ঈদুল আজহার ছুটি শেষে রাজধানীতে কর্মচাঞ্চল্য ফিরে এসেছে। আবারও পুরোনো চেনা রূপে ফিরতে শুরু করেছে ঢাকা। অফিস-আদালত, ব্যাংক, পুঁজিবাজারসহ সরকারি-বেসরকারি সব অফিসে শুরু হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মব্যস্ততা।
তবে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো এখনো বন্ধ থাকায় যানজট সেভাবে দেখা যায়নি। কিন্তু অচিরেই যে যানজটের দেখা মিলবে তা বলাই বাহুল্য। কারণ এ নগরে নেই কোনো আধুনিক সিগনাল সিস্টেম। গত ২৫ বছরে রাজধানীতে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করে সিগনাল সিস্টেম আধুনিকায়ন করার সব প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে গণপরিবহন খাত বিশেষজ্ঞ ও নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, গণপরিবহনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে ঢাকায় সিগনাল সিস্টেম আধুনিকায়নের যেকোনো প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়বে।
ব্যর্থ সব প্রকল্প, তবুও পুরোনো পথে হাঁটছে সরকার
২০০১ সালে ঢাকা নগর অঞ্চল পরিবহন পরিকল্পনার অধীনে (ডিইউটিপি) ট্রাফিক সিগনাল স্থাপন শুরু হয়। ঢাকায় ৬৮টি স্থানে সিগনাল স্থাপন বিশ্বব্যাংক এই প্রকল্পে ২৫ কোটি টাকা অর্থ সহায়তা দিয়েছিল। তবে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক সিগনাল অকার্যকর হয়ে পড়েছিল।
২০০৯ সালে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে নির্মল বায়ু এবং টেকসই পরিবেশ প্রকল্প শুরু হয়। ৪৪৫ কোটি টাকার এ প্রকল্প তিন দফায় সংশোধিত হয়ে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৮০ কোটি টাকায়। বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের নিরীক্ষায় এই প্রকল্পের নানা অনিয়ম উঠে আসে। পরামর্শক খাতে অযথা ব্যয় ও বিনা প্রয়োজনে প্রকল্প কর্মকর্তাদের বিদেশ সফরে এ প্রকল্পের অর্থ নিয়ে নয়ছয়ের ঘটনা জানা যায়।
ঢাকার চারটি ইন্টার সেকশনে স্বয়ংক্রিয় ট্রাফিক সিস্টেম বসানোর আরেকটি উদ্যোগ নিয়েছিল ডিটিসিএ। ২০১৬ সালের শুরুতে এর ব্যয় ছিল ৩৭ কোটি টাকা, পরে ব্যয় হয় ৫২ কোটি টাকা।
তবুও ঢাকার সিগনাল সিস্টেম নিয়ে নিরীক্ষা আর প্রকল্প থেমে থাকেনি। গত দুই দশকে বিশ্বব্যাংক, জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) মতো ঋণদাতা সংস্থার অর্থে ঢাকার ১৭৮টি স্থানে আধুনিক সিগনাল বাতি স্থাপন করা হয়। তবে এগুলোর মধ্যে গুলশান-২ সার্কেলের সিগনাল সিস্টেম কার্যকর রয়েছে।
২০২৩ সালের শুরুতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ট্রাফিক ইঞ্জিনিয়ারিং সার্কেল ৫৩টি নির্ধারিত ট্রাফিক সিগনাল পয়েন্টে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের উদ্যোগ নেয়। এ প্রকল্পে অর্থায়নের জন্য তারা বিশ্বব্যাংকের সঙ্গেও যোগাযোগ করেছিল।
