ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
পরকালের আয়নায় আপনার কর্মফল দেখেছেন কি? সাংবাদিকতায় দলীয় লেজুড়বৃত্তিমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন: মোস্তফা কামাল আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির দাফনের তারিখ ঘোষণা নিজেকে সমকামী বলে কটাক্ষের জবাব দিলেন মৌনী ফ্যাশনে বিশ্বকাপ মাদক কারবারে হাজার কোটিপতির উত্থান, দাবি ভূমিমন্ত্রীর ২৪ ঘণ্টার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান শান্তিচুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা: পাকিস্তান প্রধানমন্ত্রী বিশ্বকাপের মঞ্চে বাংলাদেশকে তুলে ধরে প্রশংসিত সঞ্জয় বাংলাদেশের প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ক প্রবন্ধ রচনা, ১ম পর্ব, এইচএসসির বাংলা ২য় পত্র এআই উদ্ভাবনে মেট্রোপলিটন ইউনিভার্সিটির কৃতিত্ব, ফাইনালে ‘কগনিভার্স’ ‘সবুজ সাথী’ সম্মাননায় ভূষিত সিলেট সিটি করপোরেশন ঈশ্বরগঞ্জে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ-যুবলীগের ঝটিকা মিছিল ঘরেই মিলবে কৃত্রিম দিনের আলো চকরিয়া থেকে দেশব্যাপী ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির যাত্রা শুরু রাজশাহীতে বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি উদ্বোধন করলেন ভূমিমন্ত্রী বিদেশি ঋণনির্ভর ও লুটপাটের বাজেট জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করবে না: গোলাম পরওয়ার শহিদ ওয়াসিমের কবর জিয়ারত ও পরিবারকে সহায়তা প্রধানমন্ত্রীর রংপুরে অভিনব উপায়ে দল পরিবর্তন করলেন ব্রাজিল সমর্থক সহধর্মিণীকে সঙ্গে নিয়ে ডুলাহাজারা সাফারি পার্কে তারেক রহমান আইভিএফে যমজ সন্তানের জন্ম, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলল না বাবা-মায়ের পরিচয় ১০ জেলা হাসপাতালে আইসিইউ চালু হচ্ছে রবিবার মানুষকে রোগ সম্পর্কে সচেতন করছে তথ্যপ্রযুক্তি তারেক রহমানের ভিশন বাস্তবায়নে যুবদল অগ্রণী ভূমিকা রাখবে: মির্জা ফখরুল গ্রামীণ কাঁচা সড়ক পাকাকরণ জরুরি‎ আন্তর্জাতিক উত্তম চর্চা এবং রাজস্ব ব্যবস্থায় সংস্কার কিশোরীকে ধর্ষণচেষ্টার অভিযোগে রিকশাচালককে গণপিটুনি রাজবাড়ীতে আওয়ামী লীগের ঝটিকা মিছিল সৌদি কারাগারে মৃত্যু, ২৮ দিন পর দেশে মরদেহ ইতিহাস গড়ার পথে হন্ডুরাসের রেফারি সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ৪টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৪র্থ পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র
Nagad desktop

৩৫ বছর পরও ঝুঁকিতে উপকূল: ভয়াল ২৯ এপ্রিলের ক্ষত এখনো শুকায়নি

প্রকাশ: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৬ পিএম
আপডেট: ২৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৫০ পিএম
৩৫ বছর পরও ঝুঁকিতে উপকূল: ভয়াল ২৯ এপ্রিলের ক্ষত এখনো শুকায়নি
ছবি: খবরের কাগজ

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের উপকূলবাসীর জীবনে এক কালো অধ্যায়। সেই ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের ক্ষত আজও শুকায়নি। বরং জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং দুর্বল বেড়িবাঁধের কারণে উপকূলীয় অঞ্চল এখন আরও অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

দিনটি উপলক্ষে উপকূলজুড়ে চলছে শোক ও স্মরণ। নিহতদের আত্মার মাগফিরাত কামনায় মিলাদ, কোরানখানি ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। অনেক পরিবার আজও হারানো স্বজনদের স্মরণে নিভৃতে প্রার্থনায় মগ্ন।

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল মধ্যরাতে বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের ওপর দিয়ে বয়ে যায় শতাব্দীর অন্যতম ভয়াবহ ‘সুপার সাইক্লোন’। প্রায় ২৫০ কিলোমিটার বেগের প্রচণ্ড বাতাস এবং ১২ থেকে ২০ ফুট উচ্চতার জলোচ্ছ্বাসে মুহূর্তেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় কক্সবাজারসহ বিস্তীর্ণ উপকূলীয় এলাকা।

সরকারি হিসাব মতে, এই প্রলয়ঙ্করী দুর্যোগে প্রায় ১ লাখ ৪০ হাজার থেকে ২ লাখ মানুষ প্রাণ হারান এবং প্রায় ১ কোটি মানুষ ঘরবাড়ি হারিয়ে নিঃস্ব হন। প্রাণহানির পাশাপাশি প্রায় ১০ লাখ গবাদিপশু মারা যায় এবং অবকাঠামোগত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি হয়। ইতিহাসের এই ভয়াবহতম দুর্যোগের স্মৃতি আজও উপকূলীয় মানুষের মনে আতঙ্কের ছাপ ফেলে।

