বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) গঠিত নতুন মন্ত্রিসভায় সড়ক পরিবহন, রেল ও নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান শেখ রবিউল আলম। ঢাকা-১০ আসন থেকে নির্বাচিত এই মন্ত্রী দায়িত্ব নেওয়ার পর গত বৃহস্পতিবার নিজ দপ্তরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে প্রথমবারের মতো গণমাধ্যমের মুখোমুখি হন। সেখানেই সড়ক খাতে চাঁদাবাজি প্রসঙ্গে তার দেওয়া বক্তব্য ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা।
এক প্রশ্নের জবাবে সড়কমন্ত্রী বলেন, সড়কে মালিক ও শ্রমিক সংগঠনের নামে যে অর্থ তোলা হয়, সেটিকে তিনি সরাসরি ‘চাঁদাবাজি’ বলতে রাজি নন। তার ভাষায়, মালিক সমিতি ও শ্রমিক সমিতি নির্দিষ্ট হারে অর্থ সংগ্রহ করে, যা তারা সংশ্লিষ্টদের কল্যাণে ব্যয় করে থাকে।
তিনি বলেন, ‘চাঁদা বলতে আমি সেটাকে বুঝি, যেটা কেউ দিতে চায় না বা দিতে বাধ্য করা হয়। এখানে তারা সমঝোতার ভিত্তিতে টাকা তোলে। কতটুকু কল্যাণে ব্যবহার হয়, তা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে; তবে এটিকে সরাসরি চাঁদাবাজি বলা ঠিক নয়।’
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নানা বক্তব্য দিচ্ছেন তখন তারই মন্ত্রিপরিষদের একজনের চাঁদাবাজি নিয়ে এমন বক্তব্য সাংঘর্ষিক। মন্ত্রীর এই মন্তব্য প্রকাশের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। রাজনৈতিক ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন মহল থেকেও সমালোচনা শুরু হয়। অনেকে মনে করছেন, দীর্ঘদিন ধরে পরিবহন খাতে যে অনিয়ম ও চাঁদাবাজির অভিযোগ রয়েছে, তা কার্যত ‘সমঝোতা’ আখ্যা দিয়ে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
দুর্নীতিবিরোধী সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) মন্ত্রীর বক্তব্যের কড়া সমালোচনা করেছে। সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমে বলেন, সড়কে চাঁদাবাজিকে ‘সমঝোতার লেনদেন’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে একটি ঘোরতর অনৈতিক কর্মকাণ্ডকে বৈধতা দেওয়ার অজুহাত খোঁজা হয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন, চাঁদাবাজিকে যে নামেই ব্যাখ্যা করা হোক না কেন, এটি যদি প্রভাব, ক্ষমতার অপব্যবহার ও দলীয় আধিপত্যের মাধ্যমে আদায় করা হয়, তবে তা দুর্নীতি ও বহুমাত্রিক অবৈধতার শামিল। নতুন সরকারের প্রধানমন্ত্রী যখন দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলছেন, তখন মন্ত্রিসভার একজন সদস্যের এমন বক্তব্য সাংঘর্ষিক বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
এদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সাবেক নেত্রী ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচিত ব্যক্তিত্ব ডা. তাসনিম জারা নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেন, সড়কের চাঁদা আদায়কে ‘সমঝোতা’ বা ‘অলিখিত বিধি’ বলা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়। তার মতে, নির্দিষ্ট রুটে গাড়ি চালাতে গেলে চালকদের নির্দিষ্ট সংগঠনকে অর্থ দিতেই হয়, এটি কোনো স্বতঃস্ফূর্ত সমঝোতা নয়। তিনি বলেন, এই অবৈধ লেনদেনের সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। বাস ভাড়া বৃদ্ধি ও পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত খরচের ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম বাড়ে, যার বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। মন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষমতাসীন দলের আধিপত্যের প্রসঙ্গ উঠে আসায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, তাহলে কি এই অর্থ আদায় প্রক্রিয়া রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার সঙ্গেই যুক্ত–এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরার অনুসন্ধানী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের খানও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। তিনি লেখেন, দেশের বিভিন্ন মহাসড়কে শ্রমিক সংগঠনের নামে দীর্ঘদিন ধরে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে এবং এটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ। তার ভাষ্য অনুযায়ী, পণ্যবোঝাই ট্রাককে গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে একাধিক স্থানে থামিয়ে অর্থ আদায় করা হয়; এই অতিরিক্ত খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হয়। তিনি এ প্রক্রিয়াকে অনৈতিক ও আইনগত ভিত্তিহীন বলে উল্লেখ করেন।
এ প্রসঙ্গে ২০২৪ সালের ৫ মার্চ প্রকাশিত টিআইবির এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশে ব্যক্তিমালিকানাধীন বাস ও মিনিবাস থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ৫৯ কোটি টাকা চাঁদাবাজি আদায় হয়। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এই অর্থের ভাগ পান দলীয় পরিচয়ধারী ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, ট্রাফিক ও হাইওয়ে পুলিশ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষর (বিআরটিএ) কর্মকর্তা-কর্মচারী, মালিক-শ্রমিক সংগঠন এবং স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরা। গবেষণায় আরও দাবি করা হয়, দেশের বড় বাস কোম্পানিগুলোর প্রায় ৯২ শতাংশ পরিচালনায় রাজনীতিবিদদের সম্পৃক্ততা রয়েছে, যার বড় অংশই ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে যুক্ত।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, বিগত বাংলাদেশ পরিবহন খাতের চাঁদা নিয়ন্ত্রণ করেন ক্ষমতাসীন দলের নেতারা। সরকার পরিবর্তনের পর সেই নিয়ন্ত্রণ এখন বিএনপিপন্থি পরিবহন নেতাদের হাতে গেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘মন্ত্রী হওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে মেনেজ হলেন শেখ রবিউল!’ এমন শিরোনাম দিয়ে লাইভে এসে জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজ বলেছেন, পরিবহনে চাঁদাবাজিকে সমঝোতা বলে বৈধতা দেওয়া! উৎসাহিত করা।