দীর্ঘদিনের স্থবির কূটনৈতিক সম্পর্ক আবারও নতুন করে শুরু করতে যাচ্ছে ভারত ও পাকিস্তান। ইতোমধ্যে সংলাপ শুরুর বিষয় নিয়ে আলোচনা শুরু করেছে দুই প্রতিবেশী দেশ। সম্প্রতি উভয় দেশের রাজনৈতিক ও সামরিক অঙ্গনে কিছু মন্তব্য এবং সীমিত পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক বৈঠককে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে সংলাপ পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে জল্পনা তৈরি হয়েছে। তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ফিরে যাওয়া এখনো কঠিন ও অনিশ্চিত।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির রাজনৈতিক আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে পরিচিত রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসাবালে সম্প্রতি পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপ শুরুর আহ্বান জানান।
ভারতের একটি সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে দত্তাত্রেয় হোসাবালে বলেন, ‘আমাদের দরজা বন্ধ করা উচিত নয়। আলোচনায় বসতে সবসময় প্রস্তুত থাকা উচিত।’ তার এই বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। মোদি সরকারের দীর্ঘদিনের পাকিস্তানবিরোধী অবস্থান এই সংলাপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হওয়ায় বিরোধীরা প্রশ্ন তুলেছে।
ভারত বরাবরই দাবি করে আসছে, কাশ্মীর ও ভারতের বিভিন্ন শহরে হামলা চালানো সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা দিচ্ছে পাকিস্তান। এ কারণে মোদি সরকার বহুবার বলেছে, ‘সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।’ ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পাহালগামে বন্দুকধারীদের হামলায় ২৬ পর্যটক নিহত হওয়ার জেরে ২০২৫ সালে চার দিনের যুদ্ধও হয়েছিল।
হোসাবালের বক্তব্যকে স্বাগত জানিয়েছে পাকিস্তান। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি বলেন, সংলাপ শুরুর বিষয়ে ভারতের পক্ষ থেকে কোনো ‘আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া’ আসে কি না, তার অপেক্ষায় ইসলামাবাদ।
তবে এক সপ্তাহ পার হলেও মোদি সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি। এর মধ্যেই ভারতের আরও কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি সংলাপের পক্ষে মত দিয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ নারাভানে। মুম্বাইয়ে এক বই প্রকাশ অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, ‘সাধারণ মানুষের সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক নেই। জনগণের মধ্যে বন্ধুত্ব রাষ্ট্রের সম্পর্ক উন্নত করতে সাহায্য করে।’
পাকিস্তানের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। তাহির আন্দ্রাবি বলেন, ‘আমরা আশা করি ভারতে সুস্থ চিন্তার জয় হবে এবং যুদ্ধমুখী অবস্থান থেকে সরে এসে আরও এমন কণ্ঠস্বর সামনে আসবে।’
যদিও আরএসএস সরকার পরিচালনা করে না, তবে মোদিসহ বিজেপির অধিকাংশ শীর্ষ নেতা দীর্ঘদিন ধরে সংগঠনটির সঙ্গে যুক্ত। ফলে হোসাবালের মন্তব্যকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারতীয় রাজনীতিবিষয়ক অধ্যাপক ইরফান নূরউদ্দিন বলেন, পাকিস্তানবিরোধী অবস্থানের কারণে মোদি সরকার ‘কোণঠাসা’ হয়ে পড়েছে। তার মতে, সরকার সরাসরি সংলাপ শুরু করলে রাজনৈতিকভাবে সমস্যার সম্মুখীন হতে পারে। তাই আরএসএস বা অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে আলোচনার পক্ষে মত আসা বিজেপির জন্য রাজনৈতিক সুরক্ষা তৈরি করছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সংলাপের আহ্বান হঠাৎ করে আসেনি। সাবেক পাকিস্তানি কূটনীতিক জওহর সালিম জানান, ২০২৫ সালের যুদ্ধের পর থেকে গত এক বছরে উভয় দেশের সাবেক কর্মকর্তা, অবসরপ্রাপ্ত জেনারেল, গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও সংসদ সদস্যদের অংশগ্রহণে অন্তত চারটি বৈঠক হয়েছে। বৈঠকগুলো ওমানের রাজধানী মাস্কাট, কাতারের রাজধানী দোহা, থাইল্যান্ড ও লন্ডনে অনুষ্ঠিত হয়।
