চাঁদের পৃষ্ঠ এখনো কাঁপছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, পৃথিবীর এই একমাত্র উপগ্রহে নিয়মিত ভূমিকম্প বা ‘মুনকোয়েক’ হচ্ছে। সম্প্রতি স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের একদল গবেষক চাঁদের ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তনের একটি নতুন মানচিত্র তৈরি করেছেন। এই মানচিত্র থেকে চাঁদের বিশাল অন্ধকার সমতল ভূমিতে অসংখ্য ছোট শৈলশিরা বা ‘মেয়ার রিজ’-এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এই শৈলশিরাগুলো চাঁদের ভূ-গাঠনিক (টেকটোনিক) সক্রিয়তার বড় প্রমাণ।
গবেষকদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, চাঁদের ৪০০ কোটি বছরের ইতিহাসে এই শৈলশিরাগুলো তুলনামূলকভাবে নতুন। এর আগে ধারণা করা হতো, মূলত পৃথিবীর মহাকর্ষীয় টান, চাঁদের অভ্যন্তরীণ গঠন ও উল্কাপাতের কারণে সেখানে ভূমিকম্প হয়। তবে নতুন এই মানচিত্র ভূমিকম্পের সম্পূর্ণ নতুন কিছু উৎসের সন্ধান দিয়েছে। নাসার ‘আর্টেমিস’ মিশনের মাধ্যমে চাঁদে পুনরায় মানুষ পাঠানোর যে তোড়জোড় চলছে, সেখানে এই আবিষ্কার বড় প্রভাব ফেলতে পারে।
স্মিথসোনিয়ান ইনস্টিটিউশনের সেন্টার ফর আর্থ অ্যান্ড প্ল্যানেটারি স্টাডিজের গবেষক কোল নিপ্যাভার এক বিবৃতিতে বলেন, এই গবেষণা চাঁদের সাম্প্রতিক ভূ-তাত্ত্বিক পরিবর্তন সম্পর্কে একটি বৈশ্বিক ধারণা দেয়। এটি চাঁদের অভ্যন্তরীণ তাপীয় ও ভূমিকম্পের ইতিহাস বুঝতে সাহায্য করবে। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে কোথায় এবং কতটা শক্তিশালী ভূমিকম্প হতে পারে, সে সম্পর্কেও ধারণা পাওয়া যাবে।
বিজ্ঞানীরা চাঁদের নিকটতম অংশের সমতল ভূমিতে ১ হাজার ১০০টিরও বেশি নতুন শৈলশিরা খুঁজে পেয়েছেন। এর ফলে চাঁদে এ পর্যন্ত আবিষ্কৃত শৈলশিরার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৬০০-এর বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, এই শৈলশিরাগুলোর গড় বয়স প্রায় ১২ কোটি ৪০ লাখ বছর, যা চাঁদের মোট বয়সের তুলনায় খুব কম।
গবেষকরা লক্ষ্য করেছেন, এই শৈলশিরাগুলোর সঙ্গে চাঁদের পাহাড়ি এলাকায় আগে দেখা বাঁকানো পাহাড় বা ‘লোবেট স্কার্প’-এর মিল রয়েছে। চাঁদের ভূ-ত্বকের ভেতরের চাপের কারণে গত ১০০ কোটি বছরের মধ্যে এই পাহাড়গুলো তৈরি হয়েছে। গবেষক নিপ্যাভার জানিয়েছেন, অ্যাপোলো মিশনের সময় থেকে উঁচু ভূমিতে এই পাহাড়গুলোর অস্তিত্ব সম্পর্কে জানা ছিল। তবে এবার প্রথম চাঁদের সমতল ভূমিতেও একই ধরনের ভূ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের ব্যাপক উপস্থিতির প্রমাণ মিলল।
এই নতুন তথ্য মহাকাশচারীদের নিরাপত্তার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চাঁদের সমতল এলাকাগুলোতেও ভূমিকম্পের ঝুঁকি থাকায় ভবিষ্যৎ বসতি স্থাপনের ক্ষেত্রে নাসা ও অন্যান্য সংস্থাকে নতুন করে ভাবতে হতে পারে। নাসা ২০২৭ সালের দিকে আর্টেমিস প্রোগ্রামের আওতায় পুনরায় চাঁদে মানুষ নামানোর পরিকল্পনা করছে। দীর্ঘ ৫০ বছর পর এটি হতে যাচ্ছে মানুষের চন্দ্রপৃষ্ঠে ফেরার বড় অভিযান। চাঁদে স্থায়ী ঘাঁটি তৈরির যে স্বপ্ন বিজ্ঞানীরা দেখছেন, তার সুরক্ষা নিশ্চিত করতে সেখানকার ভূমিকম্পের উৎসগুলো জানা জরুরি।
২০১৯ সালে নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির গবেষক নাথান উইলিয়ামস জানিয়েছিলেন, চাঁদ এখনো তার নিজস্ব অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়ার কারণে কাঁপছে। কোটি কোটি বছর ধরে তাপ হারানোর ফলে চাঁদ ধীরে ধীরে সংকুচিত হচ্ছে এবং ঘনত্ব বাড়ছে। এর ফলে উপরিভাগে ভাঁজ পড়ে ফাটল ও শৈলশিরার সৃষ্টি হচ্ছে। চাঁদের এই সংকোচন এবং নিয়মিত কম্পন ভবিষ্যৎ চন্দ্রাভিযানের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে।


