ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ নিয়ে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছে ব্রিকস জোটে। টানা দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠকেও এই ইস্যুতে কোনো যৌথ অবস্থানে পৌঁছাতে পারেনি সদস্য দেশগুলো। বিশেষ করে নতুন সদস্য ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরাসরি বিরোধ এই উদীয়মান অর্থনৈতিক জোটের ঐক্যকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ঠেলে দিয়েছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের দুই দিনের বৈঠক গত শুক্রবার শেষ হয়েছে। তবে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার যুদ্ধ নিয়ে সদস্যদের মধ্যে মতভেদ থাকায় দেশগুলো কোনো ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি। জোটের সমাপনী নথিতে কেবল এটুকুই বলা হয়েছে, এই ইস্যুতে সদস্যদের মধ্যে ‘মতপার্থক্য’ রয়েছে।
এ নিয়ে ভারতে অনুষ্ঠিত ব্রিকসের টানা দুটি বৈঠকই ঐকমত্য পৌঁছাতে ব্যর্থ হলো। গত বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লির ভারত মণ্ডপমে বৈঠক শুরু হয়। সভাপতিত্ব করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। ২০২৬ সালে ভারতের ব্রিকস প্রেসিডেন্সির অধীনে এটিই প্রথম বড় কোনো মন্ত্রী পর্যায়ের সম্মেলন। মূলত গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণ বিশ্বের দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালো করার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করা এই জোটের রাষ্ট্রপ্রধানদের শীর্ষ সম্মেলন আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে হওয়ার কথা রয়েছে।
উদীয়মান অর্থনীতির ১০ সদস্যের এই জোট অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তা বিষয়ে একসঙ্গে কাজ করে। পশ্চিমা দেশগুলোর দীর্ঘদিনের আধিপত্য থাকা বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে গ্লোবাল সাউথ বা দক্ষিণের দেশগুলোর কণ্ঠস্বর জোরালো করাই এর লক্ষ্য। আগামী সেপ্টেম্বরে ভারতে এই জোটের শীর্ষ সম্মেলন হওয়ার কথা রয়েছে।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের সামরিক ঘাঁটি, পারমাণবিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার মাধ্যমে এই সংঘাত শুরু হয়। এরপর থেকে ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম দ্রুত বেড়ে যায়। গত মাসে ইসলামাবাদে পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় আলোচনাসহ সব ধরনের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির হয়ে পড়েছে। গত ১৩ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধও জারি করে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই দিল্লিতে বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়।
এদিকে এই ব্রিকস বৈঠকের সময়ই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চীন সফরে ছিলেন। প্রায় এক দশকের মধ্যে এটি ছিল কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের প্রথম বেইজিং সফর। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বেইজিংয়ে থাকায় ব্রিকস বৈঠকে চীনের প্রতিনিধিত্ব করেন ভারতে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত শু ফেইহং।
ইরানের আব্বাস আরাগচির পাশাপাশি বৈঠকে অংশ নেন রাশিয়ার সের্গেই লাভরভ, ব্রাজিলের মাউরো ভিয়েইরা, দক্ষিণ আফ্রিকার রোনাল্ড লামোলা এবং ইন্দোনেশিয়া, মিসর ও ইথিওপিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আবুধাবি সফরে যাওয়ার আগে বৈঠকের ফাঁকে সফররত মন্ত্রীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের পক্ষে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বদলে দেশটির প্রতিমন্ত্রী খলিফা বিন শাহিন আল মারার অংশ নেন।
ইরান-আমিরাত মুখোমুখি অবস্থান
বৈঠক শুরুর পর আনুষ্ঠানিক বক্তব্যে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি প্রথমে সংযুক্ত আরব আমিরাতের নাম উল্লেখ এড়িয়ে যান। পরে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, এটি দুর্বলতা নয়, বরং ঐক্য বজায় রাখার স্বার্থে তিনি তা করেছিলেন বলে জানিয়েছেন।
