সিলেট নগরীর একজন সাধারণ ব্যবসায়ী মওদুদ আহমেদ। তার জিজ্ঞাসা, ‘সারা সিলেট নগরীর জুড়ে গণভোটে হ্যাঁ এর প্রচারে বিশাল বিশাল পিভিসি ব্যানার, বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। সকল সরকারি, আধা সরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের সামনে বড় বড় পিভিসি ব্যানার করা হয়েছে। এই গণভোট যদি ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচনের অংশ হয়, তাহলে কেন গণভোটে হ্যাঁ এর প্রচারে নির্বাচনি আচরণবিধি মানা হচ্ছে না। আমরা জানি নির্বাচনি আইন ও আচরণবিধি তফসিল ঘোষণার পর থেকে সবাইকে মানতে হয়। এবং নির্বাচনি আচরণবিধিতে বলা হয়েছে অপচনশীল পিভিসি ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। তাহলে আমি নির্বাচন কমিশনের কাছে জানতে চাই, নির্বাচনি তফসিল ঘোষণার পর গণভোটে হ্যাঁ এর প্রচারে আচরণবিধি লঙ্ঘনকারীদের কেন শাস্তি দেওয়া হচ্ছে না।’
গণতান্ত্রিক ছাত্র কাউন্সিল সিলেট নগর শাখার সভাপতি তানজিনা বেগম খবরের কাগজকে বলেন, ‘সিলেটে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট দুটোতেই আচরণবিধি লঙ্ঘন করা হচ্ছে। ভোটের প্রচারণায় আচরণবিধি লঙ্ঘন মূলত অগণতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রকাশ। এখানে ক্ষমতা যার বেশি আচরণবিধি ভাঙার প্রবণতা তত বেশি। এই পরিস্থিতি লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ডের জন্য ক্ষতিকর। গণভোটে সরকারের ভূমিকা বিতর্কিত৷ ভোটের ময়দানে রাষ্ট্র কোনো পক্ষ অবলম্বন করতে পারে না। সরকার যখন সরাসরি হ্যাঁ ভোটের পক্ষে অবস্থান নেয় তখন জনগণের স্বাধীন মত প্রকাশের পরিবেশ নষ্ট হয়৷ আবার জনগণ যদি না ভোট দেয়, তাহলে চূড়ান্ত ফলাফলে সরকার সেটা ম্যানুপুলেট করবে না সেই গ্যারান্টি নাই। ফলে সরকারের ভূমিকা গণভোটের স্বচ্ছতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে৷’
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট। তাই সারা দেশের ন্যায় সিলেটেও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পাশাপাশি গণভোটের প্রচার প্রচারণা শুরু চলছে জোরেশোরে। এই প্রচার প্রচারণায় সংসদ নির্বাচনের প্রার্থীরা যেভাবে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করছেন- সেভাবে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচারণাও লঙ্ঘন করা হচ্ছে আচরণবিধি। সিলেটের প্রায় সব সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচারণা বিশাল বিশাল রঙিন ও পিভিসি ব্যানার, ফেস্টুন, বিলবোর্ড স্থাপন করা হয়েছে। গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে কোনো সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারী ভোট প্রদানের আহ্বান জানাতে পারবেন না মর্মে গত বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেয় নির্বাচন কমিশন। এই ঘোষণার পরও সরকারি, আধাসরকারি, বেসরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘন করে করা হচ্ছে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচারণা।
এদিকে গণভোটের আচরণবিধি লঙ্ঘন ও লঙ্ঘনকারীদের শাস্তি দেওয়ার ব্যাপারে বিভ্রান্তিতে আছে সিলেটের স্থানীয় প্রশাসন। এ বিষয়ে সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট ও সহকারী রিটার্নিং অফিসার পিংকি সাহা খবরের কাগজকে বলেন, ‘হ্যাঁ ভোট তো আচরণবিধিতে পড়ছে না। গণভোটের প্রচারের ক্ষেত্রে তো ব্যানারের সাইজ ঠিক করে দেওয়া হয়নি।’
