রাজধানীর বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনায় হত্যা ও বিস্ফোরক দ্রব্য আইনের মামলায় আসামিদের ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ডাদেশ অনুমোদন), আপিল ও জেল আপিলের বিষয়ে হাইকোর্টের রায় ঘোষণা হতে পারে আজ রবিবার।
মামলা দুটি (ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও জেল আপিল) রায়ের জন্য হাইকোর্টের বিচারপতি এ কে এম আসাদুজ্জামান ও বিচারপতি সৈয়দ এনায়েত হোসেনের বেঞ্চের আজকের কার্যতালিকায় ৫৪ ও ৫৫ নম্বরে রয়েছে।
গত ২১ নভেম্বর মামলা দুটির শুনানি শেষে রায় ঘোষণা অপেক্ষমাণ (কেস অ্যায়োটিং ভারডিক্ট-সিএভি) রাখেন হাইকোর্টের একই বেঞ্চ। এর ধারাবাহিকতায় রায়ের জন্য মামলা দুটি রবিবারের কার্যতালিকায় উঠেছে, যা সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে বিচারিক কার্যতালিকায় (কজলিস্ট) প্রকাশ করা হয়েছে।
বহুল আলোচিত এ মামলায় বিচারিক আদালতের রায়ে সাজাপ্রাপ্ত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের খালাস চেয়েছেন সিনিয়র আইনজীবী এস এম শাহজাহান জাহান। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘এই মামলায় তারেক রহমান যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত আসামি। কিন্তু তিনি দেশে না থাকায় আপিল করতে পারেননি। তবুও এই মামলা থেকে তার খালাস চাওয়া হয়েছে। আশা করছি, হাইকোর্টের রায়ে তিনি খালাস পাবেন।’
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট ঢাকার বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয়। এতে আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক সম্পাদক, সাবেক রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমানের স্ত্রী আইভী রহমানসহ ২৪ জন নিহত হন। আহত হন আওয়ামী লীগের প্রায় কয়েক শ নেতা-কর্মী। হামলার ১৪ বছর পর ২০১৮ সালের ১০ অক্টোবর এক রায়ে সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেন বিচারিক আদালত। একই সঙ্গে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানসহ ১৯ জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয় আরও ১১ আসামিকে। ওই বছরের ২৭ নভেম্বর ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) শুনানির জন্য মামলার বিচারিক আদালতের রায়ের প্রয়োজনীয় নথি হাইকোর্টে পাঠানো হয়।
২০১৯ সালের ১৩ জানুয়ারি মামলার জেল আপিল ও ডেথ রেফারেন্স শুনানির জন্য গ্রহণ করেন তৎকালীন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম ও বিচারপতি মোস্তাফিজুর রহমানের হাইকোর্ট বেঞ্চ। সে সময়ে দ্রুত মামলাটির পেপারবুক তৈরির নির্দেশ দেন হাইকোর্ট। পরে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেনের নির্দেশে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে মামলার পেপারবুক তৈরি হয়। ২০২০ সালের ১৬ আগস্ট পেপারবুক প্রস্তুত হয়।
ঘটনার বিবরণ
২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর দিন মতিঝিল থানার উপপরিদর্শক (এসআই) ফারুক আহমেদ বাদী হয়ে মামলাটি করেন। সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় ২০০৮ সালের ১১ জুন দেওয়া মামলার অভিযোগপত্রে বিএনপি নেতা আবদুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন ও হরকাতুল জিহাদ নেতা মুফতি আব্দুল হান্নানসহ ২২ জনকে আসামি করা হয়। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের পর মামলাটি অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দেন আদালত। দুই বছর তদন্তের পর আরও ৩০ জনকে আসামি করে ২০১১ সালের ৩ জুলাই সম্পূরক অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। এর ফলে এ মামলায় মোট আসামির সংখ্যা দাঁড়ায় ৫২।
