কারও কাছে পাঁচ সংখ্যাটি মানে লাল রং, আবার কারও কাছে বর্ণমালার একটি অক্ষর বিশেষ কোনো রঙের সংকেত। মানুষের এই বিচিত্র স্নায়বিক অবস্থাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় ‘সিনেস্থেশিয়া’। দীর্ঘকাল ধরে একে কেবল মনের কল্পনা মনে করা হলেও নতুন এক গবেষণায় দেখা গেছে, এটি মোটেও নিছক কল্পনা নয়। সিনেস্থেশিয়ায় আক্রান্ত ব্যক্তিরা যখন মনে মনে কোনো রং দেখেন, তখন তাদের চোখের মণি ঠিক সেভাবে সাড়া দেয়, যেন তারা বাস্তবে সেই রংটি দেখছেন।
গত ৬ মার্চ বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ই-লাইফ’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় বলা হয়েছে, সিনেস্থেশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিদের মস্তিষ্ক অভ্যন্তরীণভাবে তৈরি রং এবং বাস্তবের দৃশ্যমান রঙের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না। গবেষকরা দেখেছেন, এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারীদের চোখের মণি (পিউপিল) অবচেতনভাবে সংকুচিত বা প্রসারিত হয়। যখন তারা মনে মনে কোনো উজ্জ্বল রঙের কথা ভাবেন, তখন তাদের চোখের মণি ছোট হয়ে যায়। আবার অন্ধকার বা গাঢ় কোনো রঙের অনুভূতির সময় মণি বড় হয়ে যায়। যদিও বাস্তবে তাদের সামনে থাকা পর্দাটি সবসময় ধূসর রঙের থাকে।
অস্ট্রেলিয়ার ম্যাকুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক রেবেকা কিও বলেন, এই গবেষণা প্রমাণ করে যে সিনেস্থেশিয়া কেবল একটি চিন্তার প্রক্রিয়া নয়, এটি সরাসরি শারীরিক প্রতিক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত। সাধারণত তীব্র আলো থেকে রেটিনাকে রক্ষা করতে আমাদের চোখের মণি ছোট হয়ে আসে এবং অন্ধকারে বেশি আলো প্রবেশের জন্য বড় হয়। বিড়ালদের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন খুব দ্রুত ও স্পষ্ট হলেও মানুষের চোখে এটি মাত্র কয়েক মিলিমিটারের ব্যবধানে ঘটে। সিনেস্থেশিয়া আক্রান্তদের ক্ষেত্রে এই স্বয়ংক্রিয় রিফ্লেক্স তাদের মনের রঙের ওপর ভিত্তি করে কাজ করে।
বিশ্বের প্রায় ৪ শতাংশ মানুষের মধ্যে কোনো না কোনো ধরনের সিনেস্থেশিয়া থাকে। সবচেয়ে সাধারণ ধরনটি হলো ‘গ্রাফিম-কালার সিনেস্থেশিয়া’, যেখানে মানুষ অক্ষর বা সংখ্যাকে নির্দিষ্ট রং হিসেবে দেখে। নেদারল্যান্ডসের ইউট্রেখ্ট ও আমস্টারডাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা ১৬ জন সিনেস্থেশিয়া আক্রান্ত ব্যক্তির ওপর এই পরীক্ষা চালান। তাদের চোখের মণির পরিবর্তন মাপার জন্য ‘আই ট্র্যাকার’ যন্ত্র ব্যবহার করা হয়। পরীক্ষায় দেখা গেছে, যখন তারা শূন্য (০) সংখ্যাটি দেখেন, যা তাদের মনে সাদা বা হালকা ধূসর রঙের অনুভূতি দেয়, তখন তাদের চোখের মণি সংকুচিত হয়ে যায়। আবার ৯ সংখ্যাটি দেখার সময়, যা তাদের কাছে গাঢ় নীল বা কালো রঙের মতো মনে হয়, তখন মণি প্রসারিত হয়।
গবেষণার দ্বিতীয় ধাপে সাধারণ মানুষদের ওপরও একই পরীক্ষা চালানো হয়েছিল। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে এমন কোনো শারীরিক পরিবর্তন দেখা যায়নি। সাধারণ মানুষ যখন জোর করে কোনো সংখ্যার সঙ্গে রং মেলানোর চেষ্টা করে, তখন তাদের মস্তিষ্কে বাড়তি চাপের সৃষ্টি হয়। এই মানসিক চাপের কারণে তাদের চোখের মণি কেবল বড় হতে দেখা গেছে, কিন্তু সিনেস্থেশিয়া আক্রান্তদের মতো রঙের তারতম্য অনুযায়ী সাড়া দেয়নি। এটি প্রমাণ করে যে সিনেস্থেশিয়া একটি স্বয়ংক্রিয় ও অনিচ্ছাকৃত প্রক্রিয়া।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো প্রতিক্রিয়ার সময়। বাস্তবের রং দেখার সঙ্গে সঙ্গেই চোখের মণি যেভাবে সাড়া দেয়, সিনেস্থেশিয়া আক্রান্তদের ক্ষেত্রে সেই সাড়া দিতে মাত্র আধা সেকেন্ড সময় বেশি লাগে। তবে এ সময়টি সাধারণ মানুষের কোনো কিছু কল্পনা করে সাড়া দেওয়ার সময়ের চেয়ে অনেক কম। পেন স্টেট কলেজ অব মেডিসিনের নিউরোসায়েন্টিস্ট ড. কৃষ্ণকুট্টি সাথিয়ান বলেন, এ গবেষণা সিনেস্থেশিয়া শনাক্ত করার ক্ষেত্রে একটি বস্তুনিষ্ঠ ও শারীরিক পদ্ধতি তৈরি করতে সাহায্য করবে। এখন আর কেবল মানুষের মৌখিক বর্ণনার ওপর নির্ভর করতে হবে না।
যদিও এ গবেষণা কেবল সংখ্যা ও রঙের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে, তবে শব্দ শুনে রং দেখা বা স্বাদ পাওয়ার মতো অন্যান্য সিনেস্থেশিয়ার ক্ষেত্রেও এমন শারীরিক প্রতিক্রিয়া ঘটে কি না, তা নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে। বিজ্ঞানীদের মতে, মানুষের চেতনার গভীর স্তরগুলো বুঝতে এই উদ্ভাবন নতুন দিগন্ত উন্মোচন করল। আমাদের মস্তিষ্ক কীভাবে কল্পনা আর বাস্তবকে একই সুতোয় গেঁথে ফেলে, এটি তার এক অনন্য উদাহরণ।