আরাগচি ব্রিকস সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানান, তারা যেন স্পষ্ট ভাষায় ইরানের ওপর চালানো যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের নিন্দা জানায়। একই সঙ্গে যুদ্ধবাজি বন্ধ করতে ও জাতিসংঘের সনদ লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি নিশ্চিত করতে বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নেওয়ারও আহ্বান জানান। তিনি বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, আরও ন্যায়ভিত্তিক, ভারসাম্যপূর্ণ ও মানবিক বৈশ্বিক ব্যবস্থা গঠনে ব্রিকস অন্যতম প্রধান শক্তি হতে পারে এবং হওয়া উচিত। এমন একটি ব্যবস্থা যেখানে জোর যার মুলুক তার–এই নীতি চলবে না।’
অন্যদিকে আমিরাতের প্রতিনিধি আল মারার নিজের বক্তব্যে সরাসরি ইরানের সমালোচনা করেন। বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিনি ইরানের কর্মকাণ্ডের নিন্দা জানানোর আহ্বানও তোলেন।
এই পাল্টাপাল্টি অবস্থান সম্প্রসারিত ব্রিকস জোটের সবচেয়ে বড় বিভাজনকে সামনে এনেছে। কারণ ইরান ও আমিরাত দুই দেশই এখন পূর্ণ সদস্য হলেও চলমান সংঘাতে তারা বিপরীত অবস্থানে রয়েছে।
সব সদস্য দেশের বক্তব্য শেষ হওয়ার পর আবারও কথা বলার সুযোগ চান আরাগচি। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, আরাগচি সভায় বলেন, ‘আমার দেশের বিরুদ্ধে আগ্রাসনে আমিরাত সরাসরি জড়িত ছিল। হামলা শুরুর পর তারা একটি নিন্দাও জানায়নি।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘ইরানে হামলা চালাতে আমিরাত তাদের ভূখণ্ড ব্যবহার করতে যুক্তরাষ্ট্রকে অনুমতি দিয়েছে। এমনকি আমিরাতের যুদ্ধবিমানও হামলায় সরাসরি অংশ নিয়েছে।’
ইরানের বার্তা সংস্থা আইআরএনএয়ের বরাত দিয়ে আরাগচি বলেন, ‘গতকালই প্রকাশ পেয়েছে যে ইউএইয়ের ফাইটার জেট আমাদের বিরুদ্ধে হামলায় অংশ নিয়েছে এবং সরাসরি ব্যবস্থা নিয়েছে। তাই সংযুক্ত আরব আমিরাত এই আগ্রাসনের একজন সক্রিয় অংশীদার।’
সংঘাতের প্রথম দিনে মিনাব শহরের একটি স্কুলে হামলার নিন্দা না জানানোর জন্যও আবুধাবির সমালোচনা করেন আরাগচি। ইরানের দাবি, ওই হামলায় প্রায় ১৭০ শিক্ষার্থী নিহত হন। তিনি বলেন, ‘ইরান আমিরাতে হামলা চালায়নি। শুধু আমিরাতের ভূখণ্ডে থাকা মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে।’
সংযুক্ত আরব আমিরাত অবশ্য এই দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে। আবুধাবির দাবি, ইরানের হামলায় তাদের দেশের ভেতরের জ্বালানি অবকাঠামো এবং বেসামরিক স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে তারা ইরানের ২ হাজার ৮০০-এরও বেশি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করেছে। ইউএই প্রতিনিধি আল মারার আবারও তাদের জ্বালানি অবকাঠামোসহ বিভিন্ন স্থাপনায় ইরানি হামলার নিন্দা জানানোর দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন।
সভায় ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী জয়শঙ্কর সভাপতি হিসেবে এই বিবাদ সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তিনি হরমুজ প্রণালি ও লোহিত সাগরসহ আন্তর্জাতিক জলপথ দিয়ে ‘নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন জাহাজ চলাচল নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে তিনি বলেন, একতরফা নিষেধাজ্ঞা কখনো আলোচনার বিকল্প হতে পারে না এবং চাপ প্রয়োগ করে কূটনীতির কাজ হয় না।
তিনি আরও বলেন, ‘ব্রিকসের কার্যক্রম নির্বিঘ্ন রাখতে হলে নতুন সদস্যদেরও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন ইস্যুতে ব্রিকসের ঐকমত্য ও অবস্থান পুরোপুরি বুঝে তা মেনে নিতে হবে।’
বৈঠকের ফাঁকে জয়শঙ্কর আরাগচির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে তিনি জানান, আঞ্চলিক পরিস্থিতি ও দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে তাদের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে।
ঐকমত্যে ফাটল
এটি ভারতে প্রথম ব্রিকস বৈঠক নয়। গত ২৪ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে ব্রিকসের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূতদের বৈঠকের আয়োজন করেছিল ভারত। সেই বৈঠকও যৌথ বিবৃতি ছাড়াই শেষ হয়। ভারত শুধু সভাপতির সারসংক্ষেপ প্রকাশ করেছিল। ইরান চেয়েছিল, বিবৃতিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যে সংঘাত শুরু করেছে তা স্বীকার করা হোক। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত চেয়েছিল উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানের হামলার নিন্দা জানানো হোক।
২৮ ফেব্রুয়ারির পর থেকে ভারতের সভাপতিত্বে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ব্রিকস একটি যৌথ বিবৃতিও দিতে পারেনি। এ সপ্তাহের বৈঠক শেষে প্রকাশিত নথিতেও সেই অচলাবস্থা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।