কল্পবিজ্ঞান সিনেমার মতো মনে হলেও অদূর ভবিষ্যতে চাঁদের বুকে স্বয়ংক্রিয় রোবটকে খনি খনন করতে দেখা যেতে পারে। বর্তমানে পৃথিবীর বেশ কিছু বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চাঁদের খনিজ সম্পদ আহরণ করে পৃথিবীতে আনার লক্ষ্যে কাজ শুরু করেছে। মূলত চাঁদের বুকে থাকা ‘হিলিয়াম-৩’ নামের একটি দুর্লভ গ্যাস সংগ্রহের জন্য এই দৌড়ঝাঁপ শুরু হয়েছে। পৃথিবীতে এ গ্যাসের পরিমাণ অত্যন্ত নগণ্য হলেও কোয়ান্টাম কম্পিউটার ও পারমাণবিক ফিউশন প্রযুক্তিতে এর গুরুত্ব অপরিসীম।
সিয়াটলভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টারলুন’ এই খনিজ আহরণ দৌড়ে অন্যতম অগ্রগামী নাম। এর প্রতিষ্ঠাতা রব মেয়ারসন এক সময় নাসার স্পেস শাটল প্রোগ্রামে কাজ করতেন এবং জেফ বেজোসের ব্লু অরিজিন প্রতিষ্ঠানের বড় কর্মকর্তা ছিলেন। মেয়ারসন মনে করেন, চাঁদে খনি খনন এখন আর ‘যদি’ এর বিষয় নয়, বরং এটি এখন ‘কবে’ শুরু হবে সেই প্রশ্ন। ইতোমধ্যে তিনি বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ কোটি ৮০ লাখ ডলার তহবিল সংগ্রহ করেছেন। তার লক্ষ্য চাঁদ থেকে হিলিয়াম-৩ সংগ্রহ করে পৃথিবীতে আনা, কারণ এর বাজারমূল্য এতটা বেশি যে মহাকাশ অভিযানের খরচ মেটানো সম্ভব।
চাঁদে প্রায় ৫০ বছর ধরে মানুষের পা পড়েনি। তবে সম্প্রতি নাসা ‘আর্টেমিস’ মিশনের মাধ্যমে আবারও নভোচারীদের চাঁদে পাঠানোর অভিযান পরিচালনা করছে। একই সঙ্গে চীনও এই দশকের মধ্যে চাঁদে মানুষ নামানোর লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করেছে। ব্লু অরিজিন ও স্পেসএক্স-এর মতো বেসরকারি মহাকাশ সংস্থাগুলোর প্রসারের ফলে এখন মহাকাশ যাত্রা আগের চেয়ে সাশ্রয়ী হয়েছে। জাপানের ‘আইস্পেস’ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘ম্যাগনা পেট্রা’-এর মতো প্রতিষ্ঠানগুলোও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে চাঁদের ধূলিকণা বা রেগোলিথ থেকে হিলিয়াম-৩ সংগ্রহের উপায় খুঁজছে।
তবে এই বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড নিয়ে বিজ্ঞানীদের মধ্যে নৈতিক ও পরিবেশগত উদ্বেগ বাড়ছে। কলরাডো স্কুল অব মাইনসের পরিচালক অ্যাঞ্জেল আব্বুদ-মাদ্রিদ সতর্ক করে বলেন, চাঁদ হাজার বছর ধরে মানুষের শ্রদ্ধা ও ধর্মের প্রতীক হয়ে আছে। এখানে যত্রতত্র খনন কাজ চালালে এর আদি পরিবেশ নষ্ট হতে পারে। এ ছাড়া জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের আশঙ্কা, চাঁদে খনি খনন শুরু হলে সেখানে স্থাপিত সংবেদনশীল বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতি বা টেলিস্কোপের কাজে ব্যাঘাত ঘটবে। বিশেষ করে চাঁদের মেরু অঞ্চল ও অন্ধকার দিকটি মহাকাশ পর্যবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা রক্ষা করা জরুরি।
আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইন অনুযায়ী, কোনো দেশ চাঁদের মালিকানা দাবি করতে পারে না। কিন্তু বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিষয়ে আইনে স্পষ্ট কোনো নির্দেশনা নেই। মেয়ারসনের মতে, চীন যেভাবে দ্রুত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, তাতে পাশ্চাত্য ও আমেরিকার সেখানে শক্তিশালী উপস্থিতি থাকা প্রয়োজন। ২০২৪ সালে চীনের চ্যাং-ই ৬ মিশন সফলভাবে চাঁদের অন্ধকার পাশ থেকে মাটির নমুনা নিয়ে এসেছে, যাতে হিলিয়াম-৩ এর উপস্থিতি পাওয়া গেছে। ধারণা করা হচ্ছে, আগামী কয়েক দশকে চাঁদের খনিজ সম্পদ নিয়ে দেশগুলোর মধ্যে ক্ষমতার লড়াই আরও তীব্র হবে।


