ক্রেমলিনের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা দিমিত্রি মেদভেদেভ সোমবার (২ ফেব্রুয়ারি) প্রকাশিত এক বক্তব্যে বলেছেন যে, পৃথিবী বর্তমানে অত্যন্ত বিপজ্জনক হয়ে উঠছে, তবে রাশিয়া কোনো বৈশ্বিক সংঘাত চায় না।
২০২২ সালে রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণ স্নায়ুযুদ্ধের পর থেকে মস্কো ও পশ্চিমের মধ্যে সবচেয়ে বড় সংঘাতের সূত্রপাত করেছিল। তবে বর্তমানে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দূতগণ রাশিয়া ও ইউক্রেনের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ শেষ করার চেষ্টা করছেন।
রাশিয়ার ক্ষমতাধর কর্মকর্তাদের নিয়ে গঠিত আধুনিক আমলের ‘পলিটব্যুরো’ বা নিরাপত্তা পরিষদের উপ-প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মেদভেদেভ ট্রাম্পের প্রশংসা করেছেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ পুনরায় শুরু হওয়া একটি উৎসাহব্যঞ্জক বিষয়।
মেদভেদেভ অতীতে বারবার কিয়েভ ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর কড়া সমালোচনা করেছেন এবং যুদ্ধ পারমাণবিক ‘মহাপ্রলয়ে’ (Apocalypse) রূপ নিতে পারে বলে সতর্ক করেছেন। এবার তিনি বলেন, পশ্চিমারা বারবার রাশিয়ার স্বার্থকে উপেক্ষা করেছে।
মস্কোতে নিজ বাসভবনে রয়টার্স, তাস এবং রাশিয়ার যুদ্ধ বিষয়ক ব্লগার ‘ওয়ারগোঞ্জো’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মেদভেদেভ বলেন, ‘‘পরিস্থিতি অত্যন্ত বিপজ্জনক। মনে হচ্ছে মানুষের সহ্যের মাত্রা কমে যাচ্ছে।’’
২০০৮ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করা মেদভেদেভ বলেন, ‘‘আমরা কোনো বৈশ্বিক সংঘাতে আগ্রহী নই। আমরা পাগল নই। তবে একটি বিশ্বযুদ্ধ বা বৈশ্বিক সংঘাতের সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না।’’
যদিও রাশিয়ার চূড়ান্ত নীতি নির্ধারণের ভার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের হাতেই থাকে, তবে বিদেশি কূটনীতিকদের মতে, কট্টরপন্থী হিসেবে পরিচিত মেদভেদেভের বক্তব্য থেকে রুশ অভিজাত শ্রেণির চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন পাওয়া যায়। যে ঘরে এই সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, সেখানে ঝোলানো একটি কার্টুনে দেখা গেছে মেদভেদেভ ইউরোপীয় নেতাদের দিকে সাবমেশিনগান তাক করে আছেন।
জানুয়ারি মাসে যা কিছু ঘটেছে তা ছিল ‘অতিরিক্ত’
পুতিন এবং ট্রাম্প দুজনেই ইউক্রেন যুদ্ধ ঘিরে উত্তেজনার ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছেন। তবে ইউরোপীয় কূটনীতিকদের মতে, ইউক্রেনের মিত্ররা যাতে যুদ্ধে খুব বেশি জড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য মস্কো চাতুর্যের সঙ্গে এই উত্তেজনার ভয়কে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করছে।
মেদভেদেভ বলেন, ‘‘তারা (পশ্চিমারা) বলে—অসম্ভব, এসব রাশিয়ানদের বানানো কথা। তারা কেবল ভয় দেখাচ্ছে, বাস্তবে কিছুই করবে না।’’
তিনি আরও যোগ করেন যে, ইউক্রেনে ‘বিশেষ সামরিক অভিযান’ প্রমাণ করেছে রাশিয়া নিজের স্বার্থ রক্ষায় রুখে দাঁড়াতে জানে।
ইউক্রেন ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা এই যুদ্ধকে (যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইউরোপের সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ) একটি সাম্রাজ্যবাদী দখলদারত্ব হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, রাশিয়া ইউক্রেনে জিতে গেলে একদিন ন্যাটোর ওপরও হামলা করবে। রাশিয়া অবশ্য এসব দাবিকে ‘বাজে কথা’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে।
২০১৪ সালে ইউক্রেনের মাইদান বিপ্লবে রুশপন্থী এক প্রেসিডেন্টের পতনের পর পূর্ব ইউক্রেনে প্রথম সংঘাত শুরু হয়। রাশিয়া ক্রিমিয়া দখল করে নেয় এবং মস্কো-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদীরা পূর্ব ইউক্রেনে কিয়েভ বাহিনীর সঙ্গে লড়াই শুরু করে।
জানুয়ারি মাসে ভেনেজুয়েলা ও গ্রিনল্যান্ডসহ বিশ্বজুড়ে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন ঘটনার ঘনঘটা সম্পর্কে জানতে চাইলে মেদভেদেভ বলেন, এসবই ছিল আসলে ‘অতিরিক্ত’।
রাশিয়ার মিত্র ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর প্রসঙ্গে মেদভেদেভ বলেন, ট্রাম্প যদি কোনো বিদেশি শক্তির দ্বারা ‘ছিনতাই’ হতেন, তবে যুক্তরাষ্ট্র নিশ্চিতভাবেই একে যুদ্ধ ঘোষণার শামিল হিসেবে দেখত।
তিনি আরও বলেন, গ্রিনল্যান্ডের ওপর রাশিয়া বা চীনের হুমকির বিষয়ে পশ্চিমা দেশগুলোর দাবি আসলে ভিত্তিহীন ‘ভয় ছড়ানোর গল্প’, যা পশ্চিমা নেতারা নিজেদের আচরণের ন্যায্যতা দিতে তৈরি করেছেন। সূত্র: রয়টার্স
মাহফুজ/