দেড় বছরের বেশি সময় বিরতির পর আবারও সচল হয়েছে দেশের আইনসভা। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করেছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ। রাজনৈতিক টানাপোড়েন কাটিয়ে সংসদ অধিবেশনের সাংবিধানিক আনুষ্ঠানিকতা, দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব, রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে সংসদের ভেতরে-বাইরে বিরোধী দলের প্রতিবাদ এবং শেষ পর্যন্ত ওয়াকআউট–সব মিলিয়ে সংসদের প্রথম দিনের অধিবেশন ছিল নাটকীয়তা ও উত্তেজনায় ভরা। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রবর্তনের পর এবারই প্রথম স্পিকারের চেয়ার শূন্য রেখে শুরু হয় নতুন এই সংসদের যাত্রা।
বৃহস্পতিবার (১২ মার্চ) সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের জাতীয় সংসদ ভবনের অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এই সময়ে সরকার ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাকে অভিনন্দন জানান। জাতীয় সংসদের এই অধিবেশনে তারেক রহমান প্রথম সংসদ সদস্য হিসেবে প্রবেশ করেন। এরপর বেলা ১১টা ৫ মিনিটে কোরআন তিলাওয়াতের মধ্য দিয়ে সংসদ অধিবেশনের কার্যক্রম শুরু হয়। উদ্বোধনী অধিবেশনে জ্যেষ্ঠ সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন সভাপতিত্ব করেন। এরপর সূচনা বক্তব্য দেন সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
উদ্বোধনী বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বহু সংগ্রাম, আন্দোলন এবং আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে আবারও একটি জবাবদিহিমূলক গণতান্ত্রিক সংসদের যাত্রা শুরু হলো। তিনি ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে বিভিন্ন গণ-আন্দোলন এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনের শহিদদের স্মরণ করে তাদের আত্মত্যাগের প্রতি শ্রদ্ধা জানান। প্রধানমন্ত্রী জানান, জাতীয় সংসদকে তিনি যুক্তি-তর্ক এবং জাতীয় সমস্যা সমাধানের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করতে চান। দল-মত নির্বিশেষে তিনি দেশের জনগণের প্রতিনিধিত্ব করছেন।
প্রথম বৈঠকেই কণ্ঠভোটে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদকে জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং ব্যারিস্টার কায়সার কামালকে ডেপুটি স্পিকার নির্বাচিত করা হয়। নির্বাচনের পর অধিবেশন স্বল্প সময়ের জন্য মুলতবি করা হয়। এরপর সংসদ ভবনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন তাদের শপথবাক্য পাঠ করান। শপথ গ্রহণের পর নতুন স্পিকারের সভাপতিত্বে অধিবেশনের কার্যক্রম আবার শুরু হয়। সংসদের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য স্পিকার পাঁচ সদস্যের সভাপতিমণ্ডলী ঘোষণা করেন। এতে মির্জা আব্বাস উদ্দিন আহমেদ, গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, ড. আব্দুল মইন খান, মোহাম্মদ মনিরুল হক চৌধুরী এবং এ টি এম আজহারুল ইসলামকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ যেন কোনো ব্যক্তির চরিত্র হননের মঞ্চে পরিণত না হয়। অতীতে অনেক সময় সংসদে জনস্বার্থের আলোচনার চেয়ে ব্যক্তিগত আক্রমণ বেশি হয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমান সংসদ দাঁড়িয়ে আছে ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের আত্মত্যাগের ওপর। সেই আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষা করতে সংসদকে কার্যকর ও মর্যাদাপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে।
বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম জুলাই আন্দোলনের শহিদদের স্মরণ করে বলেন, এই সংসদ সেই আত্মত্যাগের ওপর প্রতিষ্ঠিত। শহিদদের রক্তের সঙ্গে কেউ যাতে বেইমানি না করে–এটাই এখন দেশের মানুষের প্রত্যাশা।
ভিভিআইপি লাউঞ্জের অতিথি
প্রথম অধিবেশনে ভিভিআইপি গ্যালারিতে উপস্থিত ছিলেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন। প্রধানমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ছিলেন তার সহধর্মিণী ডা. জুবাইদা রহমান, জুবাইদার মা সৈয়দা ইকবাল মান্দবানু, কন্যা জাইমা রহমান ও প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর সহধর্মিণী শামিলা রহমান সিঁথি। এ ছাড়া ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে গুলিবিদ্ধ শহিদ গোলাম নাফিজকে রিকশায় করে হাসপাতালে নেওয়া রিকশাচালক নুর মুহাম্মদকেও অতিথি হিসেবে দর্শক গ্যালারিতে উপস্থিত থাকতে দেখা যায়।
শোকপ্রস্তাব ও বিতর্ক