কোস্টাল জার্নালিস্ট ফোরাম অব বাংলাদেশের সভাপতি মুহাম্মদ আতা উল্লাহ খান বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ক্রমেই উপকূলীয় এলাকায় তীব্র হয়ে উঠছে, যার ফলে সেখানে শুষ্কতা ও পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা বাড়ছে। নির্বিচারে বন ও গাছপালা নিধন এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। একই সঙ্গে হাজার হাজার একর প্যারাবন ধ্বংস হওয়ায় উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয় ভেঙে পড়েছে। এ অবস্থায় ভবিষ্যতে ২৯ এপ্রিলের মতো বিপর্যয়ের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতির আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।’

তার ভাষ্য, ‘১৯৯১ সালের সেই ঘূর্ণিঝড়ে প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছিল। ওই বিভীষিকাময় রাতের স্মৃতি এখনও উপকূলবাসীকে আতঙ্কিত করে তোলে।’

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা ছিল মহেশখালীর ধলঘাটা ইউনিয়ন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য নুরুল ইসলাম বলেন, ‘সেই ভয়াল রাতে আমিও জলোচ্ছ্বাসে ভেসে গিয়েছিলাম। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও এলাকার পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয়নি; এখনো রয়েছে ঝুঁকি। ধলঘাটায় বর্তমানে প্রায় ৩৩ হাজার মানুষের বসবাস, যদিও অনেকেই ইতোমধ্যে এলাকা ছেড়ে চলে গেছেন। যারা রয়ে গেছেন, তারা অনিশ্চয়তার মধ্যেই দিন কাটাচ্ছেন। আসন্ন বর্ষা মৌসুমের আগে অরক্ষিত বেড়িবাঁধ দ্রুত সংস্কার করা না হলে এই এলাকায় বসতি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। আমি সরকারের কাছে এলাকাটি রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানাচ্ছি।’

ধলঘাটার বাসিন্দা আফরোজা বেগম বলেন, ‘সেই রাতে আমি পরিবারের ১৯ সদস্যকে হারিয়েছি। অনেকের লাশ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। প্রতিবছর এই দিনটি আমার কাছে নতুন করে বেদনার স্মৃতি নিয়ে আসে।’

কুতুবদিয়ার খুদিয়ারটেক এলাকার বাসিন্দা রশিদ আহমদ বলেন, ‘আমার পরিবারের ১৫ জন সদস্য জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারান। সেই রাতের দৃশ্য আজও চোখে ভাসে।’

কুতুবদিয়ায় এখনো ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ খোলা রয়েছে। ফলে জোয়ারের পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে।

কুতুবদিয়া উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আকবর খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রলয়ংকরী সেই ঘূর্ণিঝড়ের ৩৫ বছর পেরিয়ে গেলেও উপকূল এখনো পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়নি। বরং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে। সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ধীরে ধীরে বাড়ছে, যার ফলে উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রতিবেশ হুমকির মুখে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বাড়ায় উপকূলবাসীর ঝুঁকিও ক্রমেই বেড়ে চলেছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘কুতুবদিয়ায় এখনো প্রায় ১২ থেকে ১৩ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ অসম্পূর্ণ অবস্থায় রয়েছে, ফলে পুরো দ্বীপই ঝুঁকির মধ্যে আছে। জোয়ারের পানি ইতোমধ্যে লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে, এতে স্থানীয়দের দুর্ভোগ বাড়ছে। দ্রুত টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রতি দাবি জানাচ্ছি।’

বাংলাদেশ নদী পরিব্রাজক দলের সাধারণ সম্পাদক ইসলাম মাহমুদ বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় এলাকায় ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের তীব্রতা বেড়েছে, যা মানুষের জীবনকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।’

উপকূলীয় উন্নয়ন ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে কক্সবাজার-২ (মহেশখালী-কুতুবদিয়া) আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, দায়িত্বে থাকা সময়ে তিনি সংসদীয় প্রতিনিধিদল নিয়ে মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় গিয়ে বেড়িবাঁধ নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। কিন্তু বর্তমানে আবারও বিভিন্ন এলাকায় লবণপানি লোকালয়ে ঢুকে পড়ছে। বিষয়টি তিনি সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে জানিয়েছেন এবং বর্ষা মৌসুম শুরুর আগেই ক্ষতিগ্রস্ত বেড়িবাঁধ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন।

তিনি বলেন, সাগরের আগ্রাসন থেকে উপকূলের মানুষকে রক্ষা করতে হলে টেকসই ও শক্তিশালী বেড়িবাঁধ নিশ্চিত করা জরুরি।

অন্যদিকে একই আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য আলমগীর মোহাম্মদ মাহফুজ উল্লাহ ফরিদ বলেন, কুতুবদিয়া ও মহেশখালীর বেড়িবাঁধসহ উপকূল সুরক্ষায় তিনি ইতোমধ্যে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন এবং সংসদেও বিষয়টি উত্থাপন করেছেন। এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তিনি দায়িত্বশীলভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন বলেও উল্লেখ করেন।

কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. নুরুল ইসলাম জানান, জেলার প্রায় ৫৯৬ কিলোমিটার বেড়িবাঁধের মধ্যে এখনো প্রায় ২৫ কিলোমিটার অংশ সম্পূর্ণ খোলা রয়েছে। এছাড়া আরও প্রায় ৫০ কিলোমিটার বাঁধ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় আছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে এবং দ্রুত সংস্কারের লক্ষ্যে কাজ এগিয়ে চলছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। 

