চট্টগ্রামে আলোচিত মাদরাসা ছাত্র মোস্তাকিমকে (২৩) পুলিশি হেফাজতে নির্যাতনের মামলাটি পুন:তদন্তের আদেশ দিয়েছেন আদালত।
মঙ্গলবার (৭ জানুয়ারি) দুপুরে অতিরিক্ত চীফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সরকার হাসান শাহরিয়ার পুলিশ অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) মামলাটি পুনরায় তদন্তের জন্য নির্দেশ দিয়েছেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান।
এর আগে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে পুলিশের হাতে মোস্তাকিম গ্রেপ্তার হলে তার জন্য আইনজীবীও নিয়োগ দেয় সংগঠনটি ।
জিয়া হাবিব আহসান খবরের কাগজকে বলেন, এর আগে পুলিশের সংস্থা সিআইডি মামলাটি তদন্ত করে আদালতে প্রতিবেদন জমা দিলে আমরা সেটির বিরুদ্ধে নারাজি দিয়েছিলাম। কেননা ঐ প্রতিবেদনে আমরা সন্তুষ্ট ছিলাম না। যেহেতু পুলিশকে বাঁচিয়ে প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আমাদের নারাজি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট-১ এর আদালত খারিজ করে দেয়। এরপর মহানগর দায়রা জজ আদালতে আমরা এটির আবার রিভিশন করি। আদালত নারাজি শুনানির নির্দেশ দিয়ে মামলাটি অতিরিক্ত মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে পাঠিয়েছেন। আজ সেই শুনানী অনুষ্ঠিত হলে আদালত মামলাটি পিবিআইকে পুন:তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন।
জানা গেছে, ২০২৩ সালের ১০ জানুয়ারি ডায়ালিসিস ফি কমানোর প্রতিবাদে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ শুরু করেন রোগীর স্বজনরা। ওইদিন একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে ধ্বস্তাধস্তি হয় বিক্ষোভকারীদের। সেদিন পাঁচলাইশ থানার সাবেক ওসি নাজিম উদ্দীনসহ একদল পুলিশ বিক্ষোভ দমন করে।
এ ঘটনায় হাটহাজারীর বাসিন্দা মোস্তাকিম নামে এক মাদরাসা ছাত্রকে আটক করে পুলিশ তাকে থানায় নিয়ে ব্যাপক মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করে। পরে মোস্তাকিমের নাম উল্লেখ করে ৫০-৬০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে মামলা করে তাকে আদালতে পাঠায় পুলিশ। মামলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের লাঞ্ছিত করার অভিযোগ আনা হয় মোস্তাকিমের বিরুদ্ধে।
পরে আদালতে মোস্তাকিমকে কারাগারে পাঠায়। মোস্তাকিম তার অসুস্থ মায়ের কিডনী ডায়ালাইসিস করাতে এসে ফি কমানোর দাবিতে আন্দোলনে অংশ নিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। প্রায় ছয় দিন কারাগারে থাকার পর তিনি জামিনে মুক্ত হন।
কিন্তু অভিযোগ ওঠে পুলিশ হেফাজতে কিডনী রোগীর স্বজন মোস্তাকিমকে অমানুষিক নির্যাতন করা হয়েছে। এ ঘটনায় পাঁচলাইশ থানার সাবেক ওসি নাজিম, এসআই আজিজ গং এর বিরুদ্ধে মামলা করে মোস্তাকিম। কিন্তুু সিআইডি মামলাটিতে পুলিশ কর্মকর্তাদের দায় এড়িয়ে প্রতিবেদন দিয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট জিয়া হাবিব আহসান।
তিনি বলেন, পুলিশের বিরুদ্ধে রিপোর্ট দিতে চায়না পুলিশ। কেননা সিআইডি, পিবিআই এগুলোও পুলিশের সংস্থা। পুলিশ দায়ী করে রিপোর্ট দেয় না। এটি নতুন কথা নয়, পুলিশে অনেক পুরোনো সংস্কৃতি। তারা মনে করে আসামি পুলিশ হলেও সে তাদের সহকর্মী। সুতরাং তাকে মামলা থেকে রেহাই দেওয়া বা বাঁচানো তাদের ঈমানী দায়িত্ব। এ সংস্কৃতি আমাদের পাল্টাতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জামিন পাওয়ার পর ২০২৩ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি মোস্তাকিম পুলিশ হেফাজতে নির্যাতনে অভিযোগ দিলে আদালত মামলা হিসেবে তা লিপিবদ্ধ করার আদেশ দেন। মামলায় ওই সময়ের পাঁচলাইশ থানার ওসি নাজিম উদ্দিন ও এসআই আবদুল আজিজকে আসামি করা হয়। মামলার পরপর আসামিরা অসুস্থতাজনিত ছুটিতে চলে যান। আবার নাটকীয়ভাবে ৮০ দিন পর সিআইডি তদন্ত প্রতিবেদন দিলে আসামিরা সুস্থ হয়ে যান এবং কর্মস্থলে যোগ দেন। ফৌজদারি মামলা হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।
তিনি বলেন, এ মামলার তদন্ত করে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সংস্থাটি ওই বছরের মে মাসের মাঝামাঝিতে প্রতিবেদন দাখিল করে। কিন্তু প্রতিবেদনে এই দুই পুলিশ কর্মকর্তাকে নির্দোষ দাবি করা হয়। এতে সিআইডি বলেছে মোস্তাকিমের আনা দুটি অভিযোগই মিথ্যা। সিআইডি কোনটিরই প্রমাণ পায়নি।
মোস্তাকিমের আইনজীবী অ্যাডভোকেট গোলাম মাওলা মুরাদ খবরের কাগজকে বলেন, সিআইডি আসামিদের নির্দোষ দাবি করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে। আমরা এটার বিরুদ্ধে রিভিশন দিয়েছি। আজ শুনানী শেষে পুন:তদন্তের আদেশ এলো।
মনির/মেহেদী