ঢাকা ২৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, রোববার, ০৭ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
কর্মবিরতিতে সিলেটের ওসমানী হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎকরা মেয়েকে অশালীন কথা বলার প্রতিবাদ করায় প্রাণ গেল বাবার ইসলামে মায়ের গুরুত্ব ও মর্যাদা সমুদ্রের তলদেশে বিচিত্র এক সুতোয় বাঁধা ইন্টারনেট নেটওয়ার্ক বান্দরবানে অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্তদের মাঝে সহায়তা বিতরণ দক্ষতা বাড়াচ্ছে রাজশাহী কলেজ ক্যারিয়ার ক্লাব ক্যামেরা নষ্ট ছিল স্বপ্ন নয় স্মৃতির মলাটে শহীদ সোহরাওয়ার্দী হল শেষ নিশ্বাস পর্যন্ত পাশে ছিলেন সহপাঠীরা বেরোবির বিশেষ বাসসেবায় উচ্ছ্বসিত শিক্ষার্থীরা সপ্তাহের প্রথম দিনে বৈদেশিক মুদ্রার বিনিময় হার জাতীয় বাজেট নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা রামেকে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি শুরু তীব্র অর্থনৈতিক মন্দায় দেশ, দুর্ভিক্ষের আশঙ্কা জাপা চেয়ারম্যানের হালিশহরে শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, অভিযুক্তকে গণপিটুনি ট্রাকসহ ভেঙে পড়ল বেইলি সেতু, ময়মনসিংহ-ধোবাউড়া সড়ক যোগাযোগ বন্ধ Your Favourite Teacher/Favourite Personality বিষয়ক Writing Paragraph, ৩১তম পর্ব, এইচএসসির ইংরেজি ২য় পত্র পুশইন ঠেকাতে সীমান্তে রাতে বিজিবির সঙ্গে আনসার-ভিডিপির টহল ময়মনসিংহ মেডিকেলে হামে আরও ১ শিশুর মৃত্যু কুমিল্লায় হাম উপসর্গে আরও এক শিশুর মৃত্যু জিপিএসের নির্দেশ মেনে সোজা রেললাইনে গাড়ি, ভাইরাল বৃদ্ধার গাড়িচালনা এসএসসি পাসে চাকরির সুযোগ, নেবে ২৮০ জন কঙ্গোতে ইবোলা প্রাদুর্ভাব: যা জানা জরুরি কোটচাঁদপুরে ট্রেনের বগি লাইনচ্যুত, খুলনার সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ কষ্টকর হবে জীবন, সব জিনিসের দাম বাড়বে বিশ্বের অন্যতম প্রশস্ত সড়ক ‘মনুমেন্টাল অ্যাক্সিস’ বিশ্বকাপ স্কোয়াডের গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তাদের ভিসা দিল না যুক্তরাষ্ট্র, ইরানের ক্ষোভ সন্ধ্যার মধ্যে ৭ অঞ্চলে বজ্রবৃষ্টির আভাস, নদীবন্দরে সতর্কসংকেত হরিপুর সীমান্তে ৩২ ঘণ্টা পরও শূন্যরেখায় ১১ জন রোনালদো গোল না পেলেও জিতল পর্তুগাল
Nagad desktop

হাম রহস্য: স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বেহাল

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২৬, ১১:৫১ এএম
হাম রহস্য: স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বেহাল
ড. শামীম আহমেদ

হামের হঠাৎ প্রাদুর্ভাব নিয়ে সবাই এত চমৎকার লিখেছেন যে, আমি আর লেখার প্রয়োজন বোধ করিনি। তা ছাড়া আমি কিছুটা সময় নিয়ে বুঝতে চাই বলে প্রায়শই দেরি হয়ে যায়। হাম নিয়ে ফেসবুকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য লেখকরা যা লিখেছেন তার অধিকাংশের সঙ্গে আমি একমত। সেগুলোর সঙ্গে সহমত পোষণ করে এবং একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আরও কয়েকটি বিষয় নিয়ে লিখতে চাই।

হাম নিয়ে ড. ইউনূসের অভাবনীয় গাফিলতির বিষয়ে কিছু বলতে গেলে মহাভারত রচনা করতে হবে। ড. ইউনূসের বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষত শিশুদের নিয়ে আগ্রহ না-ই থাকতে পারে, কিন্তু তার নির্বাচিত স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য সচিব প্রমুখ কর্মকর্তারা কী করেছেন আমি জানতে ইচ্ছুক। ড. ইউনূসের সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের চলমান অপারেশন প্ল্যান থেকে সরে আসে এবং নতুন কোনো একটি পরিকল্পনা করার সিদ্ধান্ত নেয়, যে কারণে ২০২৫ সালে হামের টিকা দেওয়ার পরিমাণ ভয়ংকর রকম কম। আমি জানতে ইচ্ছুক হামের মতো একটি ভয়ংকর ব্যাধি যেখানে ৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দিতেই হয়, তা কীভাবে দুই বছর বন্ধ থাকে পরিকল্পনার অভাবে? কে এর জবাব দেবে? 

হামের প্রাদুর্ভাব সারা বাংলাদেশের মধ্যে কক্সবাজারে সর্বাধিক। আপনি নিশ্চয় ভাবছেন যেহেতু দেশের অধিকাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কক্সবাজারে থাকে, তাই সেখানেই হামের প্রাদুর্ভাব বেশি। কিন্তু আপনি জানলে বিস্মিত হবেন যে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বাঙালি জনগোষ্ঠীর তুলনায় খুবই নগণ্য। এখানে খোঁজখবর নিয়ে যেটা জানতে পারলাম, রোহিঙ্গাদের হামের টিকা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সরকারের ভূমিকা এখানে নগণ্য। ফলে সরকার নিয়ন্ত্রিত বাঙালি জনগোষ্ঠী যেভাবে অবহেলার শিকার হয়েছে, রোহিঙ্গারা হয়নি। 

ইউনূস সরকারের যে সিদ্ধান্তটি স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে, তা হলো দীর্ঘদিনের পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশনাল প্ল্যান (OP) বাতিল করা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ২৩টি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের ১৫টি- মোট ৩৮টি অপারেশনাল প্ল্যান হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে আনা হয়েছে একটি অবাস্তব দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প কাঠামো। যারা এ খাতের সঙ্গে যুক্ত, তারা বলছেন, এত অল্প সময়ে এমন প্রকল্প বাস্তবসম্মতভাবে তৈরি করা কার্যত অসম্ভব। 

হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোয় নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু করোনার জন্য এমনিতেও ক্যাম্পেইন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। তার পর ইউনূস সরকার এসে নিয়মিত ক্যাম্পেইন বাতিল করে দেয় যা হামের প্রাদুর্ভাবে বড় ভূমিকা রাখে। 

জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমি একটি বিষয়ে কিঞ্চিত বিস্মিত এবং সেটি বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কেন হাম আক্রান্ত প্রায় ৩৪ শতাংশ শিশু ৯ মাসের কম বয়সী তা একটি রহস্যের বিষয়। কেননা বাংলাদেশে সাধারণ হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয় শিশুর ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় টিকা দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে। উল্লেখ্য, কানাডায় শিশুদের প্রথম টিকা দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় টিকা দেওয়া হয় চার বছর বয়সে যখন তারা স্কুলে যাওয়া শুরু করে। ফলে ৯ মাসের আগে শিশুদের হামের এই প্রাদুর্ভাব খুব একটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এ বিষয়ে আমার গবেষণা যা বলে তা হচ্ছে, বাংলাদেশে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়া- এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। সাধারণত এ বয়সী শিশুরা নিজেরা টিকা নেওয়ার আগেই মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে সুরক্ষা পায়। কিন্তু যখন এ শিশুরাই আক্রান্ত হতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক বা একাধিক দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করছে। 