এই বৈঠকগুলো ট্র্যাক-১ দশমিক ৫ ও ট্র্যাক-২ কূটনৈতিক কাঠামোর আওতায় অনুষ্ঠিত হয়েছে। ট্র্যাক-১ দশমিক ৫ ফরম্যাট বলতে এমন একটি সভাকে বোঝায়, যেখানে উভয়পক্ষ থেকে কর্মরত কর্মকর্তা ও অবসরপ্রাপ্ত আমলা, সামরিক কর্মকর্তা এবং সুশীল সমাজের সদস্যরা উপস্থিত থাকেন। আর ট্র্যাক-২ বৈঠকে সাবেক কর্মকর্তা ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা সরকারের সমর্থনে অংশ নেন। সাধারণত আনুষ্ঠানিক কূটনীতির আগে পরিস্থিতি যাচাই করতে এসব পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়।
সালিমের মতে, এসব অনানুষ্ঠানিক সংলাপ ভুল বোঝাবুঝি কমাতে এবং ভবিষ্যৎ আনুষ্ঠানিক আলোচনার পথ তৈরি করতে সহায়ক হয়েছে। তবে সাবেক পাকিস্তানি মেজর জেনারেল ও ব্রুনাইয়ে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত তারিক রশিদ খান সতর্ক করে বলেন, এসব সংলাপকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া ঠিক হবে না। তার ভাষায়, ‘ট্র্যাক-১ দশমিক ৫ ও ট্র্যাক-২ সংলাপ আনুষ্ঠানিক কূটনীতির বিকল্প নয়, বরং এটি একটি সুরক্ষা ভালভ।’
এদিকে সাম্প্রতিক সময়ে ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও বড় পরিবর্তন এসেছে। ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতির পর পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক অবস্থান অনেক শক্তিশালী হয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করেন।
অন্যদিকে বাণিজ্য শুল্ক ও অভিবাসন নীতিকে কেন্দ্র করে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কেও টানাপড়েন দেখা দিয়েছে। ফলে ওয়াশিংটনের ওপর আগের মতো প্রভাব ধরে রাখা দিল্লির জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ইরফান নূরউদ্দিন বলেন, ‘ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বদলে গেছে। আগে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্কের কারণে ভারত পাকিস্তানকে সহজেই উপেক্ষা করতে পারত, এখন আর সেটা সম্ভব নয়।’ তবে সাম্প্রতিক কিছু ঘটনা দেখাচ্ছে, উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি কমেনি। ১৬ মে নয়াদিল্লিতে এক অনুষ্ঠানে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী বলেন, পাকিস্তান যদি ‘সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া’ বন্ধ না করে, তাহলে দেশটিকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা ‘ভূগোলের অংশ থাকবে নাকি ইতিহাসে পরিণত হবে।’
এর জবাবে পাকিস্তানের সামরিক গণমাধ্যম শাখা আইএসপিআর ভারতীয় বক্তব্যকে ‘অহংকারী, যুদ্ধবাদী ও সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির’ বলে আখ্যা দেয়। আইএসপিআর সতর্ক করে জানায়, পারমাণবিক শক্তিধর প্রতিবেশীকে মানচিত্র থেকে মুছে ফেলার হুমকি কৌশলগত সংকেত নয়, বরং ‘চিন্তাশক্তির দেউলিয়াত্বের’ পরিচয়।
এ ছাড়া নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগে শহরে অবস্থিত আন্তর্জাতিক সালিশি আদালত ১৫ মে সিন্ধু নদ ব্যবস্থার ভারতীয় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প নিয়ে একটি রায় দেয়। পাকিস্তান সেই রায়কে স্বাগত জানালেও ভারত সেটিকে ‘অবৈধ’ বলে প্রত্যাখ্যান করে।
২০২৫ সালে পাহালগাম হামলার পর ভারত সিন্ধুর পানিচুক্তি স্থগিত করে। সিন্ধু নদ দুই দেশের মধ্যে পানি বণ্টনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি ছিল এবং অতীতে তিনটি যুদ্ধের মধ্যেও এই নদের পানি বণ্টন বহাল ছিল।
বিশ্লেষকরা বলছেন, ভারতীয় কৌশলগত মহলে পাকিস্তানের সঙ্গে সংলাপ পুনরায় শুরু করা নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে আনুষ্ঠানিক আলোচনায় ফেরার মতো রাজনৈতিক সদিচ্ছা এখনো স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে না। সূত্র: আল-জাজিরা