অধিবেশনের প্রথম দিন রেওয়াজ অনুযায়ী শোকপ্রস্তাব উপস্থাপন করা হয়। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, ক্যাথলিক ধর্মগুরু পোপ ফ্রান্সিস, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনিসহ দেশি-বিদেশি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের মৃত্যুতে সংসদে শোক প্রকাশ করা হয়। এ ছাড়া সাবেক রাষ্ট্রপতি এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীসহ বহু সাবেক সংসদ সদস্যের মৃত্যুতে শোকপ্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। আলোচনার পর প্রয়াতদের স্মরণে সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করেন এবং প্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
অধিবেশনে তোলা শোকপ্রস্তাবে যুক্ত করা হয় একাত্তরের যুদ্ধাপরাধে দণ্ডিত জামায়াতে ইসলামীর ছয়জন এবং বিএনপির এক নেতার নাম। শোক তালিকায় মানবতাবিরোধী অপরাধীর নাম যুক্ত করা নিয়ে সংসদে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। কারণ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতনের মতো মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ ‘প্রমাণিত হওয়ায়’ তাদের দণ্ড দিয়েছিলেন ট্রাইব্যুনাল। শেষ পর্যন্ত শোকপ্রস্তাবটি সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়।
১৩৩টি অধ্যাদেশ উপস্থাপন
নতুন সংসদের সামনে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে উত্থাপন করেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনা হচ্ছে ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন নিয়ে। জামায়াত-এনসিপিসহ বিরোধী দলগুলোর দাবি, গণভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদের হুবহু বাস্তবায়ন করতে হবে। বিশেষ করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো, সংসদের উচ্চকক্ষ গঠন এবং সাংবিধানিক নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সরকার ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এদিকে জুলাই সনদের সমঝোতা অনুযায়ী প্রধান বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীকে ডেপুটি স্পিকার পদের প্রস্তাব দিয়েছে বিএনপি। তবে একক কোনো পদ নয়, বরং পুরো ‘প্যাকেজ’ বাস্তবায়নের দাবিতে অনড় বিরোধীরা। সংবিধান অনুযায়ী, সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরুর পর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে এসব অধ্যাদেশ বিল আকারে পাস না হলে সেগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যাবে। ফলে সংসদের আইন প্রণয়ন কার্যক্রমের শুরুতেই এই অধ্যাদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠতে পারে।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে উত্তেজনা
অধিবেশন ঘিরে সংসদের বাইরেও রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা যায়। সকালে জাতীয় সংসদ ভবনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। রাষ্ট্রপতির অভিশংসন, গণভোট অনুযায়ী রাষ্ট্র সংস্কার বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যার বিচার দাবিতে তারা এই কর্মসূচি পালন করে। কর্মসূচি থেকে সংসদ সদস্যদের প্রতি রাষ্ট্রপতির ভাষণের বিরোধিতা করার আহ্বানও জানানো হয়।
বিকেলে অধিবেশনের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন সংসদ কক্ষে প্রবেশ করলে প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সরকারদলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানান। তবে বিরোধী দলের সদস্যরা এ সময় প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুরুর আগেই বিরোধীদলীয় সদস্যরা স্লোগান দিতে শুরু করেন। তারা ‘ফ্যাসিবাদের দালালেরা হুঁশিয়ার’, ‘গেট আউট’সহ নানা স্লোগান দেন। এ সময় স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সংসদ সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির ভাষণ দেওয়া বাধ্যতামূলক এবং সংসদের রেওয়াজ অনুসরণ করা সবার দায়িত্ব।
একপর্যায়ে রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করলে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে বিরোধী দলের সদস্যরা ওয়াকআউট করেন। সংসদ কক্ষে প্রায় ৫ মিনিট বিক্ষোভের পর তারা কক্ষ ত্যাগ করেন।
রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষে বিকেলের দিকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ অধিবেশন আগামী ১৫ মার্চ বেলা ১১টা পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করেন। ওই দিন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় কার্যদিবস শুরু হবে।