মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দ্বিতীয় মাসে প্রবেশ করায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ সংকুচিত হচ্ছে এবং তেলের দাম দ্রুত বাড়ছে। এই প্রেক্ষাপটে নিজেকে শান্তির মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে চীন।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানে মার্কিন সামরিক অভিযান ‘দুই থেকে তিন সপ্তাহের মধ্যে’ শেষ হতে পারে। তবে এটি কীভাবে শেষ হবে বা এরপর কী ঘটবে, সে বিষয়ে এখনো পরিষ্কার ধারণা নেই।
এই সংঘাতে মধ্যস্থতার ভূমিকায় ইতোমধ্যে উঠে এসেছে পাকিস্তান, যা অনেকের কাছে অপ্রত্যাশিত ছিল। বেইজিং ও ইসলামাবাদের কর্মকর্তারা একটি পাঁচ দফা পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন, যার লক্ষ্য যুদ্ধবিরতি নিশ্চিত করা এবং হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া।
যুক্তরাষ্ট্রের পুরোনো মিত্র পাকিস্তান এই সংকটে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে ট্রাম্প প্রশাসনের আস্থা অর্জন করতে পেরেছে বলেও মনে করা হচ্ছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবেও এই প্রক্রিয়ায় সক্রিয় হচ্ছে চীন। বিশেষ করে আগামী মাসে চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও ট্রাম্পের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য আলোচনার আগে।
লানঝৌ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশেষজ্ঞ ঝু ইয়ংবিয়াও মনে করেন, এই উদ্যোগে চীনের সমর্থন ‘খুবই গুরুত্বপূর্ণ’। তার মতে, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও নৈতিক দিক থেকে চীন পূর্ণ সমর্থন দিচ্ছে, যাতে পাকিস্তান আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে পারে।
প্রাথমিকভাবে যুদ্ধ নিয়ে চীনের প্রতিক্রিয়া ছিল বেশ সংযত। তবে এখন তাদের এই সক্রিয়তা এসেছে পাকিস্তানের অনুরোধে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বেইজিং সফর করে এই সংঘাতের অবসান ঘটাতে চীনের সহায়তা চান এবং সেটি কার্যকর হয়েছে বলেই মনে হচ্ছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা ‘শান্তির পক্ষে নতুন প্রচেষ্টা’ চালাচ্ছে এবং সংলাপ ও কূটনীতিকেই একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেছে।
তেলের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিই একমাত্র কারণ নয়। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তেল আমদানিকারক দেশ হিসেবে চীনের কাছে কিছু মাস চলার মতো মজুত রয়েছে। তবে দীর্ঘমেয়াদি অস্থিরতা তাদের জন্য বড় ঝুঁকি।
চীনের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো স্থিতিশীলতা। বৈশ্বিক অর্থনীতি স্থিতিশীল না থাকলে তাদের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষজ্ঞ ম্যাট পটিঙ্গার বলেন, জ্বালানিসংকটের কারণে যদি বিশ্ব অর্থনীতি ধীরগতির হয়, তাহলে চীনের কারখানা ও রপ্তানিকারকরা বড় চাপের মুখে পড়বে।
বিশ্বের ‘কারখানা’ হিসেবে পরিচিত চীনের শিল্পাঞ্চল দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে এমন আশঙ্কাও রয়েছে। কারণ তেলের দাম বাড়লে উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, যা প্লাস্টিক থেকে শুরু করে পোশাক, স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি ও সেমিকন্ডাক্টর–সবকিছুর সরবরাহ চেইনে প্রভাব ফেলে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যযুদ্ধের সময় অনেক চীনা ব্যবসায়ী নতুন বাজার খুঁজতে শুরু করেন। ফলে গত বছর মধ্যপ্রাচ্যে চীনের রপ্তানি বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হারে বেড়েছে। এই অঞ্চল এখন বৈদ্যুতিক গাড়ির দ্রুততম বর্ধনশীল বাজারগুলোর একটি।
এ ছাড়া চীন মধ্যপ্রাচ্যে লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ (ডিস্যালিনেশন) খাতে সবচেয়ে বড় বিনিয়োগকারী। পাওয়ার কনস্ট্রাকশন করপোরেশন অব চায়না সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান ও ইরাকে বিভিন্ন প্রকল্প পরিচালনা করছে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের কারণে চীন একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র সৌদি আরব, অন্যদিকে প্রতিদ্বন্দ্বী ইরান–দুই দেশের সঙ্গেই সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ইরানের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের অংশীদারত্ব রয়েছে এবং দেশটির তেলের প্রায় ৮০ শতাংশই চীন কিনে থাকে।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠায় এর আগেও ভূমিকা রেখেছে চীন। ২০২৩ সালে তারা সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে মধ্যস্থতা করে। ২০১৬ সালে এক শিয়া ধর্মীয় নেতার মৃত্যুদণ্ডকে কেন্দ্র করে দুই দেশের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছিল।
এ ছাড়া ২০২৪ সালে চীন ফিলিস্তিনি বিভিন্ন গোষ্ঠীর নেতাদের আলোচনায় বসায়। যার ফলে পশ্চিমতীর ও গাজায় একটি জাতীয় ঐক্য সরকারের ঘোষণা আসে। যদিও সেটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তি ছিল না।
তবে চীনের এই কূটনৈতিক প্রভাবের সীমাবদ্ধতাও রয়েছে। তারা সাধারণত সামরিকভাবে জড়াতে চায় না এবং তাদের প্রধান লক্ষ্য অর্থনৈতিক উন্নয়ন। চীনের নিকটতম সামরিক ঘাঁটি আফ্রিকার জিবুতিতে, যা মূলত লজিস্টিক সহায়তার জন্য ব্যবহৃত হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের উপসাগরীয় প্রায় সব দেশেই সামরিক ঘাঁটি রয়েছে, যা তাদের প্রভাবকে অনেক বেশি শক্তিশালী করে।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন শান্তি উদ্যোগে এখনো যুক্তরাষ্ট্র বা ইরান আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে এই উদ্যোগের মাধ্যমে শি জিনপিং নিজেকে একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বের বিপরীতে একটি ভিন্ন চিত্র তৈরি করে।
তবে চীনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্নও রয়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক, হংকংয়ের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং তাইওয়ান নিয়ে তাদের অবস্থানের কারণে। সব মিলিয়ে চীন একটি শক্তিশালী বৈশ্বিক খেলোয়াড়, যার মূল চালিকাশক্তি কৌশলগত ও অর্থনৈতিক স্বার্থ। মধ্যপ্রাচ্যে তাদের প্রভাব রয়েছে এবং ভবিষ্যতে সেটি আরও বাড়ানোর উচ্চাকাঙ্ক্ষাও স্পষ্ট। সূত্র: বিবিসি