কিন্তু গণভোটের অধ্যাদেশে বলা হয়েছে নির্বাচনের আচরণবিধিই গণভোটের আচরণবিধি তাহলে গণভোট কেন আচরণবিধিতে পড়বে না- এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘নির্বাচনের আচরণবিধিতো প্রার্থী ও রাজনৈতিক দলের জন্য। কোনো প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল হ্যাঁ ভোটের প্রচারণার জন্য কালার পোস্টার ব্যানার করলে সেটা আমরা দেখব।’
তিনি বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার পক্ষ থেকে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণার জন্য নির্দেশ এসেছিল। সেজন্য প্রার্থী ও রাজনৈতিক দল ছাড়া সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে এ ধরনের ব্যানারে প্রচারণা করা হয়েছিল। সেক্ষেত্রে কিন্তু কালার করা যাবে না বা পিভিসি ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না বলে তখন কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি। সরকার যখন যে রকম নির্দেশনা দিচ্ছে আমরা সেটাই পালন করছি। এখন সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে প্রচার করবে, আবার নির্বাচন কমিশন নির্দেশ দিয়েছে গণভোটে হ্যাঁ এর পক্ষে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরা প্রচার করতে পারবে না। সেজন্য আমরা একটা কনফিউশনের মধ্যে আছি। এটা ক্লিয়ারিফিকেশনের জন্য তো সময় দিতে হবে আমাদের।’
সহকারী রিটার্নিং অফিসার পিংকি সাহা বলেন, ‘গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ও আচরণবিধি লঙ্ঘন হচ্ছে প্রার্থী, রাজনৈতিক দল বা প্রার্থীর সমর্থকদের জন্য। এখন এই আচরণবিধির জন্যতো আমি সরকারি দপ্তরকে জরিমানা করতে পারবো না। এক রকমের সিদ্ধান্ত প্রথমে এসেছিল, এখন ইসি আরেক রকমের সিদ্ধান্ত দিচ্ছে। এখন আপনাকে আপনার মা দিলো একরকম ইন্সট্রাকশন, তিনদিন পরে বাবা বললো না এটা করা যাবে না সেক্ষেত্রে এটার ক্লিয়ারিফিকেশন তো দুজনকে বসিয়ে নিয়ে করতে হবে। যে আমি কি করব আর কি করব না- ওই সময়টুকুতো দিতে হবে।’
নির্বাচনি আচরণবিধি অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কোনো প্রকার পোস্টার ব্যবহার করা যাবে না। অপচনশীল দ্রব্য (যেমন- রেক্সিন, পলিথিন, প্লাস্টিক তথা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর এরূপ কোনো উপাদানে তৈরি কোনো প্রচারপত্র, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন ও ব্যানার ব্যবহার করা যাইবে না। কোনো প্রার্থী কিংবা তার পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনি এলাকায় অবস্থিত কোনো দালান, দেওয়াল, গাছ, বেড়া, বিদ্যুৎ ও টেলিফোনের খুঁটি, সরকারি বা স্থানীয় কর্তৃপক্ষের স্থাপনাসমূহে, এবং বাস, ট্রাক, ট্রেন, স্টিমার, লঞ্চ, রিক্সা, অটোরিকশা, লেগুনা, ট্যাক্সি, বেবিট্যাক্সি বা অন্য কোনো যানবাহনে কোনো প্রকার লিফলেট বা হ্যান্ডবিল, ফেস্টুন সাঁটাইতে পারবেন না। ব্যানার, লিফলেট বা হ্যান্ডবিল ও ফেস্টুনে পলিথিনের আবরণ, এবং প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না।
এছাড়া গণভোটের অধ্যাদেশের ২১ নম্বর পয়েন্ট বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মোতাবেক যেসব কার্য অপরাধ ও নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য, একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর প্রযোজ্য, অপরাধ ও আচরণবিধির লঙ্ঘন বলিয়া গণ্য হইবে এবং এরূপ ক্ষেত্রে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান প্রয়োগ করিয়া এখতিয়ারসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক উক্ত অপরাধের বিচার এবং আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।