ডিএসসিসির এই প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা বহাল থাকে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। বুয়েটের দুই অধ্যাপকের পরামর্শে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের চার মোড়ে পরীক্ষামূলকভাবে ট্রাফিক সিগনাল বসানোর কাজ চলছে। এটি হচ্ছে সেমি অটোমেটেড সিগনাল এইড। এখানে একটা বাটন থাকবে, যেটা একবার ম্যানুয়াল আবার অটোমেটেড (স্বয়ংক্রিয়) করা যাবে। কম ট্রাফিক থাকলে অটোমেটেড মুডে কাজ করবে। সময় নির্ধারণ করে দেওয়া যাবে। আবার ট্রাফিক বেশি থাকলে ম্যানুয়ালি সময় পরিবর্তন করে নেওয়া যাবে।
ট্রাফিক পুলিশরা যে ধরনের কাজ করে- সেই ধরনের সুবিধা এতে থাকবে। তাদের আর হাত দেখাতে হবে না। সিগনালের মাধ্যমে ট্রাফিক বাতি দেখানো হবে। চাইলে যেকোনো সময় যেকোনো সিগনালের সময় নিয়ন্ত্রণ করা যাবে।
বুয়েট প্রতিটি সিগনাল বানানো ও ইনস্টল করার জন্য সাড়ে ১০ লাখ টাকা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য মাসে দেড় লাখ টাকা চেয়েছে।
তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) প্রকল্পটি নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে আপত্তি আছে। তারা বলছে, এ প্রকল্পের রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় অনেক বেশি। ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ) ভবনে ঢাকার জন্য সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (আরএসটিপি)-সংক্রান্ত একটি সভায় বিশেষজ্ঞরা এমন অভিমত জানান। ঢাকার যানজট নিয়ন্ত্রণে তারা নির্ধারিত সময়ভিত্তিক, সক্রিয় ও অভিযোজিত ব্যবস্থার সমন্বয়ে ট্রাফিক সিগনাল লাইট স্থাপনের পরামর্শ দিয়েছেন। ঢাকার ভেতরে বাস অগ্রাধিকার রুটগুলোর যাত্রী পারাপারের জন্য প্রায় ৯৭টি বাস অগ্রাধিকার ট্রাফিক সিগনাল স্থাপন করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
আরএসটিপি পরিকল্পনা নিয়েও অনেক বিতর্ক
পরিবহন খাত বিশেষজ্ঞ ও নগর-অঞ্চল পরিকল্পনাবিদরা এখন করিডরভিত্তিক পার্কিং ফি ব্যবস্থা চালু করার কথা বলেন। উন্নত দেশগুলোতেও ব্যস্ততম সড়কে যানজট কমাতে এই প্রকল্প বেশ কাজে এসেছে। অ্যাডভান্স টোলিং বা সেন্সর প্রযুক্তি ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে গাড়ি শনাক্ত করে চার্জ ধার্য করা যায় এই পদ্ধতিতে। সে ক্ষেত্রে ঢাকার কোনো নির্দিষ্ট সড়কে চলাচলকারী যানবাহনের চালকরা নির্দিষ্ট ফি দিতে বাধ্য থাকবেন। ওই সড়কে চলাচল করতেও তাদের নির্দিষ্ট শর্ত মেনে চলতে হবে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এতে চালকরা বিকল্প সড়ক ব্যবহার করবেন বা গণপরিবহন ব্যবহারে বাধ্য হবেন।
সড়ক-মহাসড়ক বিভাগের বেশ কয়েকজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই পরিকল্পনা নিয়ে আপত্তি তুলেছেন। তারা বলছেন, নগরে গণপরিবহন ব্যবস্থা অপ্রতুল। এ ছাড়া এক করিডরের গাড়ি আরেক করিডরে গিয়ে বাড়তি চাপ তৈরি করবে। তারা বিদ্যমান সড়ক কাঠামোতে সমাধান খুঁজতে বলেছেন আরএসটিপি কমিটিকে। সড়ক থেকে ভ্রাম্যমাণ দোকানপাট সরিয়ে দেওয়া, রিকশার জন্য আলাদা লেন করা, নির্দিষ্ট বাস-বে স্থাপনের বিকল্প দেখছেন না। তারা ঢাকায় বিদ্যমান ট্রাফিক সিগনালগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করতে বলেছেন।
ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. সরওয়ার খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিগনাল সিস্টেম আধুনিকায়ন করে যানজট রাতারাতি কমে যাবে তা মনে হয় না। যেসব পয়েন্টে অটোমেটেড সিগনাল সিস্টেম চালু করা হবে, সেখানে ট্রাফিক কন্ট্রোলে জনবল কম লাগবে। সেই জনবল আমরা অবৈধ পার্কিং, ট্রাফিক আইন অমান্যকারীরা চালকদের শাস্তির আওতায় আনতে নিয়োগ করতে পারব।’
আরএসটিপি সভায় ঢাকা মহানগরের ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের জন্য সেন্ট্রাল ট্রাফিক কন্ট্রোল সেন্টার (সিটিসিসি) স্থাপনের পরামর্শ এসেছে। এই কেন্দ্র থেকে সব প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলো ইন্টারঅ্যাকটিভ ম্যাপ এবং সিসিটিভি ক্যামেরার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা যাবে। ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি এই কেন্দ্র থেকে নাগরিকদের ফোন কল, ইন্টারনেটের মাধ্যমে দুর্ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করবে। তবে ডিএমপি নাকি ডিটিসিএ এ সিটিসিসির নিয়ন্ত্রক হবে, এ নিয়ে তর্ক চলছে।
ঢাকার নানা ফ্লাইওভারে নিচে খালি জায়গাগুলোতে পার্কিং লট করে তা তৃতীয় পক্ষকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে আরএসটিপিতে। জানা গেছে, তাতে বাদ সেধেছে ডিএমপি। কারণ, তৃতীয় পক্ষকে লিজ দিতে গিয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতির প্রসঙ্গ নতুন কিছু নয়।
পার্কিং আইন কঠিন করতেই হবে, বলছেন বিশেষজ্ঞরা
২০১৯ সালে ঢাকায় ৬৪টি পার্কিং স্পট অনুমোদন করে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। পরে এই সংস্থা রাজধানীর জন্য খসড়া পার্কিং নীতির একটি খসড়া সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগে জমা দেয়। এরপর আর কাজ এগোয়নি। পার্কিং নীতির খসড়ায় রাজধানীতে বিভিন্ন এলাকার পার্কিং চাহিদা নির্ধারণ, স্থান চিহ্নিতকরণ এবং ফি নির্ধারণ করার কথা বলা হয়। এতে বলা হয়, নির্ধারিত সময়সীমার ভিত্তিতে স্থানীয় রাস্তায় পার্কিং করার সুযোগ থাকবে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বহুতল পার্কিং লট নির্মাণের কথা বিবেচনা করা যেতে পারে।
নগরে পার্কিং ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, ‘ডিটিসিএ যে পার্কিং নীতিমালার খসড়া করেছে তা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে হবে। পার্কিং ফি বাড়িয়ে দিতে হবে যেন মানুষ ব্যক্তিগত যানবাহন বেশি ব্যবহার করতে উৎসাহ না পান। তবে তার আগে গণপরিবহনের সহজলভ্যতাও নিশ্চিত করতে হবে। প্রয়োজনে কমিউনিটি বেজড পার্কিংয়ের কথা ভাবা যেতে পারে।’
বুয়েটের অ্যাক্সিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. শামছুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘যেকোনো শহরের পরিবহন পরিকল্পনার মূল কথা হলো, রাস্তার অনুপাতে গাড়ির সংখ্যা আসলে কত বা বিদ্যমান রাস্তায় কতসংখ্যক গাড়ি সারা দিন চলাচল করতে পারবে। কিন্তু আমাদের ঢাকায় প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ নতুন গাড়ি নামছে। এ অবস্থায় আমরা যে সিগনাল সিস্টেমই চালু করি না কেন কথা একটাই, ট্রান্সপোর্টের অর্ডারলি মুভমেন্ট।’