প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের দশম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ অন্নপূর্ণা-১-এ বাংলাদেশের পতাকা ওড়ালেন পর্বতারোহী বাবর আলী।
বাবর আলী নিজেই চট্টগ্রামভিত্তিক দেশের শীর্ষস্থানীয় পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা এবং বর্তমান সাধারণ সম্পাদক। পেশায় চিকিৎসক এই পর্বতারোহী ২০২৪ সালে প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে একই অভিযানে এভারেস্ট ও লোৎসে পর্বত এবং প্রথম বাঙালি হিসেবে ২০২২ সালে অন্যতম টেকনিক্যাল চূড়া আমা দাবলামের শীর্ষ স্পর্শের নজির গড়েন।
এ ছাড়া বাবর প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে ভারতের দীর্ঘতম সড়ক কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী করেছেন সাইক্লিং, প্রথম বাঙালি হিসেবে পায়ে হেঁটে পাড়ি দিয়েছেন শ্রীলঙ্কার এমাথা থেকে ওমাথা। প্লাস্টিকের দূষণের বার্তা ছড়াতে তিনি ৬৪ দিনে হেঁটেছেন বাংলাদেশের ৬৪ জেলা। এ ছাড়া লেখক হিসেবে আছে বাবর আলীর বেশ সুখ্যাতি। তিনি ম্যালরি ও এভারেস্ট, পায়ে পায়ে ৬৪ জেলা, সাইকেলের সওয়ারি, এভারেস্ট ও লোৎসে শিখরে নামক ৪টি বইয়ের রচয়িতা।
বাবর চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার নজুমিয়া হাটের লেয়াকত আলী ও লুৎফুন্নাহার বেগমের দ্বিতীয় সন্তান। তিনি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের ৫১তম ব্যাচের ছাত্র ছিলেন।
সোমবার (৭ এপ্রিল) ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের প্রেসিডেন্ট ও অভিযান ব্যবস্থাপক ফরহান জামান জানান, পৃথিবীর দশম সর্বোচ্চ পর্বতশৃঙ্গ অন্নপূর্ণা-১ এ ৭ এপ্রিল সোমবার ভোরে বাংলাদেশের পতাকা ওড়ান বাবর আলী। এই অভিযানের আউটফিটার মাকালু অ্যাডভেঞ্চারের স্বত্বাধিকারী মোহন লামসাল তাকে বিষয়টি নিশ্চিত করেন। অন্নপূর্ণা-১ অভিযানে বাবরের সঙ্গী ছিলেন ক্লাইম্বিং গাইড ফূর্বা অংগেল শেরপা।
বাবরের সংগঠন ও এই অভিযানের আয়োজক পর্বতারোহণ ক্লাব ভার্টিক্যাল ড্রিমার্সের পক্ষ থেকে সোমবার দুপুরে বলা হয়, ‘লাখো শুভাকাঙ্ক্ষীর প্রার্থনার উত্তর দিয়েছেন স্রষ্টা। প্রকৃতিমাতা বিমুখ হননি। বঙ্গসন্তান বাবরকে ক্ষণিকের জন্য নিজের চূড়ায় দাঁড়াতে দিয়েছে অন্নপূর্ণা। বিশ্বের দশম শীর্ষ পর্বত এবং অন্যতম কঠিন পর্বত ২৬ হাজার ৫৪৫ ফুট উচ্চতার অন্নপূর্ণা-১-এর শীর্ষে প্রথমবার উড়ল আমাদের লাল-সবুজের পতাকা। অন্নপূর্ণা জয় করার পর বাবর আলী সুস্থাবস্থায় ক্যাম্প-৩ তে নেমে এসেছেন।’
