তারা কখনো তাদের মা-বাবাকে দেখেনি, এমনকি গাজাকেও চেনেনি। প্রায় আড়াই বছর আগে, সময়ের আগেই জন্ম নেওয়ার পর তাদের মিসরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। সে সময়ে ইসরায়েলি বাহিনী তাদের নবজাতক পরিচর্যা ইউনিটের খুব কাছে চলে এসেছিল।
গত সোমবার সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়। এখন সেই ১১ শিশু অবশেষে তাদের পরিবারের সঙ্গে গাজায় পুনর্মিলিত হয়েছে। জাতিসংঘের উদ্যোগে পরিচালিত একটি মিশন আনন্দ-অশ্রু আর উদযাপনের এই মুহূর্ত তৈরি করে, একই সঙ্গে যুদ্ধের সবচেয়ে বেদনাদায়ক অধ্যায়গুলোর একটির ইতি টানে।
এই শিশুরা ছিল ২০২৩ সালের নভেম্বরে গাজার আল-শিফা হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট থেকে সরিয়ে নেওয়া শিশুদের একটি অংশ। সময়ের আগেই এসব শিশু ভূমিষ্ঠ হয়েছিল। তখন ইসরায়েলি বাহিনী হামাস সামরিক কাজে ব্যবহার করছে–এই অজুহাত দিয়ে হাসপাতালটিতে অভিযান চালায়।
যুদ্ধ চলমান এবং মিসরের সীমান্ত বন্ধ থাকায় শিশুদের সঙ্গে শুধু চিকিৎসাকর্মীরাই যেতে পেরেছিলেন, তাদের মা-বাবাকে যেতে দেওয়া হয়নি। শিশুদের একজনের মা সুন্দুস আল-কুর্দ বলেন, ‘আমি আমার মেয়েকে ছুঁতে পারিনি, আড়াই বছর ধরে তাকে কোলে নিতে পারিনি।’ গত সোমবার তিনি তার মেয়ে বিসানের সঙ্গে পুনর্মিলিত হন। তিনি বলেন, ‘আজ যেন নতুন জন্মদিন, নতুন শুরু। ইনশাআল্লাহ, আমার মেয়েকে যা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, সব আমি পূরণ করব।’
অন্যদের মতোই বিসানকে আড়াই বছর আগে ইনকিউবেটরে করে গাজা থেকে মিসরে নেওয়া হয়েছিল। এটি ছিল এমন এক যাত্রা, যা শিশুগুলোর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। চিকিৎসকদের তথ্য অনুযায়ী, মিসরে নেওয়া ২৯ শিশুর মধ্যে সাতজন মারা গেছে। যেসব শিশু গাজায় ফিরেছে তাদের সংখ্যা ১১, বাকিরা গাজার বাইরে তাদের পরিবারের সঙ্গে রয়েছে।
সুন্দুস আল-কুর্দ জানান, তিনি ভয় পাচ্ছিলেন বিসান তাকে চিনতে পারবে না। মেয়েকে স্বাভাবিক করতে তিনি তার জন্য খাবার আর একটি সবুজ বেলুন নিয়ে গিয়েছিলেন।
তিনি বলেন, ‘সে এখনো জানে না তার মা কে, বাবা কে, পরিবার কে। আমরা ধীরে ধীরে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। সময়ের সঙ্গে সব ঠিক হবে, সে আমাদের চিনবে।’
বিসানের দুই ভাইবোন ছিল। বিসানের জন্মদিনেই তার বোন হাবিবা নিহত হয়। ২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজার বেইত লাহিয়ায় তাদের বাড়িতে ইসরায়েলি বিমান হামলায় হাবিবা ও পরিবারের আরও ৯ জন সদস্য নিহত হন। তখন আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা সুন্দুস আহত হন। চিকিৎসকদের সিজারিয়ান অপারেশন করে বিসানকে বাঁচাতে হয়।
বর্তমানে পরিবারটি গাজা সিটির একটি তাঁবু শিবিরে বসবাস করছে। তিনি বলেন, ‘বিসান আমার হারানো সবকিছুর অভাব পূরণ করবে।’ শিশুদের পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের এই বিষয়টি সম্ভব হয়েছে গত অক্টোবরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া চুক্তির মাধ্যমে। এর ফলে লড়াই অনেকাংশে থেমে গেছে এবং পরে গাজার মিসর সীমান্ত পুনরায় খুলে দেওয়া হয়েছে।
দুই বছরের এই যুদ্ধে ইসরায়েল বারবার অভিযোগ করেছে, হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠী হাসপাতালগুলোকে অস্ত্র মজুত ও সুড়ঙ্গ ব্যবহারের জন্য কাজে লাগিয়েছে। তারা এ-সংক্রান্ত ছবি ও ভিডিওও প্রকাশ করেছে। তবে সেসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলো।
যুদ্ধের কারণে গাজাজুড়ে হাসপাতাল ও নবজাতক ইউনিটগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হয়েছে। আল-শিফা হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আবু সেলমিয়া বলেন, নবজাতকদের জন্য বিশেষ করে অসুস্থ শিশুদের চিকিৎসা সুবিধা এখন খুবই জরুরি। তিনি আরও জানান, অপরিণত শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় ওষুধ, বিশেষ করে দুধ এবং শ্বাস-প্রশ্বাস সহায়তার ওষুধের মারাত্মক সংকট রয়েছে। তার মতে, গাজায় বর্তমানে প্রায় ৫২ শতাংশ মৌলিক ওষুধ এবং ৭৫ শতাংশ চিকিৎসা সরঞ্জাম অনুপস্থিত। সূত্র: রয়টার্স