প্রথমত, মাতৃ-ইমিউনিটির দুর্বলতা একটি বড় কারণ হতে পারে। আগে মায়েরা স্বাভাবিকভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতেন। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে টিকার মাধ্যমে সেই সুরক্ষা তৈরি হয়, যা তুলনামূলকভাবে দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে মায়ের শরীর থেকে শিশুর কাছে যে সুরক্ষা যাওয়ার কথা, তা অনেক সময়ই পর্যাপ্ত থাকে না বা খুব অল্প সময়েই কমে যায়।

দ্বিতীয়ত, টিকাদান কর্মসূচিতে ইউনূস সরকারের অবহেলা এবং কোভিড-পরবর্তী নিয়মিত ক্যাম্পেইন না চালানোর ফলে একটি দুর্বলতা তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশে হাম টিকার প্রথম ডোজ সাধারণত ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয়। তার আগে শিশুর সুরক্ষা পুরোপুরি নির্ভর করে সমাজের সামগ্রিক প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। যখন সেই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ দুর্বল হয়ে পড়ে অর্থাৎ অনেক শিশু টিকা পায় না বা সময়মতো পায় না, তখন ভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়ে এবং অতি ছোট শিশুরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ইউনূস সরকারের ইনফর্মড ব্যর্থতা এ ক্ষেত্রে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই। 

তৃতীয়ত, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব খুব দ্রুত দৃশ্যমান হয়। মাঠপর্যায়ে টিকার সরবরাহ, জনবল, ব্যবস্থাপনা বা নীতিগত সমন্বয়ের অভাব তৈরি হলে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। এ ‘গ্যাপ’ পরে সংক্রমণের ক্লাস্টার তৈরি করে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের উচ্চ জনঘনত্ব এ সংক্রমণকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে। হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি- একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই অনেককে সংক্রমিত করতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায় এবং সহজেই শিশুরা সংক্রমিত হয়ে পড়ে।

পঞ্চমত, অপুষ্টি একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অপুষ্ট মায়েদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, যা শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি রোগের তীব্রতাও বেশি হয়। বাংলাদেশে সরকারি পুষ্টি প্রোগ্রামগুলো ইউনূসের সময় অবহেলিত থেকেছে, এটি মনে রাখা দরকার। 

ষষ্ঠত, সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি সময়মতো ও কার্যকরভাবে পরিচালিত না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্যই হলো যারা টিকার বাইরে থেকে গেছে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু সেগুলো বিলম্বিত বা দুর্বল হলে প্রতিরোধের ঘাটতি থেকেই যায়। ইউনূস সরকারের সিদ্ধান্ত কেন দেশকে এ ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিল, তা এখন পরিষ্কার। 

সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়া একমাত্র সমস্যা নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সূত্রপাত মাত্র। যখন একটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামষ্টিক প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়, তখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণরাই আগে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, এ ক্ষেত্রে তাই হয়েছে শিশুদের, যারা এখনো টিকা নেওয়ার বয়সেই পৌঁছায়নি।

আবারও সমস্যার মূলে ফিরে যাওয়া যাক। ১৯৯৮ সাল থেকে অপারেশনাল প্ল্যানগুলোই ছিল বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মেরুদণ্ড- রোগ প্রতিরোধ, সেবা প্রদান, অবকাঠামো উন্নয়ন- সবকিছুর দিকনির্দেশনা এসেছে এখান থেকেই। ইউনূস সরকার সে ভিত্তিটাই হঠাৎ ভেঙে ফেলার ফলে প্রায় দেড় বছর ধরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কার্যত পঙ্গু হয়ে আছে। 

প্রায় ২৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী চাকরি হারিয়েছেন বা বেতন পাচ্ছেন না। এর মধ্যে আছেন ৩,৮৫৫ জন ফিল্ড ভলান্টিয়ার এবং ১,০৮৬ জন আনসার সদস্য। এমনকি জরুরি স্বাস্থ্যসেবার কিছু কর্মসূচিও বন্ধ হয়ে গেছে- যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি এই বিপর্যয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখব, নাকি আরও বড় বিপর্যয়ের অপেক্ষা করব?

লেখক: অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নতুন উপ-উপাচার্য নিয়োগ

প্রকাশ: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:২৬ এএম
আপডেট: ০৭ জুন ২০২৬, ১০:৩০ এএম
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে দুই নতুন উপ-উপাচার্য নিয়োগ
অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলাম-অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) ও উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) পদে দুই অধ্যাপককে নিয়োগ দিয়েছে সরকার।

শনিবার (৬ জুন) শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সরকারি সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয় শাখা থেকে জারি করা পৃথক প্রজ্ঞাপনে এ তথ্য জানানো হয়।

প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, গণিত বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহম্মদ নজরুল ইসলামকে উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) এবং সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. শামসুল আলমকে উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, রাষ্ট্রপতি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের চ্যান্সেলরের অনুমোদনক্রমে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় আদেশ, ১৯৭৩-এর ধারা ১৩(১) অনুযায়ী তাদের এ নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।

নিয়োগের শর্ত অনুযায়ী, যোগদানের তারিখ থেকে চার বছর অথবা অবসরের তারিখ- যেটি আগে ঘটবে, ততদিন তারা নিজ নিজ পদে বহাল থাকবেন। উপ-উপাচার্য হিসেবে তারা তাদের বর্তমান পদের সমপরিমাণ বেতন-ভাতা পাবেন।

এছাড়া বিধি অনুযায়ী পদসংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুবিধা ভোগ করবেন এবং সার্বক্ষণিক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থান করবেন। তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও সংবিধি দ্বারা নির্ধারিত এবং উপাচার্য দ্বারা অর্পিত ক্ষমতা ও দায়িত্ব পালন করবেন।

প্রজ্ঞাপনে আরও উল্লেখ করা হয়, প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতি ও চ্যান্সেলর যেকোনো সময় এ নিয়োগ বাতিল করতে পারবেন।

আমানউল্লাহ/ আজহার 

চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
চামড়া নিয়ে দুর্ভোগ আর দুর্গতির শেষ কোথায়
রাজেকুজ্জামান রতন

বছরে প্রায় ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে একটা কত বড় সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে দেখছে বাংলাদেশ। পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের বাজার, কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানি এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। দুর্দশা দৃশ্যমান, কিন্তু সমাধানের দায় নেবে কে?

