ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এক আলটিমেটামের মাধ্যমে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্য ও উপসাগরীয় দেশগুলোতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখন তাদের লক্ষ্যবস্তু। ইরানের নিজস্ব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গত কয়েক দিনের ক্রমাগত বোমা হামলার প্রতিশোধ হিসেবে এই হুমকির কথা জানানো হয়েছে।
ইরানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি জানিয়েছে, যদি যুক্তরাষ্ট্রের সরকার এই অঞ্চলে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পাল্টা হামলা থেকে মুক্ত রাখতে চায়, তবে আজ সোমবার (৩০ মার্চ) তেহরান সময় দুপুর ১২টার মধ্যে ইরানের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বোমা হামলার আনুষ্ঠানিক নিন্দা জানাতে হবে।
একই সঙ্গে একটি নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে বলা হয়েছে, ‘আমরা এই অঞ্চলের যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব কর্মচারী, অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের ক্যাম্পাসের অন্তত এক কিলোমিটার দূরে অবস্থান করার পরামর্শ দিচ্ছি।’
পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে, বিশেষ করে কাতারের ‘এডুকেশন সিটি’ এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতে বেশ কিছু নামকরা যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় ও তাদের শাখা ক্যাম্পাস রয়েছে। কাতারের এডুকেশন সিটিতে অবস্থিত ছয়টি উল্লেখযোগ্য প্রতিষ্ঠান হলো টেক্সাস এঅ্যান্ডএম ইউনিভার্সিটি, কার্নেগি মেলন ইউনিভার্সিটি, জর্জটাউন ইউনিভার্সিটি, নর্থওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি, ভার্জিনিয়া কমনওয়েলথ ইউনিভার্সিটি, ওয়েইল করনেল মেডিকেল কলেজ। এই ক্যাম্পাসগুলোতে বিশ্বের ৮৫টির বেশি দেশের হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করেন। ইরানের এই হুমকির ফলে পুরো অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় চরম আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
ইরানের অভিযোগ: ‘বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ধ্বংসের চক্রান্ত’
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ অভিযোগ করেছেন, গত ৩০ দিনের যুদ্ধে ইসফাহান ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি এবং তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজিসহ একাধিক গবেষণা কেন্দ্রে পরিকল্পিতভাবে হামলা চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ‘পারমাণবিক কর্মসূচি বা আসন্ন হুমকির দোহাই দেওয়া ছিল কেবল একটি অজুহাত। আমেরিকা ও ইসরায়েলের আসল উদ্দেশ্য হলো ইরানের বৈজ্ঞানিক ভিত্তি এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে পঙ্গু করে দেওয়া।’
হেলিয়েহ দোতাঘি নামে একজন ইরানি শিক্ষাবিদ ধ্বংসপ্রাপ্ত তেহরানের ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ক্যাম্পাসের ছবি পোস্ট করে লিখেছেন, ‘যে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ওমিদ ও জাফর-২ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল, আজ তা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এক সপ্তাহ আগে এখানকার একজন অধ্যাপককে হত্যা করা হয়েছে এবং গতকাল এখানে বোমা ফেলা হয়েছে। এটি একটি জাতিকে শিল্পায়ন ও উন্নয়ন থেকে পিছিয়ে দেওয়ার সুপরিকল্পিত অপচেষ্টা।’
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী গত সপ্তাহে মালেক আশতার এবং ইমাম হোসেন ইউনিভার্সিটিসহ দুটি ইরানি বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার কথা স্বীকার করেছে। তাদের দাবি, এই প্রতিষ্ঠানগুলো আইআরজিসি সামরিক কাজে ব্যবহার করছিল।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওপর এই হামলা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা। কুইন মেরি ইউনিভার্সিটি অব লন্ডনের আন্তর্জাতিক আইনের অধ্যাপক নেভ গর্ডন বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণাকে যুদ্ধের অংশ হিসেবে গণ্য করে সেখানে বোমা ফেলা ‘জাহান্নামের দরজা’ খুলে দেওয়ার শামিল। যদি এই যুক্তি মেনে নেওয়া হয়, তবে বিশ্বের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ই আর নিরাপদ থাকবে না, কারণ সব বড় বিশ্ববিদ্যালয়ই কোনো না কোনোভাবে সামরিক বা প্রতিরক্ষা গবেষণায় অবদান রাখে।”
ইরানের দেওয়া এই আলটিমেটামের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় কাতার, আমিরাতসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করছে। উচ্চশিক্ষার কেন্দ্রগুলো যুদ্ধের লক্ষ্যবস্তু হওয়ায় বিশ্বজুড়ে মানবাধিকার ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। সূত্র: পলিটিকো