গত বছরের ২২ আগস্টের বিকেল। সেদিন আকাশ ছিল মেঘলা। ব্রহ্মপুত্র তীরের বুড়া পীরের মাজারের পেছনের ব্লক বাঁধানো রাস্তা ধরে হাঁটছিলাম। উত্তর দিকে চর, তারপর নদী। রাস্তার ধারে বেশ কয়েকটি পুটুস ফুলের ঝোপ। ফুটে আছে মুগ্ধ করা হলুদ, কমলা, সাদা রঙের ফুল। ফুলের গায়ে প্রজাপতি বসছে মধুর সন্ধানে।
আমাদের গ্রামীণ প্রকৃতির ঝোপঝাড়ে, রাস্তার ধারে কিংবা পরিত্যক্ত জমিতে ছোট ছোট থোকা থোকা রঙিন ফুলের যে গাছটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে, তা হলো পুটুস। অনেকে একে ল্যান্টানা, ছত্রা, রাইমুনিয়া নামেও চেনেন। এর বৈজ্ঞানিক নাম Lantana camara, এটি Verbenaceae পরিবারের গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। একসময়ে কেবলই বুনো ফুল হিসেবে অবহেলিত হলেও এর রঙের বৈচিত্র্য এবং প্রজাপতি আকর্ষণ করার ক্ষমতার কারণে এটি এখন বাগানবিলাসী মানুষের কাছেও বেশ জনপ্রিয়।
পুটুস মূলত একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর কাণ্ড কিছুটা চতুষ্কোণাকার এবং গায়ে ছোট ছোট নরম কাঁটা থাকে। পাতাগুলো খসখসে, ডিম্বাকৃতির এবং কিনারা খাজকাটা। পাতা হাত দিয়ে কচলালে একধরনের তীব্র ও ঝাঁঝালো গন্ধ বের হয়।
পুটুস ফুলের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে এর রং বদলানোর ক্ষমতায়। একই থোকায় হলুদ, কমলা, লাল, গোলাপি ও সাদা রঙের ফুলের সহাবস্থান দেখা যায়। আসলে ফুলে পরাগায়ন হওয়ার পর তাদের রং পরিবর্তন হয়। এই মনকাড়া রঙের কারণেই দূর থেকে প্রজাপতি, মৌমাছি এবং হরেক রকমের পাখি এই ফুলের দিকে ছুটে আসে। এই উদ্ভিদের আদি নিবাস আমেরিকা মহাদেশের ক্রান্তীয় অঞ্চল।
লোকজ চিকিৎসায় পুটুসগাছের পাতা, ছাল এবং শিকড়ের ব্যবহার বহু প্রাচীন। এর পাতার রস অ্যান্টিসেপটিক হিসেবে কাজ করে। গ্রামে কেটে যাওয়া স্থানে পুটুস পাতার রস লাগিয়ে রক্তপাত বন্ধ করার রেওয়াজ আছে। চুলকানি, অ্যাকজিমা বা ত্বকের যেকোনো অ্যালার্জিজনিত সমস্যায় এর পাতার ক্বাথ ব্যবহার করা হয়। কিছু অঞ্চলে ম্যালেরিয়া, জ্বর এবং বাতের ব্যথা উপশমে এর শিকড় ও পাতার মৃদু ব্যবহার রয়েছে।
প্রকৃতিতে পুটুস উদ্ভিদের পরিবেশগত ভূমিকা বেশ জটিল। একদিকে এটি পরিবেশের জন্য যেমন উপকারী, অন্যদিকে এর কিছু ক্ষতিকর দিকও রয়েছে। পুটুসগাছের পাকা ফল দেখতে কালচে-বেগুনি ও আকর্ষণীয় হলেও এর কাঁচা ফল এবং পাতা মানুষ ও গবাদি পশুর জন্য তীব্র বিষাক্ত। এটি লিভারের ক্ষতি করতে পারে, তাই শিশুদের এই ফল থেকে দূরে রাখা উচিত।
এটি মাটির ক্ষয় রোধ করে। প্রচণ্ড খরা বা প্রতিকূল পরিবেশেও এই গাছ টিকে থাকতে পারে। এর ফুল থেকে মৌমাছিরা মধু সংগ্রহ করে, যা পরাগায়নে সাহায্য করে।
পুটুস অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে। এটি যেখানে জন্মায়, সেখানকার মাটির পুষ্টি ও আলো একাই শুষে নেয়। ফলে অন্য দেশীয় উদ্ভিদগুলো সেখানে আর বাড়তে পারে না। এ কারণে বিশ্বের অনেক দেশে এটিকে আক্রমণাত্মক আগাছা হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রায় ২০০ বছর আগে নিরীহ এই গুল্মজাতীয় গাছকে বাগানের সৌন্দর্য বাড়াতে ব্রিটিশরা আমদানি করে, কিন্তু এই উদ্ভিদ যে ক্রমেই আগ্রাসী হয়ে উঠবে তা তারা ভাবেনি। পুটুসের আগ্রাসনের কারণে স্থানীয় অনেক উদ্ভিদ টিকে থাকতে পারছে না।
প্রকৃতির এক অদ্ভুত সৃষ্টি এই পুটুস। এর ক্ষতিকর বা আক্রমণাত্মক দিক থাকলেও গ্রামীণ প্রকৃতির সৌন্দর্য বাড়াতে এর জুড়ি মেলা ভার। একটি ছোট্ট প্রজাপতি যখন রঙিন পুটুস ফুলের ওপর এসে বসে, সেই দৃশ্য যেকোনো মানুষের মনকে প্রশান্তিতে ভরিয়ে দিতে পারে। নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখে একে যদি বাগানের শোভা হিসেবে ব্যবহার করা যায়, তবে এর রূপের সঠিক মূল্যায়ন সম্ভব।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