দেশের অন্যতম প্রধান শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে দুর্গতির শেষ কি হবে না? নাকি এটা এক পরিকল্পিত দুর্দশা, যার কবলে পড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের চামড়াশিল্পের সম্ভাবনা? প্রতিবছর ঈদুল আজহা এলে এই প্রশ্ন আর হাহাকার তৈরি হয় দেশের মানুষের মধ্যে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। প্রতিবারের মতো এবারের ঈদুল আজহায় কাঁচা চামড়ার দাম আবারও মারাত্মকভাবে পড়ে গেছে। এর ফলে মৌসুমি ব্যবসায়ী ও চামড়া সংগ্রহকারীরা বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন, যার ফলে দেশের চামড়া খাতের দীর্ঘদিনের সংকট নতুন করে তীব্র আকার ধারণ করেছে। লাভের আশায় চামড়া কিনে অনেক ব্যবসায়ী কোনো ক্রেতা খুঁজে না পেয়ে শেষ পর্যন্ত অবিক্রীত চামড়া রাস্তার পাশে ফেলে দিতে বা মাটিতে পুঁতে ফেলতে বাধ্য হয়েছেন। শুধু এবার নয়, প্রায় এক দশক ধরে সংকটে বন্দি থাকা এই চামড়া খাতের স্থায়ী অব্যবস্থাপনা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ঈদের সংকটে।

এর কারণ কী? দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত কিন্তু সমাধানহীন সমস্যা হলো, সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে একটি সম্পূর্ণ কার্যকর কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার বা সেন্ট্রাল এফ্‌লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট (সিইটিপি) প্রতিষ্ঠা করতে ব্যর্থ হয়েছে বাংলাদেশ। এ কারণে চামড়া খাতটি আন্তর্জাতিক পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা মানদণ্ড পূরণ করতে পারছে না, এ জন্য বৈশ্বিক রপ্তানি বাজারে প্রবেশাধিকার উন্মুক্ত হচ্ছে না। ফলে রপ্তানির সম্ভাবনা এখনো বাস্তবে রূপ নিতে পারছে না।

ধারণা করা হয়, দেশে উৎপাদিত কাঁচা চামড়া থেকে তৈরি চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ বছরে ১২ বিলিয়ন (১ হাজার ২০০ কোটি) ডলার আয় করার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু বর্তমানে তার চামড়াশিল্পের সম্ভাবনার মাত্র শূন্য দশমিক ২৬ শতাংশ কাজে লাগাতে পারছে। সম্ভাবনা এবং বাস্তবতার মধ্যে কত ফারাক! রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য রপ্তানি ছিল ১ দশমিক ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা ১ দশমিক ১৪ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়, অর্থাৎ এক দশকে তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। অথচ একই সময়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৪০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। যদিও পোশাকশিল্পের কাঁচামাল আমদানি করতে হয় আর চামড়াশিল্পের কাঁচামাল দেশেই মজুত এবং নষ্ট হচ্ছে প্রতিদিন। কারণ পরিবেশগত কমপ্লায়েন্স বা নীতিমালার উদ্বেগের কারণে বৈশ্বিক ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চামড়া কেনেন না। কিন্তু অন্যান্য দেশ কী করছে? ১৯৯০-এর দশকের শুরুতে ভিয়েতনামের চামড়া রপ্তানির পরিমাণ বাংলাদেশের কাছাকাছিই ছিল। কিন্তু ২০২৫ সালের মধ্যে ভিয়েতনাম ২৯ বিলিয়ন ডলারের জুতা রপ্তানি করে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জুতা রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়েছে, যা বাংলাদেশের চামড়া খাতের মোট রপ্তানি আয়ের চেয়ে প্রায় ২৫ গুণ বেশি। এটা কি জাদুমন্ত্রে সম্ভব হয়েছে? তা নয়। ভিয়েতনাম তাদের অবকাঠামো তৈরি করেছে, বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করেছে। আর বাংলাদেশ কোনো বর্জ্য শোধনাগার বা স্যুয়ারেজ প্ল্যান্ট ছাড়াই একটি ট্যানারি শিল্পনগরী গড়ে তুলেছে। আমরা আমাদের জাতীয় সম্পদ এই কাঁচা চামড়াকে মাটিতে পুতে, নদীতে ফেলে ধ্বংস করে ফেলেছি।

সরকার-নির্ধারিত দাম এবং বাজারের মধ্যে বিরাট ফারাক। সরকার এ বছর ঢাকার জন্য লবণযুক্ত গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুট ৬২ থেকে ৬৭ টাকা নির্ধারণ করে দিয়েছিল, যা গত বছরের তুলনায় ২ টাকা বেশি। মাঝারি মানের একটি গরুতে সাধারণ ১৮-২০ বর্গফুট ও বড় গরু থেকে ২৪-২৬ বর্গফুট চামড়া পাওয়া যায়। ফলে সরকার-নির্ধারিত সর্বোচ্চ দাম প্রতি বর্গফুট ৬৭ টাকা হিসাবে মাঝারি মানের লবণযুক্ত একটি চামড়ার দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩৫০ টাকা, আর বড় চামড়ার ক্ষেত্রে ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৭০০ টাকা।

বাজারের চিত্র কিন্তু সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঢাকায় আকার ও গুণমানের ওপর ভিত্তি করে এবার বেশির ভাগ কাঁচা চামড়া ৩০০ থেকে ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। দেশের অন্যতম প্রধান চামড়া ব্যবসা কেন্দ্র পোস্তার ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, তারা ৬০০ থেকে ৭০০ টাকার বেশি দাম দিয়ে কোনো চামড়া কেনেননি। অথচ দুই দশক আগে একটি মাঝারি আকারের গরুর চামড়া ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হতো, এখন একই ধরনের চামড়ার দাম ৫০০ টাকারও কম। কিন্তু আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী, বর্তমানে এই দাম ৭ থেকে ৮ হাজার টাকা হওয়া উচিত ছিল।

আড়তদাররা মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সস্তায় চামড়া কিনে তা সংরক্ষণ করার পর ট্যানারিগুলোর কাছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকায় বিক্রি করেন। তার মতে, প্রতি পিস চামড়া সংরক্ষণে খরচ হয় মাত্র ১৫০ থেকে ৩০০ টাকা। ফলে ৪০০ টাকায় কেনা একটি চামড়া যখন ট্যানারিতে পৌঁছায়, তখন সব মিলিয়ে তার ৮০০ টাকা হয়ে যায়।

আড়তদাররা সারা বছর ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় চামড়া বিক্রি করেন। কাঁচা এবং ওয়েট-ব্লু (আংশিক প্রক্রিয়াজাত) চামড়া রপ্তানির ওপর নিষেধাজ্ঞা থাকায় বাজার সীমিত, ফলে ঈদুল আজহার সময় উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ চামড়া ধরে রাখতে পারছেন না। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চামড়া লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করলে তার মূল্য আছে। লবণ ছাড়া চামড়ার গুণ ও মান রক্ষা করা যায় না। ঘোড়ার আগে গাড়ি জুড়ে চামড়া খাতের সংকটকে বাড়িয়ে তোলা হয়েছে। ২০১৭ সালের এপ্রিলে হাজারীবাগের কারখানাগুলোর গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে সরকার ট্যানারি মালিকদের সাভারে স্থানান্তরিত হতে বাধ্য করে। তবে শিল্প-মালিকদের প্রতিনিধিদের দাবি, সাভার শিল্পনগরী পুরোপুরি প্রস্তুত হওয়ার আগেই এই স্থানান্তর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছিল। ফলে অনেক ট্যানারি মালিক আর্থিক সংকট ও ঋণখেলাপির মুখে পড়েছেন। আর পরিবেশ দূষণ বুড়িগঙ্গা নদী থেকে এখন ধলেশ্বরী নদীতে স্থানান্তরিত হয়েছে।

