ইউরোপে প্রথমবারের মতো শনাক্ত হয়েছে আক্রমণাত্মক প্রজাতির সাউদার্ন জায়ান্ট হর্নেট, যা সাধারণভাবে ‘মার্ডার হর্নেট’ নামে পরিচিত। স্পেনের গবেষকরা ধারণা করছেন, এই প্রজাতি সেখানে একটি বাসা তৈরি করেছে। তবে তারা এখনো সেটি খুঁজে বের করার চেষ্টা করছেন।
এই হর্নেটের বৈজ্ঞানিক নাম ভেসপা সরোর (Vespa soror)। এদের মূলত এশিয়ার ভারত, চীন, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে পাওয়া যায়। এদের দৈর্ঘ্য গড়ে ২ ইঞ্চি পর্যন্ত হতে পারে। ‘মার্ডার হর্নেট বা ‘খুনি হর্নেট’ নামে পরিচিতি পাওয়ার কারণ, এরা মৌচাক আক্রমণ করে ধ্বংস করে দেয়
সম্প্রতি ‘ইকোলজি অ্যান্ড ইভোল্যুশন’ নামের জার্নালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্পেনের উত্তরাঞ্চলীয় শহর সিয়েরোতে এ প্রজাতি দুটি ভিন্ন ভিন্ন সময়ে দেখা গেছে। প্রথমবার ২০২২ সালের মার্চে দুটি এবং দ্বিতীয়বার ২০২৩ সালের অক্টোবরে আরও দুটি হর্নেট শনাক্ত করা হয়। গবেষকরা মনে করছেন, এ প্রজাতির বাসাটি অন্তত এক বছর পুরোনো।
সাউদার্ন জায়ান্ট হর্নেটের ঘনিষ্ঠ প্রজাতি নর্দার্ন জায়ান্ট হর্নেট প্রথমবারের মতো ২০১৯ সালের শেষদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটন রাজ্যে দেখা যায়। দুই প্রজাতির আচরণ ও গঠনে বেশ মিল আছে। তবে নর্দার্ন হর্নেটের বাসার স্থায়িত্বকাল তুলনামূলকভাবে কম হয়। এরা সাধারণত ছোট আকারের কলোনি তৈরি করে।
যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া প্রথম নর্দার্ন জায়ান্ট হর্নেটের বাসাটি ২০২০ সালের অক্টোবরে দ্রুত ধ্বংস করা হয়। তবে পরের বছরেও ওয়াশিংটনে একটি জীবন্ত হর্নেট দেখা যায়
স্পেনে সাউদার্ন জায়ান্ট হর্নেট শনাক্ত হওয়ার পর গবেষকরা এই আক্রমণাত্মক প্রজাতির বাসা খুঁজে তা ধ্বংস করার জন্য চেষ্টা চালাচ্ছেন। এই হর্নেট খাবারের জন্য স্থানীয় মৌমাছি ও অন্যান্য পতঙ্গ শিকার করে। এর ফলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য বিঘ্নিত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
২০২১ সালের এক গবেষণায় বলা হয়েছে, সাউদার্ন জায়ান্ট হর্নেট শিকার খুঁজে বের করতে প্রথমে স্কাউট বা গোয়েন্দা দল পাঠায়। দলটি শিকার খুঁজে পেলে অন্যদের যোগ দেওয়ার জন্য সঙ্কেত দেয়। এরপর তারা ‘ধ্বংসযজ্ঞ’ শুরু করে, যেখানে তারা কয়েক ঘণ্টার মধ্যে পুরো মৌচাক ধ্বংস করে দিতে পারে।
স্পেনে নথিভুক্ত চারটি ছাড়া ইউরোপের অন্য কোথাও এখন পর্যন্ত সাউদার্ন বা নর্দার্ন জায়ান্ট হর্নেট পাওয়া যায়নি। গবেষকদের ধারণা, সম্ভবত হর্নেটগুলো প্রথমে কার্গো জাহাজের মাধ্যমে স্পেনে এসেছে।
গবেষক ইউনিভার্সিটি অব ওভিয়েদোর প্রাণিবিদ্যার অধ্যাপক ওমর সানচেজ বলেন, ‘এই হর্নেটের বাসা মাটির ৩০ মিটার গভীরে তৈরি হয়, যা খুঁজে বের করা বেশ কঠিন। আমরা বাসাটি খুঁজে ধ্বংস করার চেষ্টা করছি।’
সানচেজ বলেন, এই হর্নেটের উপস্থিতি মৌমাছি, প্রজাপতি, মথ ও মাছির মতো স্থানীয় পতঙ্গের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে। দীর্ঘমেয়াদে মৌমাছির সংখ্যা কমে গেলে মধুর উৎপাদন ও গাছপালার পরাগায়ন প্রক্রিয়া ব্যাহত হবে।
তিনি আরও জানান, ‘উত্তর স্পেনে এশিয়ান হর্নেটের আরেকটি প্রজাতি ‘ভেসপা ভেলুটিনা’ (Vespa velutina) ইতোমধ্যে মৌমাছি পালনের ক্ষেত্রে গুরুতর ক্ষতি করছে। নতুন এই প্রজাতি সেই সমস্যাকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে।’
গবেষকরা স্থানীয়দের হর্নেট শনাক্ত করতে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করছেন। তাদের মতে, এই প্রজাতি ভবিষ্যতে ইউরোপের আরও এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্পেনে চারটি সাউদার্ন জায়ান্ট হর্নেট শনাক্ত করার পর গবেষকরা এ প্রজাতির বিস্তার রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশ করেছেন। স্থানীয় মৌমাছি পালনকারীদের তথ্যের ভিত্তিতে হর্নেটগুলো ধরা হয়। পরে ডিএনএ পরীক্ষা ও জিনগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে এর প্রজাতি নিশ্চিত করা হয়।
গবেষক দলের প্রধান ওমর সানচেজ জানান, সঠিক শনাক্তকরণ বিস্তার রোধের প্রথম ধাপ। টেক্সাস এ অ্যান্ড এম ইউনিভার্সিটির কীটতত্ত্ববিদ মলি কেক বলেন, ‘ডিএনএ বিশ্লেষণের মাধ্যমে প্রজাতি নিশ্চিত করার পর জনসাধারণ ও মৌমাছি পালনকারীদের এ বিষয়ে সচেতন করা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে সতর্ক করাও প্রয়োজন- যেন কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও পরিকল্পনা তৈরি করা যায়।’
মলি কেক আরও বলেন, ‘বেশির ভাগ আক্রমণাত্মক প্রজাতি বন্দরনগরী থেকে প্রবেশ করে। তাই কার্গো জাহাজগুলোতে কোয়ারেন্টিন ও চেকিং প্রক্রিয়া আরও জোরদার করতে হবে।’
সানচেজ সতর্ক করে বলেছেন, ‘স্পেনে এই প্রজাতি শনাক্ত হওয়া ইঙ্গিত দেয়, ভবিষ্যতে এটি আবারও অন্যান্য এলাকায় দেখা যেতে পারে। এটি ইউরোপেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
গবেষকরা মনে করছেন, সাউদার্ন জায়ান্ট হর্নেটের বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক মানের সতর্কতা ও স্থানীয় পর্যায়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষায় দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। সূত্র: এনবিসি নিউজ