বাংলাদেশ থেকে বাবর আলী নেপালে যান গত ২৪ মার্চ। প্রস্তুতি শেষ করে ২৬ মার্চ কাঠমান্ডু থেকে বিমানে যান পোখারা। এরপর কিছু পথ গাড়িতে ও বাকি পথ পায়ে হেঁটে ২৮ মার্চ পৌঁছেন বেসক্যাম্পে। একদিন বিশ্রাম নিয়ে পরদিন চড়তে শুরু করেন। ক্যাম্প-১ (৫২০০ মিটার) এ দুই রাত এবং ক্যাম্প-২ (৫৭০০ মিটার) এ এক রাত কাটিয়ে ২ এপ্রিল তিনি ফের বেসক্যাম্পে নেমে এসে ভালো আবহাওয়ার জন্য অপেক্ষার করেন। নেমে এসেই জানতে পারেন আবহাওয়ার পূর্বাভাস বলছে, ভালো আবহাওয়া থাকবে পরদিন থেকে ৬ এপ্রিল পর্যন্ত। এদিকে রোপ ফিক্সিং টিম খারাপ অবস্থার জন্য ৭৬০০ মিটার উচ্চতা থেকে আগেই একবার ফিরে আসে। সম্ভাব্য ভালো আবহাওয়াকে কাজে লাগাতে মাত্র ২৪ ঘণ্টা বিশ্রাম নিয়েই বাবর ৩ এপ্রিল থেকে আবার চড়তে শুরু করেন। ওইদিন ক্যাম্প-১ এ থেমে পরদিন উঠে আসেন ক্যাম্প-২ এ। এর মাঝেই শুরু হয় বিপত্তি। বিকেল থেকেই হঠাৎ শুরু হয় তুষারঝড়।
দীর্ঘ যোগাযোগহীনতার পর স্বস্তির সুবাতাস জানান দেয় যে ৫ এপ্রিল বাবর পেরিয়ে গেছেন কঠিন অংশ, পৌঁছে গেছেন ক্যাম্প-৩ (৬৫০০ মিটার)। সাধারণত ৭৪০০ মিটার উচ্চতায় ক্যাম্প-৪ তৈরি করে সামিট পুশ শুরু হলেও সিদ্ধান্ত হয় অবস্থার প্রেক্ষিতে এই ক্যাম্প বাদ দিয়ে ক্যাম্প-৩ থেকেই শুরু হবে চূড়ার উদ্দেশ্যে যাত্রা, অর্থাৎ ওই উচ্চতায় একটানা ১৬০০ মিটার পথ দিতে হবে পাড়ি। চূড়া পর্যন্ত পথ তৈরি এবং আবহাওয়ার উন্নতির জন্য ক্যাম্প-৩-এ অতিরিক্ত একদিন অপেক্ষা করে ৬ এপ্রিল রাতে ওই চ্যালেঞ্জ নিয়ে বাবর বেরিয়ে পড়েন। এদিকে রোপ ফিক্সিং টিম সামিট পর্যন্ত পথ তৈরি করতেই ভোরে শীর্ষে উঠে আসেন বাবর আলী। পরবর্তী পরিকল্পনা হলো আজই তিনি নেমে আসবেন ক্যাম্প-২ এ। সেখানে রাতটা কাটিয়ে নেমে আসবেন বেসক্যাম্পের নিরাপত্তায়।
অভিযান ব্যবস্থাপক ফরহান জামান বলেন, ‘গত বছর এভারেস্ট-লোৎসে সামিটের পর এবার অন্নপূর্ণা-১-এর শীর্ষে পৌঁছানোর মাধ্যমে বাবর আলী বাংলাদেশের পর্বতারোহণের ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছেন। তার কঠোর পরিশ্রম এবং নিরলস অধ্যবসায়ের প্রতিফলন এই সাফল্য। আমরা আশা করি এই অর্জন বাংলাদেশের পর্বতারোহণে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। আমাদের ইচ্ছা ছিল এবার বাবরকে একসঙ্গে তিন পর্বতে পাঠাব। কিন্তু পৃষ্ঠপোষকতার অভাবে আমাদের একটি পর্বতেই থামতে হয়েছে। বাবরের লক্ষ্য ১৪টি আটহাজারি শৃঙ্গের সবকটিতেই লাল-সবুজের পতাকা উড়ানো।
বাবর আলীর এই অভিযানে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে ভিজ্যুয়াল নিটওয়্যার্স লিমিটেড, ভিজ্যুয়াল ইকোস্টাইলওয়্যার লিমিটেড, এডিএফ অ্যাগ্রো, ফ্লাইট এক্সপার্ট, এভারেস্ট ফার্মাসিউটিক্যালস লিমিটেড ও ব্লু জে।
সালমান/