ঈদুল আজহায় প্রতিবছর যে পরিমাণ চামড়া উৎপাদিত হয়, তা ধারণ বা প্রক্রিয়াজাত করার মতো সক্ষমতা আমাদের নেই। চীন, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারত কাঁচা বা লবণযুক্ত এবং ওয়েট-ব্লু চামড়া আমদানি করে। চামড়া রপ্তানি বন্ধে নিজেদের সক্ষমতা বাড়ানো হচ্ছে না, ফলে চোখের সামনে এই মূল্যবান কাঁচামাল পচে যাচ্ছে। অন্যদিকে সাভার চামড়া শিল্পনগরীতে চামড়া সংগ্রহ ও পরিবহনের ক্ষেত্রে ব্যাপক অনিয়ম ও বিশৃঙ্খলা নজরে পড়েছে। নিষেধাজ্ঞা ছিল ঈদের পর সাত দিন রাজধানী অভিমুখে পরিবহনের ক্ষেত্রে। কিন্তু কে মানে সেই নিষেধাজ্ঞা! বিসিক কর্মকর্তা ও ব্যবসায়ীরা স্বীকার করেছেন যে, বিপুল পরিমাণ চামড়া ঈদের পর পরই সাভারে প্রবেশ করেছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) তথ্য অনুযায়ী, ঈদের দিন দুপুর থেকে পরদিন বেলা ১১টার মধ্যে ৪ লাখ ৯১ হাজার ৯৪৯টি কোরবানির পশুর চামড়া এই শিল্পনগরীতে প্রবেশ করেছে, যেখানে গত বছরের একই সময়ে এই সংখ্যা ছিল ৩ লাখ ৫৪ হাজার ৭৫২টি। গত বছর ঈদের প্রথম তিন দিনে শিল্পনগরীতে মোট কোরবানির পশুর চামড়া প্রবেশ করে ৩ লাখ ৭৯ হাজার ৮৭৭ পিস। যেখানে এ বছর ৩০ মে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত শিল্পনগরীতে মোট চামড়া প্রবেশ করেছে ৫ লাখ ২৭ হাজার ৮৭৫ পিস। ফলে এটি ধারণা করলে ভুল হবে না যে, সঠিক সংরক্ষণ বা লবণ দেওয়া ছাড়াই ঢাকার বাইরের একটি বড় অংশের চামড়া সরাসরি শিল্পনগরীতে ঢুকে পড়েছে। এই চামড়ার ভবিষ্যৎ কী?

বছরে প্রায় ২৫ কোটি বর্গফুট চামড়া উৎপাদন হয় বাংলাদেশে। কিন্তু প্রক্রিয়াজাত করতে না পারার কারণে একটা কত বড় সম্ভাবনার মৃত্যু ঘটতে দেখছে বাংলাদেশ। সংরক্ষণের অভাবে চামড়া পচে নষ্ট হয়, কেন্দ্রীয় বর্জ্য শোধনাগার তৈরি না করার কারণে বিশ্ববাজারে প্রবেশ করা যাচ্ছে না, কিন্তু দেশের বাজারে জুতা সস্তায় পাওয়া যায় না। সবাই বলছে, পরিকল্পিত উদ্যোগ নিলে দেশের বাজার, কর্মসংস্থান, বিদেশে রপ্তানি এবং পরিবেশ দূষণ বন্ধ করা সম্ভব। দুর্দশা দৃশ্যমান, কিন্তু সমাধানের দায় নেবে কে? 

লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটি 
বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ)
[email protected]

যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব
ড. এম শামসুল আলম

ন্যূনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। সরকার যে কাজই করুক না কেন, তাতে পরিশেষে জনকল্যাণ নিশ্চিত হতেই হবে। ফলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্য যেকোনো পণ্য কিংবা সেবাই হোক, জনগণ যেন তা ন্যূনতম ব্যয়ে পায়, তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।...

জ্বালানি মানব জীবনের জন্য একটি আবশ্যিক পণ্য। জ্বালানি নিরাপত্তার ঘাটতি, অর্থাৎ যেকোনো মৌলিক চাহিদার ঘাটতি যতটা-না বিপজ্জনক, এর থেকেও জ্বালানিঘাটতি অত্যধিক বিপজ্জনক। তাই এ ঘাটতি সৃষ্টি করা সংবিধানে প্রদত্ত মৌলিক অধিকার খর্ব করার শামিল। সুতরাং, দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জন্য ন্যায্য ও যৌক্তিক মূল্যে জ্বালানিপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। বিগত সরকারের আমলে রাষ্ট্র তার এ দায়িত্ব পালন করতে পারেনি। বর্তমান সরকারের আমলেও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে এবং জ্বালানি নিরাপত্তা আজও ভয়াবহ বিপজ্জনক অবস্থায় রয়েছে। এ পরিস্থিতি উন্নতির কোনো লক্ষণ নেই।

কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী, গ্রাহকরা ৫০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার করলে ইউনিটপ্রতি ৪ টাকা ৬৩ পয়সা থেকে ৬৯ পয়সা বাড়িয়ে ৫ টাকা ৩২ পয়সা, শূন্য থেকে ৭৫ ইউনিট ব‍্যবহারকারীর বিদ্যুতের দাম ৫ টাকা ২৬ পয়সা থেকে ৯২ পয়সা বাড়িয়ে ৬ টাকা ১৮ পয়সা এবং ৭৬ থেকে ২০০ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ৭ টাকা ২০ পয়সা থেকে ১ টাকা ৩০ পয়সা বাড়িয়ে ৮ টাকা ৫০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েছে। নতুন ঘোষণায় পাইকারি বিদ্যুতের দাম ৭ টাকা থেকে ১ টাকা ৩৯ পয়সা বৃদ্ধি করে ৮ টাকা ৩৯ পয়সা নির্ধারণ করেছে বিইআরসি। এ ছাড়া খুচরা পর্যায়ে ৯ টাকা ১১ পয়সা থেকে ১ টাকা ৫২ পয়সা বাড়িয়ে ১০ টাকা ৬৩ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ গ্রাহক পর্যায়ে ইউনিটপ্রতি গড়ে ১ টাকা ৫২ পয়সা বেশি গুনতে হবে।

১৯৯০ সাল থেকে দেশের বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে যেসব সংস্কার তথা রূপান্তর হয়েছে এবং হচ্ছে, সেসবে রাষ্ট্রের নীতি বা আদর্শ না থাকায় এবং পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অর্থবহ না হওয়ায় ‘সবার জন্য লোডশেডিংমুক্ত বিদ্যুৎ’ অবশেষে লোডশেডিং যুক্ত বিদ্যুতে পরিণত হয়েছে। এখানেই সরকার পরিকল্পনা-বিভ্রান্তির শিকার। পরিকল্পনা তৈরির আইনি এখতিয়ার সরকারের। বিগত ৩৩ বছরে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি উপ-খাতসমূহ পরিচালনা ও উন্নয়নে বহু নীতি বা পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে। সেসব পরিকল্পনার কোনোটি মন্ত্রিপরিষদ কর্তৃক অনুমোদিত হয়েছে কি না আমার জানা নেই। এসব পরিকল্পনা মূলত তৈরি করে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ উভয় বিভাগ। বাস্তবায়নও করে স্ব স্ব ক্ষেত্রে তারাই। ফলে পরিকল্পনা স্বার্থসংঘাতযুক্ত। পরিকল্পনা আইনের আওতায় বাস্তবায়িত না হলে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে জবাবদিহির আওতায় আনা যায় না। তাছাড়া পরিকল্পনা প্রণেতা যদি বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ হয়, তাহলে বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ নিয়ন্ত্রণহীন হয় এবং সরকার বিভ্রান্তিতে পড়ে। এভাবেই সরকার বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পরিকল্পনা-বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি দ্রুত সরবরাহ (বিশেষ বিধান) আইন ২০১০-এর আওতায় বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি উন্নয়নে প্রতিযোগিতাবিহীন দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি করা হয়। বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে প্রতিযোগিতা কমিশন আইন ২০১২ কার্যকারিতা হারায়। ফলে বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লা, তরল জ্বালানি ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুৎ উৎপাদন/আমদানি, সঞ্চালন/পরিবহন ও বিতরণে প্রতিযোগিতাবিহীন বিনিয়োগ অব্যাহত আছে। বাজারে প্রতিযোগিতা না থাকলে বাজার প্রকৃতপক্ষে মূল্য নির্ধারণের ক্ষমতা হারায়। বাজার এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়ায় অলিগোপলির শিকার হয়। অর্থাৎ বাজারের ওপর নিয়ন্ত্রক সংস্থা তথা রাষ্ট্রের আর কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকে না। আর যদি মন্ত্রী-এমপিরা ব্যবসায়ী হয়, তাহলে তো আর কোনো কথাই থাকে না। ব্যবসায়ীরা তাদের ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণের সুযোগ নেয় এবং জনগণের ওপর এক ধরনের লুণ্ঠন চালায়। ব্যবসায়ীরা এখন বাজারের ওপর সেই একক কর্তৃত্ব চালাচ্ছে। বাজারকে অলিগোপলি প্রতিষ্ঠিত করে তারা ইচ্ছেমতো মূল্য নির্ধারণ করছে। তেল-লবণ-চাল-আটা-ডালসহ যেকোনো ভোজ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির গতি-প্রকৃতি দেখে বোঝা যায়, কীভাবে তারা তা নিয়ন্ত্রণ করছে। আমদানিকৃত পণ্য বা দেশের অভ্যন্তরীণ পণ্য অথবা সেবা সবই নিয়ন্ত্রণ করছে ব্যবসায়ীরা। আর তারা তাদের ইচ্ছেমাফিক মূল্য বাড়াচ্ছে।