মামলাতে বিচারিক আদালতের রায়ে সর্বোচ্চ সাজা মৃত্যুদণ্ড পেয়েছেন সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর, বিএনপি নেতা আব্দুস সালাম পিন্টু, তার ভাই মাওলানা তাজউদ্দিন, হরকাতুল জিহাদের সাবেক আমির শেখ আবদুস সালাম, কাশ্মীরি জঙ্গি আব্দুল মাজেদ ভাট, আবদুল মালেক ওরফে গোলাম মোস্তফা, মাওলানা শওকত ওসমান, মহিবুল্লাহ ওরফে মফিজুর রহমান, মাওলানা আবু সাঈদ ওরফে ডা. জাফর, আবুল কালাম আজাদ ওরফে বুলবুল, জাহাঙ্গীর আলম, হাফেজ মাওলানা আবু তাহের, হোসাইন আহম্মেদ তামিম, মঈন উদ্দিন শেখ ওরফে মুফতি মঈন, মো. রফিকুল ইসলাম, মো. উজ্জ্বল, এনএসআইয়ের সাবেক মহাপরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) রেজ্জাকুল হায়দার চৌধুরী, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আবদুর রহিম ও হানিফ পরিবহনের মালিক বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ। পরিকল্পনা ও অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের দায়ে দণ্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত ১৯ জনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের নির্দেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া প্রত্যেকের এক লাখ টাকা করে জরিমানা করেন আদালত।
মামলাটিতে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ছাড়াও যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পেয়েছেন খালেদা জিয়ার সাবেক রাজনৈতিক সচিব হারিছ চৌধুরী, বিএনপি নেতা কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ, হরকাতুল জিহাদের সদস্য হাফেজ মাওলানা ইয়াহিয়া, শাহাদাৎ উল্লাহ ওরফে জুয়েল, মাওলানা আবদুর রউফ, মাওলানা সাব্বির আহমেদ, আরিফ হাসান ওরফে সুমন, আবু বকর ওরফে হাফেজ সেলিম মাওলাদার, মো. আরিফুল ইসলাম, মহিবুল মুত্তাকিন ওরফে মুত্তাকিন, আনিসুল মুরছালিন ওরফে মুরছালিন, মো. খলিল ওরফে খলিলুর রহমান, জাহাঙ্গীর আলম বদর, মো. ইকবাল ওরফে ইকবাল হোসেন, লিটন ওরফে মাওলানা লিটন, মুফতি শফিকুর রহমান, মুফতি আব্দুল হাই, রাতুল আহমেদ ওরফে রাতুল বাবু। তাদের দণ্ডবিধির ৩০২/১২০খ/৩৪ ধারায় দোষী সাব্যস্ত করে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পাশাপাশি প্রত্যেককে ৫০ হাজার টাকা করে জরিমানা, অনাদায়ে আরও এক বছর সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
এ ছাড়া পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) মো. আশরাফুল হুদা ও শহুদুল হক, বিএনপি চেয়ারপারসন ও তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ভাগ্নে অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাইফুল ইসলাম ডিউক, অবসরপ্রাপ্ত লেফটেন্যান্ট কর্নেল সাইফুল ইসলাম জোয়ার্দ্দার, ডিজিএফআইয়ের অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল এ টি এম আমিন, ডিএমপির সাবেক উপকমিশনার খান সাঈদ হাসান, আরেক সাবেক উপকমিশনার ওবায়দুর রহমান খান, সাবেক অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক খোদা বক্স চৌধুরী, সিআইডির সাবেক বিশেষ সুপার মো. রুহুল আমিন, সাবেক এ এস পি আবদুর রশিদ, সাবেক এএসপি মুন্সি আতিকুর রহমানকে দুই বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, জরিমানা অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
অপর আসামি খোদা বক্স চৌধুরী, রুহুল আমিন, আবদুর রশিদ ও মুন্সি আতিকুর রহমানকে তিন বছর করে কারাদণ্ড ও ৫০ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও ছয় মাস করে কারাদণ্ড দেন আদালত।
অন্য একটি মামলায় মুফতি হান্নানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। ফলে এই মামলার রায়ে তাদের নাম বাদ দেওয়া হয়েছে।