ড. বদিউল আলম মজুমদার একজন অর্থনীতিবিদ, রাজনীতি বিশ্লেষক, স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ও উন্নয়নকর্মী। এ ছাড়া তিনি নাগরিক সংগঠন ‘সুজন-সুশাসনের জন্য নাগরিক’-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও সমসাময়িক রাজনীতি বিষয়ে খবরের কাগজের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সিনিয়র সহসম্পাদক শেহনাজ পূর্ণা।
খবরের কাগজ: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেমন হতে যাচ্ছে বলে আপনি মনে করেন?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেশে নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পন্ন করতে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের বিকল্প নেই। রাষ্ট্র মেরামত করতে কতগুলো পদ্ধতির পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছিল। ছাত্র-জনতার আকাঙ্ক্ষা ছিল রাষ্ট্র মেরামতের আকাঙ্ক্ষা। রাষ্ট্রকে ঢেলে সাজানোর আকাঙ্ক্ষা; যাতে স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট সরকার আবার ফিরে না আসে। কতগুলো প্রক্রিয়ার পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছিল। একই সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর পরিবর্তন জরুরি হয়ে পড়েছিল। অনেক পরিবর্তনের মধ্যদিয়ে অবশেষে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন ধার্য হয়েছে। এবার আশা করা যায় যে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকার ফিরে আসবে। একই সঙ্গে দল-মতনির্বিশেষে সরকার গঠনের মধ্যদিয়ে গণতন্ত্রের বিজয় নিশ্চিত হবে বলে আমরা আশাবাদী।
খবরের কাগজ: নির্বাচনের লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড কেমন মনে করছেন এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অনুকূল আছে কি না?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: বিগত সরকারের সময়ে দেশে আইনের শাসন ছিল না। দুর্বলচিত্তের ব্যক্তিদের, দুর্বল চরিত্রের ব্যক্তিদের- যাদের দলীয় আনুগত্য আছে, সেসব ব্যক্তিকে নিয়োগ দেওয়ার ফলে তারা নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। নির্বাচন গ্রহণযোগ্য করতে হলে অবশ্যই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নত হওয়া জরুরি। দুঃখজনক হলেও সত্য যে, অতীতে আমাদের সংবিধানপ্রণেতারাই ‘প্রধানমন্ত্রী’ পদকে অতি বেশি ক্ষমতা দিয়ে রাষ্ট্রপতিকে ক্ষমতাহীন করেছিলেন। এরাই প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রপতির মধ্যকার ক্ষমতার ভারসাম্য নষ্ট করে স্বৈরতন্ত্রের জন্ম দিয়েছিল। যে কারণে সর্বত্র এর একটি নেতিবাচক প্রভাব আমরা দেখেছি। এখন নাগরিক সমাজের অন্যতম দায়িত্ব হলো, নজরদারির ভূমিকা পালন করা। যাতে ক্ষমতার অপপ্রয়োগ এবং নাগরিকের অধিকার কোনোভাবেই হরণ করা না হয়। রাজনৈতিক দলও নজরদারির ভূমিকা পালন করতে পারে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করতে পারে। আমরা যদি একটা ইতিবাচক পরিবর্তন চাই এবং এতে মনোযোগ দিই, আমরা যদি নির্বাচনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে কার্যকর হিসেবে দেখতে চাই অর্থাৎ সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও স্বতঃস্ফূর্ত নির্বাচনের জন্য এটা আমাদের দরকার হবে।
খবরের কাগজ: এবার আওয়ামী লীগবিহীন নির্বাচন হতে যাচ্ছে। রাজনীতির এই নতুন ধারাকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার প্রতি মানুষের আস্থা নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। এর কারণ হলো, ভোট দিতে গেলে সঠিকভাবে ভোট দিতে পারবে কি না, তা নিয়ে তাদের মনে শঙ্কা ছিল। দেশে বহুদিন ধরে সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না বলে অনেকে মনে করে থাকেন। এ ধরনের নানা শঙ্কা তাদের মনে কাজ করেছে। কাজেই তারা মনে করত ভোট দিলে বা না দিলেও এতে কিছু আসে যায় না। ক্ষমতাসীনরা যাদের চায় তারাই নির্বাচিত হয়। এই নির্বাচনি ব্যবস্থাপনার ওপর মানুষের ব্যাপক অনাস্থা তৈরি হয়েছিল। নিরবচ্ছিন্ন এ স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধেই কিন্তু ছাত্রবিপ্লব সংগঠিত হয়েছিল।
আমার কথা, দেশকে এগিয়ে নিতে হলে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ভোটাধিকারসহ সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন জরুরি। নির্বাচনে জনগণ যেন তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটি আমাদের দেখতে হবে। অতীতে আমাদের ত্রুটিগুলো বিবেচনায় নিয়ে সেগুলো দূর করার ব্যাপারে মনোযোগ দিতে হবে। মানুষ যদি সহিংসতামুক্ত হয়, তাহলেই নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে হবে। একই সঙ্গে মানুষ যেন নির্বাচনবিমুখ অবস্থা কাটিয়ে নির্বাচনমুখী অবস্থায় ফিরে যেতে সক্ষম হয় সেটি আমাদের দেখতে হবে। সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের যা করণীয়, আমরা এখনো তা করতে পারিনি। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে অবশ্যই আমাদের গণমানুষের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।
খবরের কাগজ: আগামী ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের চ্যালেঞ্জগুলো কী বলে মনে করেন?
ড. বদিউল আলম মজুমদার: দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন হলেই চলবে না। একই সঙ্গে গণতন্ত্র, জবাবদিহি, স্বচ্ছতা, ভোটাধিকারসহ সব ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে হবে। এ চ্যালেঞ্জগুলোকে মোকাবিলা করেই আমাদের একটি সফল ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠিত করতে হবে। সে ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন অঙ্গনের সচেতন ব্যক্তিদের ভূমিকা রয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা, নির্বাচনে জনগণ যেন তাদের এই গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার থেকে বঞ্চিত না হন, সেটিও আমাদের দেখতে হবে। আমরা একটি গ্রহণযোগ্য এবং জনগণের অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন অনুষ্ঠান দেখতে সক্ষম হবো।
খবরের কাগজ: আপনাকে ধন্যবাদ।
ড. বদিউল আলম মজুমদার: আপনাকেও ধন্যবাদ।