আইন অনুযায়ী সব ধরনের জ্বালানি তেলের মূল্যহার নির্ধারণের একক এখতিয়ার ছিল বিইআরসির, তা সত্ত্বেও বিপিসি নিজেই ফার্নেস অয়েলসহ অন্যান্য তরল জ্বালানি এবং ডিজেল, পেট্রোল ও কেরোসিনের মূল্যহার জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে দিয়ে যখন-তখন ইচ্ছেমাফিক বৃদ্ধি এবং নির্ধারণ করত। আইনানুযায়ী, এই মূল্যহার সরবরাহ ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে হয়। বিনিয়োগ ব্যয় সমন্বয়ে সরবরাহ ব্যয় নির্ধারিত হয়। বিনিয়োগ প্রতিযোগিতাহীন হওয়ায় ন্যায্য ও যৌক্তিক ব্যয় অপেক্ষা সরবরাহ ব্যয় অনেক বেশি হয়। আর এই বেশি ব্যয়ের ওপর ভিত্তি করে বিপিসি নিজে এবং ক্ষেত্র বিশেষে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগকে দিয়ে ইচ্ছেমাফিক মূল্যহার বৃদ্ধি করে। এতে বোঝা যায়, তরল জ্বালানির বাজার কীভাবে সরকারি মালিকানাধীন ব্যবসায়ী বিপিসির কাছে জিম্মি তথা অলিগোপলির শিকার। এই একই কথা বিদ্যুৎ, গ্যাস, কয়লা, এলপিজি, এলএনজি ও নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের ক্ষেত্রে কমবেশি প্রযোজ্য।

বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) আইন ২০০৩-এর আওতায় জ্বালানির মূল্যহার গণশুনানির ভিত্তিতে নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণের একক ক্ষমতা দিয়ে সরকার স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নিয়ন্ত্রক সংস্থা ‘বিইআরসি’ প্রতিষ্ঠিত করে। জ্বালানি সরবরাহে সংশ্লিষ্ট সংস্থা/কোম্পানিগুলোকে বিইআরসির লাইসেন্সি হিসেবে বিইআরসির নিয়ন্ত্রণাধীনে আনা হয়। আবার ২০২৩ সালে ওই আইন সংশোধন করে মূল্যহার গণশুনানি ব্যতীত নির্ধারণের ক্ষমতায় মন্ত্রণালয়কে আনা হয়। আমরা যদি ভোক্তাদের দিক থেকে দেখি–রাষ্ট্র আমার এই অধিকারটুকু নিশ্চিত করবে, আমি যদি বাজার থেকে কোনো পণ্য বা সেবা কিনতে চাই, তাহলে সেই পণ্য বা সেবার মূল্য যেন ন্যায্য ও যৌক্তিক হয়। সেজন্য বাজার প্রতিযোগিতামূলক হতে হবে এবং সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব প্রতিযোগিতা কমিশনের। অথচ এখানে কমিশন নিষ্ক্রিয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বিইআরসির। কিন্তু বিইআরসি সেই প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে একেবারেই নিষ্ক্রিয়। হাইকোর্টের রায়েও বিআরসির নিষ্ক্রিয়তাকে বেআইনি ও কর্তৃত্ববহির্ভূত বলা হয়েছে।

সরকারের দাবি, তারা দেশের বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাতে অনেক উন্নয়ন করেছে। তা আসলে কতটা সঠিক ও গ্রহণযোগ্য–এমন প্রশ্নের জবাব পাওয়া যায়, যখন দেখা যায় প্রতিযোগিতাবিহীন বাজার সৃষ্টি করে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহে লুণ্ঠনমূলক ব্যয় এবং মুনাফা সমন্বয় করে অন্যায় ও অযৌক্তিক মূল্যহার বৃদ্ধি অব্যাহত। আবার প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ সংকটের কারণে সিংহভাগ বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা অব্যবহৃত থাকায় প্রতি একক বিদ্যুতের সরবরাহ ব্যয়বৃদ্ধিতে মূল্যহার বৃদ্ধি ঘটে। যে রূপান্তরের পরিণতিতে জনগণ এমন পরিস্থিতির শিকার হয়, আমার বিবেচনায় তাকে কোনোভাবেই উন্নয়ন, কিংবা সঠিক ও যৌক্তিক রূপান্তর বলা যায় না। বিদ্যুৎ উৎপাদনক্ষমতা ব্যবহার করার মতো প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত হতে হবে। এ জ্বালানি সরবরাহ সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধি করাই হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন। এর পরিবর্তে কেবলমাত্র বিদ্যুতের অভিক্ষিপ্ত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদনক্ষমতা বৃদ্ধিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা অর্জন বলা সম্ভব নয়।

ন্যূনতম ব্যয়ে বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের কর্তব্য। সরকার যে কাজই করুক না কেন, তাতে পরিশেষে জনকল্যাণ নিশ্চিত হতেই হবে। ফলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি বা অন্য যেকোনো পণ্য কিংবা সেবাই হোক, জনগণ যেন তা ন্যূনতম ব্যয়ে পায়, তা নিশ্চিত করা সরকারের মৌলিক দায়িত্ব ও কর্তব্য। বর্তমান বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনায় দেখা যায়, বিদ্যুৎ ও প্রাথমিক জ্বালানি খাত উন্নয়ন ও পরিচালনায় এমন কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে জনসাধারণ অধিক মূল্যহারের শিকার হচ্ছে।

লেখক: জ্বালানি উপদেষ্টা

পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
পাসপোর্ট ও বিদেশযাত্রার প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে
ড. খলিলুর রহমান

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়।...
পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার কোনো রাজনৈতিক অনুগ্রহ নয়; এটি নাগরিকত্বের একটি মৌলিক অধিকার। পাসপোর্ট শুধু বিদেশ ভ্রমণের নথি নয়–এটি একজন নাগরিকের পরিচয়, জাতীয়তা এবং নিজের রাষ্ট্রের প্রতি তার বৈধ সম্পর্কের স্বীকৃতি। যখন কোনো সরকার রাজনৈতিক পরিচয়, সন্দেহ বা প্রশাসনিক পক্ষপাতের ভিত্তিতে এই অধিকার প্রয়োগ করে, তখন তা ন্যায়বিচার, সমতা ও গণতান্ত্রিক শাসনের মূল ভিত্তিকেই দুর্বল করে দেয়।