গণভোট অধ্যাদেশ ২০২৫-এর ধারা ২১ গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) ১৯৭২-এর ৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, ‘প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত কোনো ব্যক্তি গণভোট বিষয়ে জনগণকে কেবল অবহিত বা সচেতন করতে পারবেন। তবে তিনি কোনোভাবেই ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে ভোট প্রদানের আহ্বান জানাতে পারবেন না। সরকারি কর্মকর্তাদের এ ধরনের কর্মকাণ্ড গণভোটের ফলাফলকে সরাসরি প্রভাবিত করতে পারে। ফলে এটি গণভোট অধ্যাদেশ, ২০২৫-এর ধারা ২১ এবং আরপিও, ১৯৭২-এর অনুচ্ছেদ ৮৬ অনুযায়ী একটি দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
গত বছরের ৫ নভেম্বর জারি করা গণভোট অধ্যাদেশের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, গণভোটে আরপিও এবং আচরণবিধি যতদূর সম্ভব প্রযোজ্য হবে। আচরণবিধির লঙ্ঘন হলে আরপিও অনুযায়ী সাজা হবে। আরপিওর ৮৬ ধারায় বলা হয়েছে, সরকারি কর্মচারীরা নির্বাচনের ফলাফল প্রভাবিত করতে পদমর্যাদার অপব্যবহার করলে ৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড হতে পারে।
অপরদিকে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে ভোট প্রদানের আহ্বান জানানো নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের নির্দেশনা সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। তারা মনে করছেন, নির্বাচনি আইন প্রতিপালনে সকলকে বাধ্য করার কথা সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীদের। কিন্তু সেটা না করে এখন দেখা যাচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা কর্মচারীরাই আইন ভাঙছেন।
এ ব্যাপারে সুশাসনের জন্য নাগরিক সুজনের সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দা শিরিন আক্তার খবরের কাগজকে বলেন, ‘গণভোট যদি নির্বাচনের অংশ ধরা হয় তাহলে এতে হ্যাঁ ভোট দেওয়ার জন্য আপনি কাউকে চাপ প্রয়োগ বা প্রভাবিত করতে পারবেন না। যদি আপনি কাউকে চাপ প্রয়োগ বা প্রভাবিত করেন তার মানে এটা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া হতে পারে না। এবং এটা বুঝতে রকেট সায়েন্স লাগে না। যেকোনো বোধক্ষমতা সম্পন্ন মানুষ এটা বুঝতে পারে। একটি গণ-অভ্যুত্থানের পর ২০২৬ এসেও যদি একটি জাতীয় নির্বাচনে গণতন্ত্র চর্চা না করতে সরকারের পক্ষ থেকে উৎসাহিত করা হয় এটা দুঃখজনক।’
তিনি বলেন, তার ওপর গণভোটে হ্যাঁ এর প্রচারে বিধি লঙ্ঘন করে পিভিসি ব্যানার বিলবোর্ড ব্যবহার করাকেও দায়িত্বশীলরা বলছেন এটা আচরণবিধিতে পড়ছে না। কিন্তু গণভোটের অধ্যাদেশের ২১ নম্বর পয়েন্ট স্পষ্ট বলা হয়েছে ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ, ১৯৭২ ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান মোতাবেক যেসব কার্য অপরাধ ও নির্বাচনি আচরণবিধির লঙ্ঘন হিসাবে গণ্য, একই ধরনের কার্য গণভোটের ক্ষেত্রেও যতদূর প্রযোজ্য, অপরাধ ও আচরণবিধির লঙ্ঘন বলিয়া গণ্য হইবে। তাহলে কেন নির্বাচনি প্রশাসন বলছে- হ্যাঁ ভোটতো আচরণবিধিতে পড়ছে না। মূলত গণভোটে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’-এর পক্ষে ভোট প্রদানের বিষয় নিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও নির্বাচন কমিশনের সাংঘর্ষিক নির্দেশনার কারণে প্রশাসনের চেইন অব কমান্ড বাঁধাগ্রস্ত হচ্ছে। সেজন্য নির্বাচনি আচরণবিধি লঙ্ঘনের ব্যাপারে দায়িত্বশীলরা দায়সারা কাজ করছেন।’
অমিয়/