নিউ ইয়র্ক সিটির নতুন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন জোহরান মামদানি। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো মুসলমান ও দক্ষিণ এশীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি নিউইয়র্ক শহরের মেয়র নির্বাচিত হলেন।কিন্তু তার এই বিজয়ের পরই প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দল রিপাবলিকান পার্টির নেতারা তার নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি জানিয়েছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, মামদানি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্বের আবেদন করার সময় মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন। তারা বলেছেন, তাদের এই অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার (মামদানির) নাগরিকত্ব বাতিল করে তাকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা উচিত।
রিপাবলিকান কংগ্রেসম্যান অ্যান্ডি ওগলস এক বিবৃতিতে বলেন, ‘যদি মামদানি নাগরিকত্বের আবেদনপত্রে মিথ্যা বলে থাকেন, তবে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হতে পারেন না, মেয়র তো দূরের কথা। নিউইয়র্কের মতো একটি মহান শহরকে এমন একজন কমিউনিস্ট চালাতে পারেন না, যিনি সন্ত্রাসবাদী মতাদর্শকে সমর্থন করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের নাগরিকত্ব আইন খুবই স্পষ্ট- যদি কেউ কমিউনিস্ট বা সন্ত্রাসী কার্যকলাপের সঙ্গে যুক্ত থাকে, তাকে তা প্রকাশ করতে হয়। আমি নিশ্চিত, মামদানি তা করেননি। প্রমাণ মিললে তাকে উগান্ডায় ফেরত পাঠানো উচিত।’
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য আরেক রিপাবলিকান নেতা ফ্লোরিডার র্যান্ডি ফাইন বলেন, ‘তিনি মাত্র আট বছর আগে যুক্তরাষ্ট্রে এসেছেন। আমি যা পড়েছি, তাতে মনে হয় না যে তিনি নাগরিকত্ব পাওয়ার শর্ত পূরণ করেছেন।’ যুক্তরাষ্ট্রের নিউজম্যাক্স টিভিকে তিনি এ কথা বলেন।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের তথ্য যাচাইকারী সংস্থা পলিটিফ্যাক্ট বলছে, মামদানি সম্পর্কে এমন অভিযোগের কোনো প্রমাণ নেই।
জোহরান মামদানি ১৯৯৮ সালে মাত্র সাত বছর বয়সে উগান্ডা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন। ২০১৮ সালে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন। যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেতে সাধারণত একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তিকে অন্তত পাঁচ বছর বৈধভাবে দেশে বসবাস করতে হয় অথবা যদি তার স্ত্রী বা স্বামী যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক হন, তবে তিন বছরেই আবেদন করা যায়।
আইন অনুযায়ী নাগরিকত্ব বাতিল করা (ডিন্যাচারালাইজেশন) একটি অত্যন্ত বিরল ঘটনা। এটি কেবল আদালতের আদেশে করা সম্ভব এবং সাধারণত নাৎসি সহযোগী বা সন্ত্রাসবাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই এটি ঘটে।
অভিবাসন আইন বিশেষজ্ঞ জেরেমি ম্যাককিনি বলেন, ‘সরকারকে প্রমাণ করতে হবে যে কেউ নাগরিকত্ব পাওয়ার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা তথ্য দিয়েছেন এবং সেই তথ্যটি এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে তা নাগরিকত্বের সিদ্ধান্ত বদলে দিতে পারত। তবে মামদানির ক্ষেত্রে এমন কোনো প্রমাণ নেই।’