গত রাতে আমার এক ঘনিষ্ঠ ব্যক্তির ফোন পেলাম, যাকে আমি কয়েক দশক ধরে চিনি। তিনি সততা, নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে চার দশক ধরে দেশসেবা করে আসছেন। তিনি তার কূটনৈতিক পাসপোর্ট জমা দিয়ে নতুন বাংলাদেশি পাসপোর্ট পাওয়ার জটিলতা নিয়ে আমার সহায়তা চাচ্ছিলেন। তার অভিজ্ঞতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি এমন একটি উদ্বেগজনক প্রবণতার প্রতিফলন, যা ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অনির্বাচিত প্রশাসনের সময়ে ব্যাপকভাবে দেখা গিয়েছিল।

বিষয়টির বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে যাওয়ার আগে একটি বাস্তবতা স্বীকার করা জরুরি। দীর্ঘদিন ধরে ধারাবাহিক সরকারগুলো কূটনৈতিক পাসপোর্টের মর্যাদা ও গুরুত্বকে ক্ষুণ্ন করেছে। অনেকে পেশাগতভাবে কূটনৈতিক পাসপোর্ট পাওয়ার যোগ্য ছিলেন না কিংবা পেশাদার কূটনীতিক ছিলেন না, তাদেরও এই সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর ফলে ঐতিহ্যগতভাবে রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কূটনীতিকদের জন্য সংরক্ষিত এই নথির গুরুত্ব ও মর্যাদা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। গত রাতে যিনি আমার সহায়তা চেয়েছিলেন, তিনিও কূটনৈতিক সেবার বাইরে থেকেও কূটনৈতিক পাসপোর্ট পেয়েছিলেন তার রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের জন্য।

তবে কূটনৈতিক পাসপোর্টের অপব্যবহার সংশোধনের নামে কোনো নাগরিককে সাধারণ পাসপোর্ট থেকে বঞ্চিত করা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। যেকোনো বাংলাদেশি নাগরিক, যার বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি দণ্ড বা আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই, তার সমানভাবে পাসপোর্ট পাওয়ার অধিকার রয়েছে। এটি শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়; এটি সাংবিধানিক ও মানবাধিকারসংক্রান্ত প্রশ্ন।

দুঃখজনকভাবে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এমন কিছু চর্চা গড়ে ওঠে, যা দেখে মনে হয়েছে পূর্ববর্তী সরকারে কাজ করেছেন বা একসময় কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন এমন ব্যক্তিদের শাস্তি দেওয়ার মানসিকতা কাজ করেছে। বহু সম্মানিত সরকারি কর্মকর্তা, পেশাজীবী, শিক্ষাবিদ ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে এক ধরনের অলিখিত সন্দেহ ও বঞ্চনার শিকার হতে হয়েছে। আইন ও বিধিমালার ভিত্তিতে আবেদন মূল্যায়নের পরিবর্তে রাজনৈতিক পরিচিতি ও ইচ্ছাকৃত প্রশাসনিক জটিলতা সৃষ্টি করা হয়েছে।

আরও দুঃখজনক হলো, ড. ইউনূস ও তার অনির্বাচিত প্রশাসন সমাজে বিভাজন সৃষ্টির রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েছিল। মানুষকে পাশাপাশি দাঁড়াতে উৎসাহিত করার পরিবর্তে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর প্রবণতা তারা উৎসাহিত করেছে।

আমি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে এসব চর্চার প্রভাব প্রত্যক্ষ করেছি এবং একজন ভুক্তভোগী। শত শত মানুষ পাসপোর্ট পেতে অপ্রয়োজনীয় বিলম্ব, জটিলতা ও অপমানজনক আচরণের শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে ওঠে, যখন সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের সাধারণ পাসপোর্ট প্রক্রিয়ায়ও জাতীয় নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর অস্বাভাবিক সম্পৃক্ততা যোগ করা হয়। এতে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ও রাজনৈতিক নজরদারির সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়ে।

অন্যদিকে, ড. ইউনূস ও তার ঘনিষ্ঠদের আমলে পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রচলিত পুলিশ ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা বাতিল করা হয়, যা একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত হিসেবে সমালোচিত হয়েছিল। যদিও অনেক নাগরিক আমলাতান্ত্রিক হয়রানি কমার কারণে এটিকে স্বাগত জানিয়েছিলেন। তবু ক্রমে অভিযোগ ওঠে যে, অতিরিক্ত শিথিলতা অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি করেছে। এমনো অভিযোগ সামনে আসে যে, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই বাংলাদেশে অবস্থানরত অনাগরিক বা বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের পাসপোর্ট দেওয়া হয়েছে।

কানাডায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা থেকে আমি বলতে পারি দক্ষতা ও জাতীয় নিরাপত্তার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। একটি পাসপোর্ট আন্তর্জাতিকভাবে রাষ্ট্রের সার্বভৌম নিশ্চয়তার প্রতীক। এর বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হলে তার প্রভাব শুধু অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আজ বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি পাসপোর্টধারীদের ভিসা নাকচ হওয়ার ঘটনা এর একটি অন্যতম নিদর্শন। শুধু ভিসা প্রাপ্তিতে প্রতিবন্ধকতা নয়, দুর্বল যাচাই ব্যবস্থা প্রকৃত বাংলাদেশি নাগরিকদের বিদেশযাত্রা কঠিন করে তুলতে পারে এবং রাষ্ট্রকে কূটনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে।

ড. ইউনূসের অপশাসনের সময় আরেকটি উদ্বেগজনক বিষয় ছিল বিমানবন্দরে যাত্রীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও অন্যায় আচরণ। অভিযোগ রয়েছে, বিশেষ করে যারা আগে কূটনৈতিক পাসপোর্ট ধারণ করেছেন বা সরকারি দায়িত্বে ছিলেন, তাদের অনেককে বিভিন্ন সংস্থার কর্মকর্তারা অপ্রয়োজনীয় জিজ্ঞাসাবাদ, বিলম্ব এবং ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি করেছেন। অনেক ক্ষেত্রে বৈধ নিরাপত্তা উদ্বেগ ছাড়াই যাত্রীদের যাত্রা বিলম্বিত বা আটকে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

এর চেয়েও উদ্বেগজনক ছিল গণমাধ্যমের কিছু অংশের ভূমিকা। বিমানবন্দরের এসব ঘটনার পর কিছু যাত্রীকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও চাঞ্চল্যকর সংবাদ পরিবেশনের মাধ্যমে জনসমক্ষে সন্দেহভাজন হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অনেক শিরোনাম ও প্রতিবেদন এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে নিরপেক্ষ তথা উপস্থাপনের চেয়ে ব্যক্তি বিশেষকে হেয় প্রতিপন্ন করার প্রবণতা বেশি ছিল। এটি শুধু পেশাগত নীতির পরিপন্থী নয়; বরং সমাজে ভয় ও বিভাজনের সংস্কৃতি তৈরি করে।