তার মতে, কুতুবদিয়া এলাকায় ঝুঁকিপূর্ণ ও খোলা অংশের পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ায় বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নতুন করে বেড়িবাঁধের নকশা করা হচ্ছে। আগের তুলনায় বাঁধের উচ্চতা ও প্রস্থ বাড়িয়ে আরও টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ঘূর্ণিঝড়ে নিহতদের প্রতি জেলা প্রশাসনের গভীর শ্রদ্ধা রয়েছে। এ বছর সরকারি উদ্যোগে আনুষ্ঠানিক কোনো কর্মসূচি না থাকলেও জেলার বিভিন্ন স্থানে বেসরকারিভাবে স্মরণমূলক আয়োজন করা হচ্ছে। বিশেষ করে মহেশখালী ও কুতুবদিয়া এলাকায় এ ধরনের কর্মসূচি বেশি দেখা যাবে।

এদিকে পরিবেশবিদরা মনে করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ঝুঁকি ক্রমাগত বাড়ছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব, টেকসই এবং পরিকল্পিত উন্নয়ন কার্যক্রম গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।

অমিয়/

রমনার বন আসরা

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৬, ০৮:২৯ এএম
রমনার বন আসরা
রমনা উদ্যানে সম্প্রতি ফুটেছে বন আসরা ফুল। ছবি: লেখক

রাজধানীর রমনা উদ্যানে দুটি গাছ আছে, যা বেশ বড়সড়, অথচ তা জবাগোত্রীয়। ফুলের গড়নে জবার সঙ্গে মিল থাকলেও অন্য আর কিছুর সঙ্গেই মিল নেই। গাছ দুটি হলো কাশিপালা ও বন আসরা। গাছ দুটির দিকে তাকালেই নিসর্গপুত্র দ্বিজেন শর্মার কথা মনে পড়ে।

রমনা উদ্যানে তিনি সিলেটের পাহাড় থেকে নানা প্রজাতির গাছের চারা তুলে এনে লাগাতেন। গাছগুলোর বেশির ভাগই কিছুদিন পর যত্নের অভাবে বা অরক্ষিত থাকায় মরে যেত, কিছু গাছ দাঁড়িয়ে যেত। সেসব গাছ বৃক্ষ হয়ে এখন তাঁর সেসব স্মৃতির কথা কইছে। বন আসরা গাছটির অবস্থান রমনা উদ্যানের লেকের পাড়ে। লেক ভ্রমণের বোটগুলোকে ওখান থেকে ছাড়া হয়। বছর দশেকের বেশি হবে।

রমনায় একদিন দ্বিজেন শর্মার সঙ্গে কয়েকজন মিলে হেঁটে হেঁটে গাছ দেখতে দেখতে এই বন আসরা গাছটিকে চোখে পড়েছিল। গাছের গোড়ার দিকটা আগুনে ঝলসে গেছে, গোড়া থেকে গজানো ডালপালার পাতাগুলোও পুড়ে গেছে। রমনা তখন এখনকার মতো রূপসী ছিল না। সেই আহত ও দগ্ধ গাছটির কাছে দাঁড়িয়ে তিনি হাহাকার করে উঠেছিলেন, বলেছিলেন, ‘গাছের সঙ্গে এমন অন্যায় কেউ করে? গাছ তো মায়ের মতন, তাকে কেউ এভাবে পোড়ায়? জানি না, কোন হতভাগার দল এখানে কী রেঁধে বনভোজন করে গেছে! এখনো সেই গাছটির কাছে গেলে সেসব কথা মনে পড়ে।

বুনোগাছ হলেও বন আসরার এই একটি গাছই রমনা উদ্যানে আছে। কিন্তু কখনো এর অনিন্দ্য রূপসী মেমসাহেবের মতো ফর্সা ফুলগুলোকে দেখার সুযোগ হয়নি। এ বছরও সে গাছে ফুল ফুটেছে। গত ৭ জুন সকালবেলায় সে গাছটিতে ফুলের দেখা পেলাম। পরপর দুদিনে আরও বেশি ফুল দেখলাম। একটি দুটি না, ডালে ডালে অনেক ফুল ফুটেছে। কুঁড়িগুলো দেখে মনে হলো কয়েকদিনে আরও ফুল ফুটবে। আহা, ফুল কী চমৎকার! ঘিয়া রঙের বড় বড় মাইকের মতো ফুল, ফুলের বোঁটার কাছে ঝালরের মতো হালকা সবুজ অঙ্গ, বৃতিগুলো যেন ছিল কলার খোসা। এদিক দিয়ে মুচকুন্দ ফুলের সঙ্গে এর কিছুটা মিল আছে। প্রচুর মৌমাছি উড়ছে ফুলে।

বন আসরা এ গাছের স্থানীয় বাংলা নাম, ইংরেজি নাম Indian Kapok ও উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম  Pterospermum semisagittatum ও গোত্র মালভেসি। প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ টেরোস্পার্মাম–এর অর্থ ডানাযুক্ত বীজ এবং শেষাংশের অর্থ আংশিক বর্শার ফলার মতো আকৃতিবিশিষ্ট পাতা। বন আসরা বনের গাছ, এ দেশ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের অরণ্যে প্রাকৃতিকভাবে জন্মে। রমনা উদ্যানের গাছটি মাঝারি আকারের বৃক্ষ প্রকৃতির।