রিপাবলিকানদের এই অভিযোগের সূত্রপাত হয় গত জুনে, যখন ওগলস বিচার বিভাগে চিঠি পাঠিয়ে মামদানির নাগরিকত্ব বাতিলের দাবি করেন। তিনি অভিযোগ করেন, মামদানি হয়তো ‘প্রতারণার মাধ্যমে’ নাগরিকত্ব পেয়েছেন। তার যুক্তি ছিল, মামদানি ২০১৭ সালে একটি র্যাপ গানে ‘হোলি ল্যান্ড ফাইভ’ নামে এক মুসলিম দাতব্য সংস্থার প্রতি সহানুভূতি প্রকাশ করেছিলেন। ওই সংস্থার কিছু সদস্য ২০০৮ সালে হামাসকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার অভিযোগে দণ্ডিত হয়েছিলেন, যদিও অনেক আইনজীবী এই মামলার প্রমাণ ও বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।
রিপাবলিকানদের আরেকটি অভিযোগ হলো, মামদানি তার নাগরিকত্বের ফর্মে ‘ডেমোক্র্যাটিক সোশ্যালিস্টস অব আমেরিকা’ (ডিএসএ) সংগঠনের সদস্যপদ উল্লেখ করেননি। তারা দাবি করছেন, এটি একটি কমিউনিস্ট সংগঠন এবং এই তথ্য গোপন করলে তা নাগরিকত্বের নিয়ম লঙ্ঘন হতে পারে। কিন্তু ইতিহাসবিদ হার্ভি ক্লেয়ার বলেন, ‘ডিএসএ কোনো কমিউনিস্ট সংগঠন নয়। এটি গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের ধারায় বিশ্বাস করে, কমিউনিজমের মতো রাষ্ট্রীয় মালিকানার পক্ষে নয়।’
আইনজীবী ম্যাককিনি বলেন, ‘ডিএসএতে সদস্যপদ নাগরিকত্ব পাওয়ার পথে কোনো বাধা নয়। কেউ যদি বৈধ কোনো সংগঠনের সদস্যপদের কথা উল্লেখ নাও করেন, তাতে সমস্যা নেই। এটিকে প্রতারণা বলা যাবে না, যদি সেই তথ্য প্রকাশ করলে নাগরিকত্ব বাতিলের মতো কোনো ফল না হতো।’
নির্বাচন চলার সময়ে মামদানির বিরুদ্ধে ব্যাপক ইসলামবিরোধী প্রচারণা চলে। মুসলিম অধিকার সংগঠন ‘কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশনস’ এসব আক্রমণকে ‘বর্ণবাদী ও ইসলামফোবিক’ বলে আখ্যা দেয়। মামদানি নিজেও যুক্তরাষ্ট্রের টিভি চ্যানেল এমএসএনবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘ইসলামফোবিয়া এখন আমেরিকার রাজনীতির স্বাভাবিক বিষয় হয়ে গেছে। মুসলিমরা এখানে নিজেদের জায়গা পাওয়ার যোগ্য, কিন্তু অনেকে সেটি স্বীকার করতে চায় না।’
এদিকে রিপাবলিকানদের যুব সংগঠন ‘দ্য নিউইয়র্ক রিপাবলিকান ক্লাব’ সংবিধানের ১৪তম সংশোধনীর ধারা ব্যবহার করে মামদানিকে মেয়র পদে অযোগ্য ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে। তারা বলছে, মামদানি ‘শত্রুপক্ষকে সহায়তা’ করেছেন। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ১৪তম সংশোধনীর এই ধারা কেবল বিদ্রোহ বা যুদ্ধকালীন শত্রুর সহায়তার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। সরকারের কোনো নীতির সমালোচনা করা বা ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষের বিরোধিতা করা এতে পড়ে না।
আইন বিশেষজ্ঞ ক্যাসান্দ্রা বার্ক রবার্টসন বলেন, ‘মামদানির বিরুদ্ধে নাগরিকত্ব বাতিলের কোনো মামলা টিকবে বলে মনে হয় না। কিন্তু এই ধরনের হুমকি অভিবাসী সমাজে ভয় সৃষ্টি করতে পারে।’ হফস্ট্রা ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ইরিনা মান্টা জানান, ট্রাম্প প্রশাসনের সময় নাগরিকত্ব বাতিলের মামলা কিছুটা বেড়েছিল, কিন্তু তা এখনো অত্যন্ত বিরল ঘটনা।
আইন অনুযায়ী, যদি কারও নাগরিকত্ব বাতিল করা হয়, তবে তার আগের অভিবাসন অবস্থা ফিরে আসে। মামদানির ক্ষেত্রে তা হবে ‘ল’ফুল পার্মানেন্ট রেসিডেন্ট’ বা বৈধ স্থায়ী বাসিন্দা। কিন্তু তাতে তিনি নিউইয়র্ক সিটির মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নিতে পারবেন না। তবে আইনবিদদের মতে, এমন ঘটনার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। এখন পর্যন্ত কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণও পাওয়া যায়নি যে জোহরান মামদানি নাগরিকত্বের সময় মিথ্যা বলেছেন বা যোগ্যতার মানদণ্ড পূরণ করেননি। সূত্র: বিবিসি