বাংলাদেশে গত সপ্তাহে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ গণভোটও অনুষ্ঠিত হয়। ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতনের পর প্রস্তাবিত সাংবিধানিক সংস্কার নিয়ে এই গণভোটে মতামত দেন নাগরিকরা। ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ নামে পরিচিত প্রস্তাবটি ৬০ দশমিক ২৬ শতাংশ ভোটে অনুমোদিত হয়েছে। এর আগে গত বছর অধিকাংশ রাজনৈতিক দল সেটিতে স্বাক্ষর করে।
তবে সনদ প্রশ্নে নির্বাচনে বিজয়ী দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী নেতৃত্বাধীন জোটের মধ্যে পরস্পরবিরোধী অবস্থান দেখা যাচ্ছে। গত মঙ্গলবার বিএনপির নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যরা নতুন ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’-এর সদস্য হিসেবে শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। এতে সংস্কার প্রক্রিয়ার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ফলে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়েছে।
জুলাই সনদ কী
গণ-অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পতনের পর নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৪ সালের আগস্টে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব নেন। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার জুলাই ন্যাশনাল চার্টার প্রণয়ন করে। এতে সংবিধান সংশোধন, আইনি সংস্কার এবং নতুন আইন প্রণয়নের রূপরেখা তুলে ধরা হয়।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর ডেমোক্রেসি অ্যান্ড ইলেকটোরাল অ্যাসিস্ট্যান্স (আইডিয়া)-এর মতে, এতে ৮০টিরও বেশি প্রস্তাব রয়েছে। প্রধান সংস্কারগুলোর মধ্যে রয়েছে–নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা নির্ধারণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সুরক্ষা। জুলাই সনদে বর্তমান এক কক্ষবিশিষ্ট ৩৫০ সদস্যের জাতীয় সংসদের পাশাপাশি ১০০ সদস্যের একটি উচ্চকক্ষ গঠনের সুপারিশ করা হয়েছে।
বিভাজন কোথায়?
নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের দুটি শপথ নিতে বলা হয়েছিল। প্রথমটি সংবিধান রক্ষার অঙ্গীকার, দ্বিতীয়টি জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার। বিএনপি সদস্যরা দ্বিতীয় শপথ নেননি। এতে জামায়াত এবং তাদের মিত্র জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) তীব্র সমালোচনা করে। এনসিপি ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনের নেতাদের নিয়ে গঠিত দল।
সনদ বাস্তবায়নের নির্দেশনা অনুযায়ী, সংবিধান সংস্কার পরিষদও গঠিত হবে সেই সংসদ সদস্যদের নিয়ে, যারা একই অনুষ্ঠানে পরিষদ সদস্য হিসেবেও শপথ নেবেন। ফলে বর্তমানে কেবল জামায়াত, এনসিপি এবং অল্প কয়েকজন সদস্যই পরিষদে বসার যোগ্য। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি সংসদ সদস্য দ্বিতীয় শপথ না নেওয়ায় এখনো কাউন্সিল গঠিত হয়নি। পরবর্তী পদক্ষেপ কী হবে, তা অনিশ্চিত।
বিএনপির আপত্তি কী?
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ স্থানীয় গণমাধ্যমকে বলেন, সংবিধান সংস্কার পরিষদ এখনো সংসদে অনুমোদিত হয়নি। তাই তারা এর সদস্য হিসেবে শপথ নেননি। তার কথায়, ‘আমাদের কাউকেই এই কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে নির্বাচিত করা হয়নি। এটি এখনো সংবিধানের অংশ নয়। নির্বাচিত সংসদ অনুমোদন দিলে তবেই এটি বৈধ হবে।’
তবে একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। মূল মতবিরোধ ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন নিয়ে। বর্তমানে বাংলাদেশে ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (এফপিটিপি) পদ্ধতিতে নির্বাচন হয়, যেখানে যে প্রার্থী সর্বাধিক ভোট পান, তিনিই বিজয়ী হন। এতে মোট ভোটের শতাংশ ও আসন সংখ্যার মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হতে পারে।
সর্বশেষ নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট ২১২টি আসন পেয়েছে। আর জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি। এখন পর্যন্ত ঘোষণা করা হয়েছে ২৯৭টি আসনের ফলাফল।
বিএনপি চায় উচ্চকক্ষ গঠনেও বর্তমান আসনভিত্তিক অনুপাত বিবেচনায় আসুক, যা তাদের পক্ষে সুবিধাজনক হবে। অন্যদিকে জামায়াত ও এনসিপি চায় আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতিতে উচ্চকক্ষ গঠিত হোক, যাতে ভোটের মোট হার অনুযায়ী আসন বণ্টন হয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক আসিফ নজরুলের মতে, ‘মূল প্রশ্নগুলোতে বড় দলগুলোর ঐকমত্য থাকলেও প্রস্তাবিত উচ্চকক্ষ গঠনের পদ্ধতি নিয়ে মতবিরোধ রয়ে গেছে। এই বিরোধ-মীমাংসাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।’ সূত্র: আল-জাজিরা