যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একতরফা শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তকে অবৈধ ঘোষণার মাত্র কয়েক ঘণ্টা পর আবারও পাল্টা পদক্ষেপ নিলেন ট্রাম্প।
শনিবার (২১ ফেব্রুয়ারি) ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, মার্কিন আমদানি পণ্যের ওপর বৈশ্বিক শুল্ক ১০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ১৫ শতাংশ করা হচ্ছে। আদালতের রায়ে ধাক্কা খাওয়ার পর এই পদক্ষেপ বিশ্বজুড়ে নতুন করে অস্থিরতা তৈরি করেছে।
শুক্রবার মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে জানান, জরুরি ক্ষমতা ব্যবহার করে প্রেসিডেন্টের একতরফা শুল্ক নির্ধারণ করা অসাংবিধানিক। আদালতের মতে, কর আরোপের ক্ষমতা কেবল মার্কিন কংগ্রেসের হাতেই রয়েছে। এই রায়ের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন ইতোপূর্বে শুল্কারোপের মাধ্যমে যে অর্থ আয় করেছে (প্রায় ১৩৩ বিলিয়ন ডলার), তা ফেরত দেওয়ার দাবি উঠতে শুরু করে।
ট্রাম্প এই রায়কে ‘হাস্যকর, দুর্বল এবং চরমভাবে আমেরিকাবিরোধী’ বলে অভিহিত করেছেন। নিজের নিয়োগ দেওয়া বিচারপতিদের ওপর বিশেষ রাগ ঝেড়ে তিনি তাদের ‘বোকা’ এবং ডেমোক্র্যাটদের ‘অনুগত কুকুর’ বলে অভিহিত করেছেন। সাংবাদিকদের তিনি বলেন, ‘তারা চরম দেশপ্রেমবর্জিত এবং সংবিধানের প্রতি অনুগত নন। আমার ধারণা, আদালত বিদেশি স্বার্থ দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন।’
তবে দমে না গিয়ে তিনি শনিবার ‘ট্রেড অ্যাক্ট, ১৯৭৪’-এর ধারা ১২২ ব্যবহার করে নতুন একটি নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর করেন। এই আইনের অধীনে সর্বোচ্চ ১৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা সম্ভব, যা তিনি অবিলম্বে কার্যকর করার নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এই শুল্ক কেবল ১৫০ দিন পর্যন্ত বহাল থাকতে পারে, যদি না কংগ্রেস এটি বর্ধিত করার অনুমোদন দেয়।
বৈশ্বিক বাণিজ্যে অস্থিরতা
ট্রাম্পের এই নতুন সিদ্ধান্তে বিশ্বজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। এর আগে ব্রাজিলসহ যেসব দেশ কোনো দ্বিপক্ষীয় চুক্তি করেনি এবং ৪০ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক দিচ্ছিল, তাদের জন্য এই ১৫ শতাংশের সীমা সাময়িকভাবে স্বস্তির হতে পারে। অন্যদিকে তাইওয়ান বা যুক্তরাজ্যের মতো দেশগুলো যারা ইতোমধ্যেই আমেরিকার সঙ্গে বিশেষ বাণিজ্য চুক্তি করেছে, তারা এখন এক জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হবে। তাইওয়ান যেমন মার্কিন জ্বালানি ও বিমান কেনার বিনিময়ে শুল্ক ১৫ শতাংশে নামিয়ে এনেছিল, এখন বৈশ্বিক হারও একই হওয়ায় তাদের সেই চুক্তির সুবিধা ম্লান হয়ে গেছে।
জার্মান চ্যান্সেলর ফ্রিডরিখ মার্জ জানিয়েছেন, মার্চের শুরুতে ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনার আগে তিনি ইউরোপীয় দেশগুলোর সঙ্গে একটি সমন্বিত অবস্থান তৈরি করবেন। অন্যদিকে হংকংয়ের অর্থ সচিব এই পুরো পরিস্থিতিকে একটি ‘বিপর্যয়’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও সমালোচনা
যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও ট্রাম্পের এই নীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক চলছে। আগামী নভেম্বরে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির জন্য ডেমোক্র্যাটরা ট্রাম্পের এই শুল্কনীতিকে দায়ী করছেন। তারা অভিযোগ করেছেন, ট্রাম্প সাধারণ মানুষের পকেট কাটছেন। রয়টার্স/ইপসোস-এর সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, মাত্র ৩৪ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট, আর ৫৭ শতাংশ মানুষই তার কর্মকাণ্ডের ওপর অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ট্রাম্পের এই নতুন পদক্ষেপ আবারও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। ইতোমধ্যেই হাজার হাজার আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান তাদের আগে দেওয়া শুল্কের টাকা ফেরত চেয়ে মামলা শুরু করেছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো আইনি লড়াইয়ে জিততে পারলেও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য এই প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। সূত্র: আল-জাজিরা