যখন নাগরিকরা নিজেদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকেই ভয় করতে শুরু করে, তখন কোনো জাতি এগোতে পারে না। সরকার জনগণের সেবা করার জন্য–ভয় দেখানোর জন্য নয়। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজ মানুষের মধ্যে আস্থা, ন্যায়বিচার ও বিশ্বাস সৃষ্টি করা; আতঙ্ক ও সন্দেহ নয়। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির সংসদ নির্বাচন বহু নাগরিকের মধ্যে স্বস্তি ও নতুন আশার সঞ্চার করেছে। নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের প্রত্যাবর্তনকে অনেকে ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের বিতর্কিত চর্চাগুলো থেকে বেরিয়ে আসার সুযোগ হিসেবে দেখেছেন। এটি উৎসাহব্যঞ্জক যে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার এসব বিষয়ে কিছু ইতিবাচক পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। সাবেক কূটনৈতিক পাসপোর্টধারীদের প্রতি তুলনামূলক মানবিক ও বাস্তবসম্মত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ এবং বিমানবন্দরে অপ্রয়োজনীয় হয়রানি কমানোর উদ্যোগ প্রশংসার দাবিদার।

বিশেষ করে ব্যক্তিগতভাবে আমি সন্তুষ্ট যে, এই উন্নয়নগুলো বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নেতৃত্বে হচ্ছে, যিনি ঘটনাচক্রে আমারই সিভিল সার্ভিস ব্যাচের কর্মকর্তা ছিলেন এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা ও নাগরিক মর্যাদার গুরুত্ব সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা রাখেন। কার্যকর শাসনের জন্য শুধু ক্ষমতা নয়; প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সংযম ও মানবিকতা।

তবে সংস্কার অর্ধেক পথে থেমে থাকলে চলবে না। বাংলাদেশ এখন এমন একটি আধুনিক, জবাবদিহিমূলক ও অধিকারভিত্তিক পাসপোর্ট ও অভিবাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলার সুযোগ পেয়েছে, যা জাতীয় নিরাপত্তা ও গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করবে। এ ধরনের ব্যবস্থার জন্য কয়েকটি মৌলিক নীতি জরুরি।

প্রথমত, রাজনৈতিক পরিচয়, পেশাগত পটভূমি বা অতীত সরকারি সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে সব নাগরিককে সমানভাবে বিবেচনা করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নিরাপত্তা যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে অনানুষ্ঠানিক রাজনৈতিক বিবেচনার পরিবর্তে সুস্পষ্ট আইনি কাঠামোর মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে।
তৃতীয়ত, বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোকে পেশাদারত্ব ও সংযমের সঙ্গে কাজ করতে হবে, যাতে বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ ছাড়া কোনো যাত্রী হয়রানির শিকার না হন।

চতুর্থত, বাংলাদেশি পাসপোর্টের মর্যাদা ও বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষায় পূর্বের যথাযথ যাচাই ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে অ-নাগরিকরা পাসপোর্ট না পায় বা পাসপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রে অপব্যবহার রোধ করা যায়, আবার প্রকৃত নাগরিকরাও হয়রানির শিকার না হন।
সবশেষে, গণমাধ্যমকে আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বা চরিত্র হননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে।

সম্ভবত ড. ইউনূসের অনির্বাচিত প্রশাসনের সবচেয়ে ক্ষতিকর উত্তরাধিকার ছিল নাগরিকদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি। তাদের সবচেয়ে বড় মেটিকুলাস ডিজাইন ছিল সমাজে মানুষকে সহনাগরিক নয়, প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শেখানো। তবে এটি স্বস্তিদায়ক যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকারের সময় সেই বিভাজনের রাজনীতি ধীরে ধীরে অবসানের দিকে যাচ্ছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক মতপার্থক্য স্বাভাবিক; কিন্তু সন্দেহ, প্রতিশোধ ও সংঘাতনির্ভর শাসনব্যবস্থা জাতীয় ঐক্যকে দুর্বল করে।

বাংলাদেশ ইতোমধ্যে দীর্ঘ রাজনৈতিক মেরূকরণের জন্য বড় মূল্য দিয়েছে। এখন দেশের প্রয়োজন পুনর্মিলন, প্রাতিষ্ঠানিক ন্যায়বিচার এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পুনঃপ্রতিষ্ঠা। নাগরিকদের উচিত জাতি গঠনের কাজে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়ানো, মুখোমুখি সংঘাতে নয়।

যেকোনো সরকারের দায়িত্ব শুধু আইন পরিচালনা নয়; সামাজিক আস্থা ও জাতীয় সংহতি রক্ষা করাও। যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে রাজনৈতিক প্রতিশোধের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন ক্ষতিগ্রস্ত হয় গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা উভয়ই।

এখন জাতির প্রত্যাশা বাংলাদেশ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক, মানবিক ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির দিকে এগিয়ে যাবে; যেখানে নাগরিক অধিকার সম্মানিত হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান নিরপেক্ষ থাকবে এবং প্রশাসন দলীয় স্বার্থের পরিবর্তে জাতীয় স্বার্থে কাজ করবে।

পরিশেষে, পাসপোর্ট কখনোই রাজনৈতিক অস্ত্র হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত সেই প্রতীক, যা প্রতিটি বাংলাদেশির নাগরিকত্ব, মর্যাদা ও সমঅধিকারের প্রতিনিধিত্ব করে।

লেখক: সাবেক রাষ্ট্রদূত ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব

মেধাবীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ১২:৫৬ পিএম
মেধাবীদের বিদেশে উচ্চশিক্ষার প্রবণতা কী বার্তা দিচ্ছে

যোগ্যতার মূল্য আছে, গবেষণার সম্মান আছে, চাকরির নিরাপত্তা আছে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। যে রাষ্ট্র তার মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাগুলোকে হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনীতির নয়, সম্ভাবনার।...

বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে আজকাল একটি নতুন দৃশ্য খুবই পরিচিত। একসময় যেখানে শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন ছিল বিসিএস ক্যাডার হওয়া, ব্যাংকার হওয়া কিংবা দেশের কোনো বড় প্রতিষ্ঠানে চাকরি পাওয়া, সেখানে এখন অনেকের প্রধান লক্ষ্য বিদেশে উচ্চশিক্ষা। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে প্রায় প্রতিদিনই আমি রিকমেন্ডেশন লেটার লিখি। কেউ যুক্তরাষ্ট্রে আবেদন করছে, কেউ কানাডায়, কেউ অস্ট্রেলিয়া, জার্মানি, জাপান বা ইউরোপের বিভিন্ন দেশে। শিক্ষার্থীদের আলোচনায় এখন গবেষণা প্রস্তাবনা, স্কলারশিপ, আইইএলটিএস, জিআরই, পাবলিকেশন এবং অধ্যাপকদের ই-মেইল যোগাযোগের বিষয়গুলোই বেশি স্থান পায়।

এটি একদিকে আশাব্যঞ্জক। কারণ বাংলাদেশের তরুণরা এখন বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার মতো সক্ষমতা অর্জন করছে। একই সঙ্গে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে নিয়ে আসে– এই মেধাবী তরুণদের বড় অংশ যদি স্থায়ীভাবে বিদেশে থেকে যায়, তাহলে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কী হবে?

একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো ওই রাষ্ট্রের দক্ষ ও সৃজনশীল মানবসম্পদ। সেই মানবসম্পদের সবচেয়ে যোগ্য অংশ যখন দেশ ছাড়ার পরিকল্পনা করে, তখন বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি জাতীয় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।অনেকে মনে করেন বিদেশে যাওয়ার মূল কারণ উন্নত শিক্ষা। বাস্তবে বিষয়টি আরও জটিল। বাংলাদেশের অসংখ্য মেধাবী শিক্ষার্থী মনে করে যে তাদের ভবিষ্যৎ এখানে যথেষ্ট নিরাপদ নয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভালো ফলাফল করেও চাকরি পাওয়ার নিশ্চয়তা নেই। অনেক ক্ষেত্রে নিয়োগপ্রক্রিয়া দীর্ঘ, অনিশ্চিত এবং প্রতিযোগিতামূলক। দক্ষতা ও যোগ্যতার পাশাপাশি নানা অদৃশ্য বাস্তবতাও কাজ করে বলে সাধারণ মানুষের মধ্যে একটি ধারণা তৈরি হয়েছে।

সরকারি চাকরির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, ওএসডি সংস্কৃতি কিংবা পদোন্নতির অনিশ্চয়তা অনেকের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করে। বেসরকারি খাতেও উচ্চশিক্ষিত গবেষক বা বিশেষজ্ঞদের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ এখনো সীমিত। ফলে একজন শিক্ষার্থী যখন দেখে যে, বিদেশে তার দক্ষতার মূল্য অনেক বেশি, তখন সে স্বাভাবিকভাবেই সেই পথ বেছে নিতে চায়।

আরও একটি বড় কারণ হলো গবেষণার পরিবেশ। বাংলাদেশের অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিভাবান শিক্ষক ও শিক্ষার্থী থাকলেও গবেষণা তহবিল, আধুনিক ল্যাবরেটরি, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার সহায়তা এবং গবেষণাভিত্তিক ক্যারিয়ার কাঠামো এখনো পর্যাপ্ত নয়। অন্যদিকে, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পূর্ণ স্কলারশিপ, গবেষণা অনুদান, স্বাস্থ্যসেবা এবং উচ্চমানের গবেষণা সুবিধা প্রদান করছে। ফলে সিদ্ধান্তটি অনেক সময় আবেগের নয়, বাস্তবতার হয়ে ওঠে।

আজকের উন্নত দেশগুলোও একসময় মেধা পাচারের সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। ১৯৭০ ও ’৮০-এর দশকে ভারত থেকে বিপুলসংখ্যক প্রকৌশলী, বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপে চলে যান। একসময় একে ভারতের জন্য বড় ক্ষতি মনে করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে ভারত তথ্যপ্রযুক্তি খাত, গবেষণা অবকাঠামো এবং উদ্যোক্তা পরিবেশ উন্নত করে। ফলে বিদেশে থাকা ভারতীয় মেধাবীদের একটি অংশ দেশে বিনিয়োগ শুরু করে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলে এবং জ্ঞান স্থানান্তরে ভূমিকা রাখে।

চীন আরও দূরদর্শী নীতি গ্রহণ করে। বিদেশে পিএইচডি সম্পন্ন করা গবেষকদের দেশে ফিরিয়ে আনতে তারা বিশেষ গবেষণা অনুদান, উচ্চ বেতন, আবাসন সুবিধা এবং স্বাধীন গবেষণার সুযোগ দেয়। এর ফলে হাজার হাজার বিজ্ঞানী দেশে ফিরেন আসেন এবং চীনের প্রযুক্তিগত উত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুরও একই ধরনের নীতি অনুসরণ করেছে। তারা বুঝেছিল, মেধাবীদের বিদেশযাত্রা থামানো সম্ভব নয়; কিন্তু দেশে ফিরে আসার জন্য আকর্ষণীয় পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।

এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি কী? বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো ‘সিলেকটিভ ব্রেইন ড্রেইন’। অর্থাৎ সবার আগে দেশ ছাড়ছে সবচেয়ে মেধাবী, গবেষণামুখী এবং আন্তর্জাতিক মানের দক্ষতাসম্পন্ন তরুণরা। যখন একজন অসাধারণ গবেষক, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞ, প্রকৌশলী, চিকিৎসক বা নীতিনির্ধারণী দক্ষতাসম্পন্ন ব্যক্তি বিদেশে স্থায়ীভাবে থেকে যান, তখন দেশ কেবল একজন নাগরিককে হারায় না; বরং ভবিষ্যতের একটি সম্ভাবনাকেও হারায়।

একজন বিজ্ঞানী হয়তো একটি নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন করতে পারতেন। একজন অর্থনীতিবিদ হয়তো নতুন নীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখতে পারতেন। একজন শিক্ষক হয়তো শত শত শিক্ষার্থীকে অনুপ্রাণিত করতে পারতেন। তাদের অনুপস্থিতি সরাসরি দৃশ্যমান না হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীর।
তাহলে এই মুহূর্তে বাংলাদেশের সরকারের কী করা উচিত? এর উত্তর যদি সাজাতে চাই তাহলে এভাবে দেখা যেতে পারে– প্রথমত, মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র গঠন করতে হবে। এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে যেখানে একজন তরুণ বিশ্বাস করবে যে তার পরিশ্রম ও যোগ্যতার যথাযথ মূল্যায়ন হবে। দ্বিতীয়ত, গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বাংলাদেশের জিডিপির তুলনায় গবেষণায় ব্যয় এখনো অত্যন্ত কম। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে গবেষণা অনুদান, আধুনিক গবেষণাগার এবং আন্তর্জাতিক অংশীদারত্বের সুযোগ দিতে হবে। তৃতীয়ত, বিদেশফেরত মেধাবীদের জন্য বিশেষ কর্মসূচি চালু করা যেতে পারে। দেশে ফিরে আসা গবেষক ও বিশেষজ্ঞদের জন্য দ্রুত নিয়োগ, গবেষণা তহবিল এবং কর সুবিধা দেওয়া যেতে পারে। চতুর্থত, বিশ্ববিদ্যালয় ও শিল্প খাতের মধ্যে শক্তিশালী সংযোগ তৈরি করতে হবে। যাতে একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারে যে গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে দেশেও সফল ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব। পঞ্চমত, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে হবে। চাকরির নিরাপত্তা এবং পেশাগত স্বাধীনতা মানুষের সিদ্ধান্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

বিদেশে যাওয়া কোনো অপরাধ নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এটি প্রয়োজনীয়। জ্ঞান অর্জনের জন্য পৃথিবীকে জানার বিকল্প নেই। তবে প্রশ্ন হলো, বিদেশে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতা কি দেশের কল্যাণে ব্যবহার করা হচ্ছে? সবাই দেশে ফিরে আসবে– এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। কিন্তু বিদেশে থেকেও দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে গবেষণা করা, শিক্ষার্থীদের পরামর্শ দেওয়া, প্রযুক্তি বিনিয়োগ করা কিংবা নতুন উদ্যোক্তা তৈরিতে সহায়তা করা সম্ভব।
বাংলাদেশ আজ একটি সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। আমাদের তরুণরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মেধাবী, বেশি আত্মবিশ্বাসী এবং বেশি বৈশ্বিক। এটি আমাদের শক্তি। কিন্তু সেই শক্তি যদি ক্রমাগত দেশের বাইরে স্থায়ীভাবে চলে যায়, তাহলে উন্নয়নের গতি একসময় বাধাগ্রস্ত হবে।
মেধা পাচার রোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায় সীমান্ত বন্ধ করা নয়, বরং সুযোগ সৃষ্টি করা। তরুণদের এমন একটি বাংলাদেশ উপহার দিতে হবে যেখানে তারা অনুভব করবে– যোগ্যতার মূল্য আছে, গবেষণার সম্মান আছে, চাকরির নিরাপত্তা আছে এবং স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ আছে। যে রাষ্ট্র তার মেধাবীদের ধরে রাখতে পারে, সে রাষ্ট্র ভবিষ্যৎকে ধরে রাখতে পারে। আর যে রাষ্ট্র তার সেরা মেধাগুলোকে হারায়, সে রাষ্ট্র একসময় বুঝতে পারে, সবচেয়ে বড় ক্ষতি অর্থনীতির নয়, সম্ভাবনার।

লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]