আবহাওয়া ও অবস্থানভেদে গাছ পর্ণমোচী বা চিরসবুজ হতে পারে; গাছ ১৫ থেকে ২৫ মিটার লম্বা হতে পারে। গোড়া থেকে বেশ খানিকটা অংশের কাণ্ডে কোনো শাখা থাকে না। বীজ থেকে চারা হয়। পাতাগুলো কিছুটা ছুরি বা তলোয়ারের আগার মতো, পাতার ওপরের পিঠ সবুজ ও কিছুটা মসৃণ হলেও নিচের পিঠ রূপালি সবুজ ও খসখসে। এর কাণ্ড সোজা ও শক্ত হয়। গুড়ি বা কাণ্ডে বাকল ওঠা ছোপ ছোপ দাগ দেখা যায়।

বন আসরার কুঁড়িগুলোও বেশ ব্যতিক্রম, লম্বা খাঁজযুক্ত ক্ষেপণাস্ত্রের মতো। গাছের সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো এর ফুল। এর ফুলগুলো রাতের বেলা ফোটে, যার সাদা পাপড়ি ও হালকা সবুজ বৃতি দেখতে অসাধারণ লাগে। ভোরে ফুলগুলো মলিন হতে শুরু করে। ফুলগুলো সুগন্ধযুক্ত এবং নিশাচর পাখি ও কীটপতঙ্গকে আকৃষ্ট করে।

প্রাচীনকাল থেকেই এর শক্ত কাঠ গৃহনির্মাণে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। এর লালচে-ধূসর কাঠ ভারী, বেশ শক্ত ও টেকসই। এটি কুড়ালের হাতল তৈরি করতে ও ঐতিহ্যবাহী স্থাপত্যে বাড়ির স্তম্ভ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এই কাঠ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। স্থানীয়ভাবে চিবানোর জন্য এবং আঁশ ও কাঠের উৎস হিসেবে ব্যবহারের জন্য বন্য পরিবেশ থেকে এ গাছ সংগ্রহ করা হয়। সুপারির বদলে পানের সঙ্গে চিবানোর জন্য এর ছাল ব্যবহার করা যায়। ডালের বাকল খুব শক্ত, টেনে ছেঁড়া বা ছুরি দিয়ে সহজে কাটা যায় না।

এজন্য বন আসরার বাকলের আঁশ দিয়ে বিভিন্ন ধরনের দড়ি ও তন্তু তৈরি করা হয়। বনজীবীরা বন থেকে কাঠ কেটে আঁটি বাঁধার জন্য এ গাছের বাকল ব্যবহার করে। এটি একটি ঔষধি উদ্ভিদ, যা জ্বর, কাশি, মাথাব্যথা, চর্মরোগ ও প্রদাহের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। আধুনিক ফার্মাকোলজিক্যাল গবেষণায় আরও দেখা গেছে যে, এটি রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণ এবং মেজাজ ঠিক রাখতেও সহায়ক হতে পারে। 

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

কুরমা অভয়াশ্রমের হলদে-চোখ ছাতারে

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৮:২৮ এএম
কুরমা অভয়াশ্রমের হলদে-চোখ ছাতারে
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জের কুরমা চা-বাগানের গুল্মের ডালে শেষ বিকেলে সংকটাপন্ন হলদে-চোখ ছাতারে পাখি। ছবি: লেখক

হলদে চোখের বিরল ও সংকটাপন্ন পাখিটিকে প্রথম দেখি সাত বছর আগে চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা উপজেলার বেলগাছি গ্রামের এক ভুট্টাখেতে। কিন্তু তার অতিরিক্ত চঞ্চলতা ও দ্রুত চলে যাওয়ার কারণে সেদিন ছবি তুলতে পারিনি। দুই বছর পর পাখিটিকে ফের দেখলাম মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার কুরমা চা-বাগানের এক চিলতে ঘাসবন ও ঝোপঝাড়ে। এরপর থেকে অন্তত একবছর পাখিটিকে কুরমায় দেখেছি, প্রায় প্রতিবার যখন ওখানে গিয়েছি। বহু ছবি তুলেছি ওর। কিন্তু হার্ড ড্রাইভ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেসব ছবি হারিয়ে গেছে চিরতরে। কুরমার সেই জায়গাটি এখন এক চিলতে অভয়ারণ্য। নাম কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রম। তবে অভয়াশ্রম হলেও বর্তমানে ওখানে তেমন একটা পাখির দেখা মিলছে না। চা-বাগান কর্তৃপক্ষ ঝোপঝাড় কেটে ফেলায় ভয় পেয়ে পাখিরা সেই যে চলে গেল, এখন পর্যন্ত আর ফিরে এল না, বিশেষ করে পরিযায়ী পাখিগুলো। দেশি আবাসিক পাখিদের সংখ্যাও কমে গেছে। এ বছরের ২৪ জানুয়ারি রাজকান্দির সংরক্ষিত বনের আদমপুর বিটে পাখি পর্যবেক্ষণ শেষে কুরমার বর্তমান অবস্থা দেখার জন্য বিকেলে সেখানে গিয়েছিলাম।
 
