স্নিগ্ধ সাদা রং, মন-মাতানো সুবাস আর অতুলনীয় কোমলতার এক অপরূপ প্রতীক হলো বেলি ফুল। এর মোহনীয় সুবাস আর ধবধবে সাদা পাপড়ি বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। বেলির বৈজ্ঞানিক নাম Jasminum sambac, এটি Oleaceae পরিবারের একটি জনপ্রিয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এই ফুলের আদি নিবাস দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বাঙালির উৎসব, সংস্কৃতি আর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এই ফুল জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে।
বেলি মূলত একটি মাঝারি আকৃতির গুল্মজাতীয় বা লতানো গাছ। এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, চকচকে এবং ডিম্বাকৃতির হয়ে থাকে। বেলি ফুল সাধারণত গুচ্ছাকারে ফোটে। পাপড়ির বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে বেলি ফুল কয়েক জাতের হয়। এক পাপড়ির বেলি আকারে কিছুটা ছোট এবং এর সুবাস অত্যন্ত তীব্র হয়। মাঝারি বেলিতে পাপড়ির স্তর কিছুটা বেশি থাকে। থোকা বেলি গোলাপের মতো ঘন পাপড়িযুক্ত এবং আকারে বেশ বড় হয়।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন প্রকৃতি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই বেলি ফুল ফোটার ধুম পড়ে। মূলত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল বেলি ফুল ফোটার প্রধান সময়। বিকেলের ম্লান আলোয় এই ফুল ফুটতে শুরু করে এবং সন্ধ্যার পর এর সুবাস চারপাশ মুখরিত করে তোলে। বেলি ফুল চাষের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া সবচেয়ে উপযোগী। রোদেলা জায়গায় এই গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত দোআঁশ মাটিতে বেলি ভালো হয়। বছরের চৈত্র মাস থেকে শুরু করে বর্ষাকাল পর্যন্ত বেলিফুল ফোটার প্রধান সময়। কাটিং বা কলমের মাধ্যমে খুব সহজেই এই ফুলের বংশবিস্তার করা যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে দিলেই নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।
শীতকালে বেলি গাছ একপ্রকার সুপ্তাবস্থায় থাকে। তাই শীতের শেষে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে) গাছের ডালপালা হালকা ছাঁটাই করে দিলে বসন্ত ও গ্রীষ্মে প্রচুর নতুন কুঁড়ি আসে।
বেলি শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেলি ফুলের চাষ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বাঙালির যেকোনো উৎসব, বিয়ে বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বেলি ফুলের মালা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নারীদের খোঁপার শোভা বর্ধনে কিংবা ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে এর জুড়ি মেলা ভার। এর তীব্র ও মনমাতানো ঘ্রাণের জন্য পারফিউম, কসমেটিকস এবং ধূপকাঠিতে বেলিফুলের নির্যাস ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনায় বেলিফুল পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বেলি ফুলের সুগন্ধি তেল (Jasmine Essential Oil) অত্যন্ত মূল্যবান। এটি নামি-দামি পারফিউম, সাবান, সুগন্ধি তেল এবং বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় বেলির পাতা ও ফুলের ব্যবহার রয়েছে। এর সুবাস মানসিক চাপ ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। অনেক দেশে বেলির শুকনা পাপড়ি দিয়ে সুগন্ধি ‘জেসমিন টি’ বা চা তৈরি করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, হজমে সাহায্য করে। এ ছাড়া এর পাতা ও শিকড় নানা চর্মরোগ সারাতে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
আমাদের সাহিত্যে ও গানে বেলিফুলের উপস্থিতি বিশাল। বেলিফুল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্মিকী প্রতিভা গীতিনাট্যে লিখেছেন,
‘বেলি ফুল, বেলিফুল,
কার খোঁপায় হবি ব্যাকুল
কার গলায় মালিকা হয়ে
সুবাস দিবি আকুল করে।’
বেলিফুল কিন্তু ফিলিপিন্সের জাতীয় ফুল। সেখানে একে বলা হয় ‘সাম্পাগুইতা’ (Sampaguita)। এটি সেখানে বিশুদ্ধতা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়।
শহুরে ব্যালকনি বা ছাদবাগান থেকে শুরু করে গ্রামীণ উঠোন—সবখানেই বেলি ফুল তার আপন মহিমায় উজ্জ্বল। এর সরল সৌন্দর্য এবং তীব্র ও স্নিগ্ধ সুবাস আমাদের মনকে সতেজ করে তোলে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে ঘরের কোণে এক গোছা বেলি ফুল এনে দিতে পারে এক টুকরো অনাবিল শান্তি ও সতেজতা।
লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