উপাধি; যেমন ফিল্ড মার্শাল, মার্শাল অব দ্য এয়ার ফোর্স ও অ্যাডমিরাল অব দ্য ফ্লিট—আজীবন বহাল থাকবে। আইনমন্ত্রী জানান, এসব উপাধি বাতিল করার ক্ষমতা শুধু পার্লামেন্টের হাতে থাকবে।
প্রস্তাবে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেসের সুপারিশে পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে একজন কর্মকর্তাকে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডার হিসেবে নিয়োগ দেবেন।
সংশোধনীর আরেকটি বড় প্রস্তাব হলো, একটি নতুন আদালত গঠন—ফেডারেল কনস্টিটিউশনাল কোর্ট। এই আদালত প্রতিষ্ঠিত হলে সুপ্রিম কোর্টের কিছু ক্ষমতা কমে যাবে। খসড়ায় বলা হয়েছে, সংবিধানের কিছু বিশেষ এখতিয়ার সুপ্রিম কোর্ট থেকে সরিয়ে নতুন ফেডারেল সংবিধান আদালতে স্থানান্তর করা হবে।
বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবেন। পাশাপাশি নতুন আদালতে বিচারপতির সংখ্যা নির্ধারণের ক্ষমতা থাকবে পার্লামেন্টের হাতে। প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ফেডারেল সংবিধান আদালতে দেশের সব প্রদেশের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে। এই আদালতের প্রধান বিচারপতির মেয়াদ হবে তিন বছর।
এক নজরে ২৭তম সংবিধান সংশোধনীর প্রধান বিষয়গুলো
নতুন পদ ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ তৈরি হবে, যা ২০২৫ সালের ২৭ নভেম্বর থেকে কার্যকর হবে।
সেনাপ্রধান (Chief of Army Staff) একই সঙ্গে ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ পদে দায়িত্ব পালন করবেন।
ফিল্ড মার্শাল, মার্শাল অব দ্য এয়ারফোর্স, অ্যাডমিরাল অব দ্য ফ্লিট উপাধি আজীবন বহাল থাকবে।
প্রধানমন্ত্রী ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেসের’ সুপারিশে ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক কমান্ডের প্রধান নিয়োগ দেবেন।
নতুন ফেডারেল সংবিধান আদালত গঠন করা হবে।
আদালতে সব প্রদেশের সমান প্রতিনিধিত্ব থাকবে।
বিচারপতি নিয়োগে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ভূমিকা বাড়বে।
ফেডারেল সংবিধান আদালতে বিচারপতির সংখ্যা নির্ধারণ করবে পার্লামেন্ট।
সুপ্রিম কোর্টের কিছু ক্ষমতা নতুন আদালতে স্থানান্তর হবে।
ফেডারেল সংবিধান আদালতের প্রধান বিচারপতির মেয়াদ হবে তিন বছর।
রাষ্ট্রপতি আজীবনের জন্য ফৌজদারি মামলার দায়মুক্তি পাবেন।
সুলতানা দিনা/