আকারে ক্ষুদ্র হলেও একসময় কুরমা পক্ষী অভয়াশ্রমটি ছোট ছোট বীজভুক পাখিদের স্বর্গরাজ্য ছিল। লাল মুনিয়া, লালগলা ফিদ্দা, চিনা লালগলা ফিদ্দা, বঘেরি, কালোমাথা বঘেরি, হলদেবুক বঘেরি, খয়েরিকান বঘেরি, মদনটাক এবং হলদে চোখের পাখিসহ প্রায় আশি প্রজাতির পাখি দেখেছি ওখানে। কিন্তু জানুয়ারিতে ওখানে গিয়ে ২-৩ প্রজাতির বেশি পাখি দেখলাম না। তাই ওখান থেকে আরেকটু সামনের দিকে বাগানের সবচেয়ে উঁচু স্থানটিতে গেলাম। সেখানে ছোট যে ঝোপটি রয়েছে, ওখানে বুলবুলি, ফিঙ্গে, বাদামি কসাই ও অল্প কিছু সাধারণ পাখি দেখলাম। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা প্রায় হয় হয়। এমন সময় কোত্থেকে যেন হলদে চোখের পাখিটি এসে হাজির হলো। তবে মাত্র কয়েক সেকেন্ডের জন্য। এই সময়ের জন্য ৪-৫ বার ক্লিক করতে পারলাম। ছবি বেশি তুলতে না পারলেও বিরল পাখিটিকে যে ওখানে দেখলাম, তাতেই আমি খুশি। কারণ এর আগে বেশ কয়েকজন বার কয়েক গিয়েও পাখিটির দেখা পাননি। সন্ধ্যা হয়ে এল, তাই সঙ্গে আনা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে পাখিপ্রেমী রূপকের দোকানে জিলাপি খাওয়ার জন্য চলে গেলাম। 

এতক্ষণ বিরল ও সংকটাপন্ন যে পাখিটির কথা বললাম, সে এদেশের এক প্রজাতির আবাসিক পাখি হলদে-চোখ ছাতারে। বাগেরহাট জেলায় পাখিটি ‘সাদা মইনে’ নামে পরিচিত। ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বলে গুলাবচশম। ওর ইংরেজি নাম Yellow-eyed Babbler। প্যারাডক্সওরনিথিডি (Paradoxornithidae) গোত্রের পাখিটির বৈজ্ঞানিক নাম Chrysomma sinense (ক্রাইসোমা সাইনেনস)। বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে পাখিটির দেখা মেলে।

হলদে-চোখ ছাতারের দেহের দৈর্ঘ্য ১৮ সেন্টিমিটার। ওজন ১৯ গ্রাম। স্ত্রী-পুরুষ দেখতে একই রকম। দেহের উপরটা লালচে-বাদামি। থুতনি-গলা-বুক সাদা; পেট-তলপেট হলদেটে সাদা। শক্ত মোটা ঠোঁটটি কালো। চোখের চারদিকের বলয় কমলা হলেও মনি হলুদ। পা ও পায়ের পাতা হলুদ। লেজ লম্বা। অপ্রাপ্তবয়ষ্ক পাখির পিঠ বেশি লালচে ও ঠোঁট বাদামি।  

প্রজাতিটি মূলত সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের বাসিন্দা, তবে খুলনা বিভাগ ও উত্তরবঙ্গেও কোথাও কোথাও দেখা যায়। সচরাচর জলাসংলগ্ন লম্বা ঘাস ও ঝোপঝাড়ে এরা বাস করে। বেশ লাজুক। জোড়ায় বা ছোট দলে ঝোপঝাড় বা গাছের গোড়ার দিকে আড়ালে-আবডালে ঘুরে বেড়ায়। উঁচু ঘাসের আড়ালে খাবার খোঁজে। কীটপতঙ্গ, শুককীট, রসালো ফল ও ফুলের রস খায়। সুমধুর কণ্ঠে ‘চিপ-চিপ-চিপ…’ শব্দে ডাকে।

জুন থেকে নভেম্বর প্রজননকাল। এ সময় ভূমির কাছাকাছি আখ, পাট বা অন্যান্য ঘাসের কাণ্ডে ঘাস দিয়ে গোলাকার বাসা বানায়। লালচে-বাদামি ছিটছোপসহ ঘিয়ে-সাদা রঙের ৩ থেকে ৫টি ডিম পাড়ে। ডিম ফোটে ১৫-১৬ দিনে। ছানারা ১৩ দিন বয়সে উড়তে শিখে ও বাসা ছাড়ে। আয়ুষ্কাল ৫ থেকে ৮ বছর। 

লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ এবং অধ্যাপক গাজীপুর কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

শখ থেকে স্বাবলম্বী গৃহবধূ, ঘরের ছাদ যেন ক্যাকটাস রাজ্য

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৫১ এএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৮:৫৩ এএম
শখ থেকে স্বাবলম্বী গৃহবধূ, ঘরের ছাদ যেন ক্যাকটাস রাজ্য
জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে গৃহবধূ কারিশমা আমরিন রুনার ব্যতিক্রমী ছাদবাগানে ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট দেখছেন দর্শনার্থীরা। ছবি: খবরের কাগজ

জয়পুরহাটের পাঁচবিবিতে ইউটিউব দেখে ব্যতিক্রমী এক ছাদবাগান করেছেন গৃহবধূ কারিশমা আমরিন রুনা। তার এই শখের বাগানটি এখন বিরল গাছের এক বিশাল সাম্রাজ্য হয়ে উঠেছে। তার ছাদবাগানে এখন রয়েছে প্রায় হাজার প্রজাতির ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট ও দৃষ্টিনন্দন ইনডোর প্ল্যান্ট। শখের বশে শুরু করলেও তিনি এখন একজন সফল উদ্যোক্তা। স্থানীয় কৃষি বিভাগ তাকে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।

