নির্বাচনি ইশতেহার বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের অগ্রাধিকার কর্মসূচি, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের কর্মপরিকল্পনা এবং আগামী পাঁচ বছরের একটি সমন্বিত মেগা কর্মপরিকল্পনা নিয়ে এগোচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে গতি আনা, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, প্রশাসনিক দক্ষতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং দেশের সব অঞ্চলে সমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
গতকাল বুধবার জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনের প্রশ্নোত্তর পর্বে বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
প্রধানমন্ত্রী জানিয়েছেন, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে নতুন উদ্যোগ হিসেবে বিদেশ থেকে বিনিয়োগ আনতে পারলে ১ দশমিক ৫ শতাংশ ইনসেনটিভ দেওয়া হবে।
পাবনা-৫ আসনের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষিত কর্মসূচিগুলো বাস্তবায়নে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগ ১৮০ দিন, আগামী অর্থবছর এবং পরবর্তী পাঁচ বছরের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। ইতোমধ্যে এসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’–এই দর্শনের আলোকে পরিবারের প্রধান নারী সদস্যকে ফ্যামিলি কার্ডের মাধ্যমে মাসিক আড়াই হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৬০ হাজারের বেশি পরিবার এ সুবিধার আওতায় এসেছে। কৃষকদের জন্য কৃষক কার্ড চালু করা হয়েছে এবং প্রায় ১৩ লাখ কৃষকের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ মওকুফে ১ হাজার ৫৬৭ কোটি টাকার বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতে পাঁচ জেলায় পরীক্ষামূলকভাবে ‘ই-হেলথ কার্ড’ চালুর উদ্যোগের কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। পাশাপাশি ধর্মীয় উপাসনালয়ের ইমাম, পুরোহিত, ভিক্ষু ও পাদ্রিদের সম্মানী ভাতা সম্প্রসারণের পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন তিনি।
মো. মোবাশ্বের আলম ভূঁইয়ার প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকারের প্রথম বাজেট ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য নিয়েই প্রণয়ন করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘ব্যবসায়ীরা যাতে নির্বিঘ্নে ব্যবসা করতে পারেন এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারেন, সেদিকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং বিনিয়োগ-প্রক্রিয়া সহজ করতে সরকার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েছে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, প্রকৃত ও ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প উদ্যোক্তাদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ৯ শতাংশ সুদে ৬ হাজার কোটি টাকার একটি তহবিল গঠন করেছে।
সংসদে সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশি কিংবা বিদেশি নাগরিক যদি দেশে বিনিয়োগ নিয়ে আসতে পারেন, তাহলে আনা বিনিয়োগের ওপর ১ দশমিক ৫ শতাংশ ইনসেনটিভ বা কমিশন দেওয়া হবে।
তিনি বলেন, ‘আমরা শুধু বিদেশি বিনিয়োগ নয়, দেশীয় বিনিয়োগও উৎসাহিত করতে চাই। ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ পদ্ধতির মাধ্যমে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা হবে।’ বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মুনাফা নিজ দেশে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে বিদ্যমান প্রতিবন্ধকতাও আইনি সংস্কারের মাধ্যমে দূর করা হবে বলে জানান সরকারপ্রধান।
বিরোধী দলের এলাকাতেও সমান উন্নয়ন
সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্যদের উন্নয়ন কার্যক্রম তদারকি নিয়ে বিরোধীদলীয় সদস্য ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেমের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নারী সংসদ সদস্যদের সংবিধান বা আইনে নির্দিষ্ট কোনো ভৌগোলিক আসন না থাকলেও রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামোর ভিত্তিতে তাদের কাজের ক্ষেত্র নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি বলেন, সরাসরি নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের মতো নারী সংসদ সদস্যদেরও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে কাজ করার অধিকার রয়েছে। পরে অন্য এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকার দেশের সুষম উন্নয়নে বিশ্বাস করে। সরকারি দলের সংসদ সদস্যদের মতো বিরোধী দলের সদস্যদের এলাকাতেও সমানভাবে উন্নয়ন সহযোগিতা দেওয়া হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা গণতন্ত্রে বিশ্বাসী ও জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক সরকার। গঠনমূলক সমালোচনা থাকলে অবশ্যই তা গ্রহণ করা হবে।’
তিনি জানান, দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরনগরী চট্টগ্রামকে আধুনিক ও পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক নগরীতে পরিণত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। একই সঙ্গে প্রশাসনের সব স্তরে দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
এদিকে কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে পাঁচ লাখ সরকারি কর্মচারী নিয়োগের সিদ্ধান্ত, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ফ্রি ওয়াই-ফাই, ‘ওয়ান টিচার ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচি, পেপ্যাল চালুর উদ্যোগ, ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে ২০ শতাংশ বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যের কথাও সংসদকে অবহিত করেন প্রধানমন্ত্রী।