৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ যতই শেষের দিকে গড়াচ্ছিল, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি ততই প্রতিদিন পরিবর্তিত হচ্ছিল। ১০ ডিসেম্বর জানা যায়, মার্কিন সপ্তম নৌবহর মালাক্কা প্রণালির পূর্বে অবস্থান করছে। বহরটি বঙ্গোপসাগরের দিকে যাত্রা করতে পারে।
এদিন নিউইয়র্কে জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আগা শাহি। তিনি বাংলাদেশ থেকে ভারতীয় সৈন্য প্রত্যাহারের দাবি জানান।
অন্যদিকে রণাঙ্গনে এদিন প্রচণ্ড যুদ্ধের প্রভাবে চট্টগ্রাম ও চালনা বন্দর অচল হয়ে যায়। কয়েকটি জাহাজে পাকিস্তানি সেনারা পিছু হটে। পালানোর সময় বঙ্গোপসাগরে ধরা পড়ে।
এদিন দিনাজপুর, রংপুর ও সৈয়দপুরে ভীষণ পর্যুদস্ত হয় পাকিস্তানি বাহিনী। মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর রসদ সরবরাহের সব পথ বন্ধ করে দেন।
এদিন ময়মনসিংহ, মাদারীপুর, নড়াইল ও ভোলা হানাদারমুক্ত হয়। একেবারে ভোরের দিকে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার কাজী জয়নাল আহমেদের নেতৃত্বে ১৩ জন মুক্তিযোদ্ধার একটি দল পাকিস্তানি বাহিনীকে ধাওয়া দেয়। হানাদার বাহিনী সব ফেলে লঞ্চে চাঁদপুরের দিকে পালিয়ে যায়।
এদিন মুক্তিবাহিনী জামালপুর শহর মুক্ত করতে হানাদার বাহিনীর ওপর তীব্র আক্রমণ চালায়। সাভারের নয়ারহাটে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর বিমান রেডিও ট্রান্সমিশনের (সম্প্রচার কেন্দ্র) ওপর বোমা হামলা চালালে বেতার সংযোগ ও সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়।
আজকের দিনে চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে মুক্তিবাহিনীর চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলের একটি দল হানাদার বাহিনীর ২৪ ফ্রন্টিয়ার রেজিমেন্টের ওপর হামলা চালায়। এরপর চতুর্থ বেঙ্গলের অধিনায়ক ক্যাপ্টেন গাফফার চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গলকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ফটিকছড়ি ও কাজিরহাটের দিকে যাত্রা শুরুর নির্দেশ দেন।
১০ ডিসেম্বর নবম বেঙ্গলের মুক্তিযোদ্ধারা কুমিল্লা শহরের রেলওয়ে ক্রসিং থেকে কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টের দিকে অগ্রসর হতে থাকে। এ সময় মেজর আইন উদ্দিনের নেতৃত্বে ভারতীয় মিত্রবাহিনীর তিনটি ট্যাংক রেলওয়ে ক্রসিং থেকে হানাদার বাহিনীর ওপর উপর্যুপরি গোলা নিক্ষেপ করতে থাকে।
১০ ডিসেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ হানাদার মুক্ত হয়। এদিন ভোরে ভারতীয় বাহিনীর দশম বিহার রেজিমেন্ট এবং এস ফোর্সের অধীন ১১ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দুটি কোম্পানির একটি দল আশুগঞ্জ আক্রমণ করে। অন্যদিকে আরেকটি দল ভৈরব সেতুর আশুগঞ্জ অংশ ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দেয়। এদিন বীর মুক্তিযোদ্ধারা সিলেট ও খুলনার অনেক এলাকা শত্রুমুক্ত করেন।
পরাজয় আসন্ন জেনে পাকিস্তানি হানাদারদের দোসররা দেশের প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, কবি, সংগীতশিল্পী, সাংবাদিকদের হত্যার মিশনে নামে। ঢাকায় এ হত্যাযজ্ঞের নেতৃত্ব দেন পাকিস্তানের সামরিক উপদেষ্টা রাও ফরমান আলী। মিশনের দায়িত্ব তুলে দেওয়া হয় আলবদর-রাজাকারদের ওপর।