জানা গেছে, পাঁচবিবি রেলস্টেশন রোডের বাসিন্দা ইমন হোসেনের স্ত্রী গৃহবধূ কারিশমা আমরিন রুনা। তিনি স্থানীয় একটি স্পেশাল চাইল্ড বেসরকারি স্কুলে শিক্ষকতা করতেন। করোনা মহামারির সময় তার স্কুলটি বন্ধ হয়ে যায়। সেই ঘরবন্দি সময়ে ইউটিউব দেখে অনলাইনসহ বিভিন্ন মাধ্যমে নানা জাতের ক্যাকটাস সংগ্রহ করেন তিনি। এরপর বাড়ির ছাদে ছোট পরিসরে শুরু করেন ছাদবাগান। সংসারের কাজের পাশাপাশি তিনি বাগানের যত্ন নিতেন।

ধীরে ধীরে দেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিরল প্রজাতির ক্যাকটাস ও সাকুলেন্ট সংগ্রহ করেন রুনা। এখন তার পুরো ছাদ জুড়ে বিভিন্ন ধরনের পাতাবাহার, লতাবাহার, বনজ ও ফলজ গাছের সামরোহ। তবে হাজার প্রজাতির ক্যাকটাস ও সাকুলেন্টই মানুষের নজর কাড়ছে বেশি। প্রতিদিন অনেকে এই বাগান দেখতে আসেন, কেউ কেউ আসেন গাছ কিনতে। পাশাপাশি তিনি অনলাইনেও গাছ বিক্রি করে ভালো লাভ করছেন। তাকে দেখে এখন অনেকেই অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। পরিবেশ রক্ষা ও সৌন্দর্য বাড়াতেও এই উদ্যোগ ভূমিকা রাখছে।

পাঁচবিবি পৌর শহরের চামড়া গুদাম এলাকার শবনম আরা সানি বলেন, ‘আমি কারিশমা আমরিন রুনা আপুর ফেসবুক পেজে যোগাযোগ করে কয়েকটা ক্যাকটাস গাছ কিনেছি। পরে বাগান দেখার আগ্রহ থেকে এখানে এসেছি। সাধারণত ছাদবাগানে ফুলের গাছ দেখা যায়। কিন্তু এখানে এসে অনেক রকম ক্যাকটাস দেখলাম। আমার খুব ভালো লেগেছে।’

স্টেশন রোড এলাকার আরজু আরা শাম্মি বলেন, ‘এই বাগানে এসে নানা প্রজাতির ক্যাকটাস গাছ দেখলাম। এসব সাধারণত রংপুর, রাজশাহীতে পাওয়া যায়। কিন্তু এখান থেকে কিনতে পেরে আমি অনেক খুশি। রুনা আপা গৃহবধূ হয়েও উদ্যোক্তা হয়ে আয় করতে পারছেন। আমারাও এখান থেকে শিখে নিজে এমন উদ্যোগ নিতে পারি।’

মালঞ্চা এলাকার সাব্বির হোসেন বলেন, ‘এই ছাদবাগান দেখে আমি মুগ্ধ। এখানে এত সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে যে সবার চোখ জুড়িয়ে যাবে। আমার জীবনে একসঙ্গে এত প্রজাতির ক্যাকটাস আগে কখনো দেখিনি। আমি নিজেও দুটি গাছ কিনেছি।’

উদ্যোক্তা কারিশমা আমরিন রুনা বলেন, ‘করোনা মহামারির সময় বাসায় বসে থাকার সময় শখের বশে ইউটিউব দেখে কয়েকটি ক্যাকটাস গাছ কিনে ছাদবাগান শুরু করি। এরপর দিন দিন বিভিন্ন জায়গা থেকে নানা প্রজাতির গাছ কিনে বাগান বড় করি। এখন আমার এখানে হাজার প্রজাতির ক্যাকটাস, সাকুলেন্ট ও সুন্দর ইনডোর প্ল্যান্ট আছে। এ থেকে আমার মাসে মোটামুটি ভালো আয় হয়। অনলাইনে যোগাযোগ করে অনেকে কেনেন, আবার কেউ কেউ এখানে এসেও নিয়ে যান।’

পাঁচবিবি উপজেলা কৃষি অফিসার জসিম উদ্দিন বলেন, ‘আমরা সচরাচর দেখি ছাদবাগানে শাক-সবজি বা ফুলের চাষ হয়। কিন্তু পাঁচবিবির গৃহবধূ রুনা তার ছাদে বিভিন্ন প্রজাতির ক্যাকটাসসহ বিরল প্রজাতির গাছ লাগিয়েছেন। ছাদবাগান করেও যে স্বাবলম্বী হওয়া যায়, রুনা তার দৃষ্টান্ত উদাহরণ। আমরা উদ্যোক্তাকে বিভিন্ন সহযোগিতা দিয়ে থাকি। নতুন করে কেউ যদি এমন বাগান করতে চান, তাহলে আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা সার্বিক সহযোগিতা করব।’

চমৎকার ফুল ক্রোসান্দ্রা

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৮:৩২ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৬, ০৯:০১ এএম
চমৎকার ফুল ক্রোসান্দ্রা
ছবি: ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের নার্সারিতে ক্রোসান্দ্রা ফুল। গত ৫ জুন ছবিটি তোলা হয়

আমাদের চারপাশের পরিচিত চমৎকার ফুলগুলোর মধ্যে একটি হলো ক্রোসান্দ্রা। এর বৈজ্ঞানিক নাম Crossandra infundibuliformis, এটি Acanthaceae পরিবারের উদ্ভিদ। মূলত দক্ষিণ ভারত ও শ্রীলঙ্কার আদি বাসিন্দা হলেও বর্তমানে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এর উজ্জ্বল ও আকর্ষণীয় রঙের কারণে বাগানপ্রেমীদের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। একে ইংরেজিতে ফায়ারক্র্যাকার ফ্লাওয়ার বা পটকা ফুলও বলা হয়। 

ক্রোসান্দ্রা মূলত একটি বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। গাছটি সাধারণত লম্বায় ১ থেকে ৩ ফুট (প্রায় ৩০ থেকে ৯০ সেন্টিমিটার) পর্যন্ত হয়ে থাকে। এর কাণ্ড সোজা, শক্ত এবং শাখা-প্রশাখাযুক্ত হয়। তরুণ অবস্থায় কাণ্ড নরম ও সবুজ থাকলেও পরিপক্ব হলে তা কিছুটা শক্ত ও ধূসর-বাদামি রং ধারণ করে।

এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, চকচকে এবং বল্লমাকার (lanceolate)। পাতার কিনারাগুলো মৃদু ঢেউ খেলানো বা মসৃণ হতে পারে। পাতাগুলো কাণ্ডের বিপরীতমুখী বিন্যাসে জোড়ায় জোড়ায় সাজানো থাকে, যা ফুল ছাড়াই গাছটিকে একটি দৃষ্টিনন্দন রূপ দেয়।

ক্রোসান্দ্রার মূল আকর্ষণ হলো এর ফুল। ফুলগুলো কাণ্ডের শীর্ষে একটি খাড়া মঞ্জরিদণ্ড বা স্পাইক থেকে পর্যায়ক্রমে ফোটে। প্রতিটি ফুলের একটি দীর্ঘ নল বা টিউব থাকে, যা ওপরের দিকে এসে ৩ থেকে ৫টি পাপড়িতে ছড়িয়ে পড়ে। পাপড়ির এই গঠনটি দেখতে কিছুটা ফানেল বা হাতপাখার মতো। প্রাকৃতিকভাবে ফুলগুলো উজ্জ্বল কমলা বা জাফরান রঙের হলেও বর্তমানে হাইব্রিড জাতের হলুদ, লাল এবং হালকা গোলাপি রঙের ক্রোসান্দ্রাও দেখতে পাওয়া যায়।

ফল ছোট ও চারকোনা আকৃতির ক্যাপসুল । এই ক্যাপসুল বা বীজাধারগুলো পেকে শুকিয়ে গেলে আর্দ্রতার সংস্পর্শে হঠাৎ করে ‘পট’ করে শব্দ করে ফেটে যায় এবং বীজগুলো দূরে ছিটকে পড়ে। এই বিশেষ বৈশিষ্ট্যের কারণেই এর নাম হয়েছে ‘ফায়ারক্র্যাকার ফ্লাওয়ার’। 

 শুধু সৌন্দর্য ছড়ানোই নয়, ক্রোসান্দ্রা উদ্ভিদের বেশ কিছু অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও পরিবেশগত গুরুত্ব রয়েছে। যেকোনো বাগান, বাড়ির বারান্দা বা ছাদবাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে ক্রোসান্দ্রার জুড়ি মেলা ভার। এটি প্রায় সারা বছরই (বিশেষ করে গরম ও বর্ষাকালে) থোকায় থোকায় ফুল দেয়। টবে বা ল্যান্ডস্কেপিংয়ে বর্ডার প্ল্যান্ট হিসেবে এটি দারুণ মানিয়ে যায়। এর উজ্জ্বল রঙের ফুল মৌমাছি ও প্রজাপতিকে আকর্ষণ করে, যা বাগানের পরাগায়নে সাহায্য করে।

 দক্ষিণ ভারতে বিশেষ করে তামিলনাড়ু ও কর্ণাটকে এই ফুল অত্যন্ত পবিত্র ও জনপ্রিয়। সেখানে একে ‘কানাকাম্বুরাম’ বলা হয়। নারীরা চুলে খোঁপা বা বেণি সাজাতে জুঁই ফুলের সঙ্গে বৈপরীত্য তৈরি করতে এই উজ্জ্বল কমলা ফুল ব্যবহার করেন। এ ছাড়া বিভিন্ন ধর্মীয় পূজা-পার্বণ ও উৎসবের মালা তৈরিতে এই ফুলের ব্যাপক বাণিজ্যিক চাহিদা রয়েছে। ফুলগুলো ছেঁড়ার পরও বেশ কয়েক দিন সতেজ থাকে। 

ক্রোসান্দ্রার কিছু ভেষজ গুণাগুণ রয়েছে। ঐতিহ্যগত চিকিৎসায় এর পাতা ও ফুলের কিছু ব্যবহার রয়েছে। এর কিছু উপাদান ব্যাকটেরিয়াবিরোধী এবং ছত্রাকবিরোধী গুণসম্পন্ন বলে মনে করা হয়। কিছু অঞ্চলে ত্বকের সাধারণ সংক্রমণ এবং ক্ষত নিরাময়ে এর পাতার রস ব্যবহার করা হয়। তবে যেকোনো চিকিৎসায় ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

ক্রোসান্দ্রাগাছ আংশিক রোদ এবং সুনিষ্কাশিত দোআঁশ মাটি পছন্দ করে। মাটিতে যেন পানি জমে না থাকে সেদিকে খেয়াল রাখলে এবং নিয়মিত ছাঁটাই করলে গাছটি দীর্ঘদিন প্রচুর ফুল দেয়। 

সহজ রক্ষণাবেক্ষণ এবং দীর্ঘস্থায়ী সৌন্দর্যের কারণে ক্রোসান্দ্রা যেকোনো ফুলপ্রেমীর সংগ্রহের জন্য একটি চমৎকার উদ্ভিদ। 

বিল-ঝিলে পদ্ম ও শাপলার মায়াবী রূপ

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৩:১৩ পিএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৩:২০ পিএম
বিল-ঝিলে পদ্ম ও শাপলার মায়াবী রূপ
ছবি: সংগৃহীত

ষড়ঋতুর বাংলাদেশে বর্ষার আগমনী বার্তার সাথে সাথেই বদলে যায় প্রকৃতির ক্যানভাস। দেশের মাঠ-ঘাট, পুকুর-ডোবা আর বিল-ঝিল মুখরিত হয়ে ওঠে নানা রঙের জলজ উদ্ভিদে।

উদ্ভিদবিজ্ঞানীদের মতে, বাংলাদেশের জলাশয়গুলোতে কয়েকশো প্রজাতির জলজ উদ্ভিদ জন্মে, যার মধ্যে প্রায় ১৩০টি প্রজাতিই সপুষ্পক। আর এই জলজ ফুলের রাজ্যে সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ে পদ্ম এবং আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা।

শুভ্রতার প্রতীক 'পুন্ডরিক' বা পদ্ম

জলজ ফুলের রানী বলা চলে পদ্মকে। চমৎকার সুগন্ধি এই ফুলের আরেকটি পরিচিত নাম ‘পুন্ডরিক’। পদ্মের পাতার গঠন অনেকটা শাপলার মতো হলেও এটি পেয়ালা আকৃতির এবং পানির ওপর আলতো করে জেগে থাকে।

পদ্মের প্রতিটি অংশের রয়েছে আলাদা নাম ও নান্দনিকতা। পানির নিচ থেকে উঠে আসা পদ্ম ফুলের ডাঁটিকে বলা হয় ‘মৃণাল’। আর এর কচি পাতার নাম ‘সংবর্তিকা’। সাধারণত বর্ষাকালে এই ফুলের সমারোহ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়, যা যেকোনো বিল বা পুকুরকে এক মায়াবী রূপ দেয়।

রাতের স্নিগ্ধতায় ফোটে শাপলা, মাধুরী ছড়ায় দিনে

বাংলাদেশের জাতীয় ফুল শাপলা সাধারণত দুই প্রজাতির দেখা যায়—ধবধবে সাদা এবং আকর্ষণীয় লাল। শাপলার বৈশিষ্ট্য হলো, এটি রাতের স্নিগ্ধতায় ডানা মেলে, তবে এর রূপের মাধুরী ও সৌন্দর্য ছড়ায় দিনের আলোতেও। একসাথে যখন বিশাল বিলজুড়ে অসংখ্য শাপলা ফুটে থাকে, তখন চারপাশের পুরো পরিবেশটাই বদলে যায়।

শাপলার শেকড় থাকে পানির নিচে কাদার গভীরে। লম্বা নালের ওপর ভর করে ফুলটি পানির ওপরে তার রূপের শোভা ছড়ায়। এর পাতার গোড়ার দিকটা দেখতে অনেকটা হৃদপিণ্ডের মতো এবং পাতার চারপাশটা থাকে ঢেউ খেলানো। রোদ ঝলমলে দিনে শাপলার রূপ যেমন খোলে, তেমনি ছায়া ঘেরা পুকুরের শান্ত পরিবেশেও এর সৌন্দর্য অন্যরকম এক শান্তি জোগায়।

শুধু রূপ নয়, গুণে ও ঔষধি গুণে অনন্য


জাতীয় ফুল শাপলা শুধু চোখের দেখাতেই সুন্দর নয়, এর রয়েছে দারুণ অর্থনৈতিক ও ঔষধি গুণ। শাপলার পুষ্পনল (ডাঁটা) আমাদের দেশে সবজি হিসেবে বেশ জনপ্রিয়। গ্রামীণ অর্থনীতি ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এর ভূমিকা অনস্বীকার্য। এছাড়া শাপলার ফুল, কন্দ (শালুক) এবং বীজ বিভিন্ন ধরনের ঐতিহ্যবাহী ঔষধি কাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

রক্তোৎপল: লালের মাঝে মায়ার ছোঁয়া


লাল রঙের যে শাপলা আমাদের চোখে পড়ে, তার আরেকটি সুন্দর নাম ‘রক্তোৎপল’। দেখতে দূর থেকে পদ্ম ফুলের মতো মনে হলেও এটি মূলত লাল শাপলা। এই প্রজাতির শাপলার নাল বা ডাঁটা প্রায় ৮ থেকে ১০ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে এবং এর পাতার ব্যাস হয় ১০ থেকে ১৮ ইঞ্চি পর্যন্ত।

স্বভাবে কোমল ও রঙে উজ্জ্বল এই ফুলের লালের মাঝে এক ধরণের হালকা ও গাঢ় রঙের মিশ্রণ থাকে, যা সহজেই পথচারীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে।

জলে জন্ম নিলেও জলকে ছাপিয়ে এই ফুলগুলো প্রকৃতিতে যে মায়াবী রূপ আর সুবাস ছড়িয়ে দেয়, তা বাংলার রূপকে পৃথিবীর বুকে অনন্য করে তুলেছে। বর্ষা আর শরতের এই জলজ রূপ আমাদের মনে করিয়ে দেয় প্রকৃতির সাথে মানুষের আত্মিক বন্ধনের কথা।

আমান/