হামের হঠাৎ প্রাদুর্ভাব নিয়ে সবাই এত চমৎকার লিখেছেন যে, আমি আর লেখার প্রয়োজন বোধ করিনি। তা ছাড়া আমি কিছুটা সময় নিয়ে বুঝতে চাই বলে প্রায়শই দেরি হয়ে যায়। হাম নিয়ে ফেসবুকে মোটামুটি গ্রহণযোগ্য লেখকরা যা লিখেছেন তার অধিকাংশের সঙ্গে আমি একমত। সেগুলোর সঙ্গে সহমত পোষণ করে এবং একটু ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আরও কয়েকটি বিষয় নিয়ে লিখতে চাই।
হাম নিয়ে ড. ইউনূসের অভাবনীয় গাফিলতির বিষয়ে কিছু বলতে গেলে মহাভারত রচনা করতে হবে। ড. ইউনূসের বাংলাদেশের মানুষ, বিশেষত শিশুদের নিয়ে আগ্রহ না-ই থাকতে পারে, কিন্তু তার নির্বাচিত স্বাস্থ্য উপদেষ্টা, স্বাস্থ্য সচিব প্রমুখ কর্মকর্তারা কী করেছেন আমি জানতে ইচ্ছুক। ড. ইউনূসের সরকার আওয়ামী লীগ সরকারের চলমান অপারেশন প্ল্যান থেকে সরে আসে এবং নতুন কোনো একটি পরিকল্পনা করার সিদ্ধান্ত নেয়, যে কারণে ২০২৫ সালে হামের টিকা দেওয়ার পরিমাণ ভয়ংকর রকম কম। আমি জানতে ইচ্ছুক হামের মতো একটি ভয়ংকর ব্যাধি যেখানে ৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকা দিতেই হয়, তা কীভাবে দুই বছর বন্ধ থাকে পরিকল্পনার অভাবে? কে এর জবাব দেবে?
হামের প্রাদুর্ভাব সারা বাংলাদেশের মধ্যে কক্সবাজারে সর্বাধিক। আপনি নিশ্চয় ভাবছেন যেহেতু দেশের অধিকাংশ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী কক্সবাজারে থাকে, তাই সেখানেই হামের প্রাদুর্ভাব বেশি। কিন্তু আপনি জানলে বিস্মিত হবেন যে, কক্সবাজারের রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীদের মধ্যে হামের প্রাদুর্ভাব বাঙালি জনগোষ্ঠীর তুলনায় খুবই নগণ্য। এখানে খোঁজখবর নিয়ে যেটা জানতে পারলাম, রোহিঙ্গাদের হামের টিকা দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা। সরকারের ভূমিকা এখানে নগণ্য। ফলে সরকার নিয়ন্ত্রিত বাঙালি জনগোষ্ঠী যেভাবে অবহেলার শিকার হয়েছে, রোহিঙ্গারা হয়নি।
ইউনূস সরকারের যে সিদ্ধান্তটি স্বাস্থ্য খাতকে সবচেয়ে বড় ধাক্কা দিয়েছে, তা হলো দীর্ঘদিনের পাঁচ বছর মেয়াদি অপারেশনাল প্ল্যান (OP) বাতিল করা। স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের ২৩টি এবং স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবারকল্যাণ বিভাগের ১৫টি- মোট ৩৮টি অপারেশনাল প্ল্যান হঠাৎ করেই বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তার পরিবর্তে আনা হয়েছে একটি অবাস্তব দুই বছর মেয়াদি প্রকল্প কাঠামো। যারা এ খাতের সঙ্গে যুক্ত, তারা বলছেন, এত অল্প সময়ে এমন প্রকল্প বাস্তবসম্মতভাবে তৈরি করা কার্যত অসম্ভব।
হামের প্রাদুর্ভাব ঠেকানোয় নিয়মিত টিকাদানের পাশাপাশি ন্যাশনাল ক্যাম্পেইন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু করোনার জন্য এমনিতেও ক্যাম্পেইন করা কঠিন হয়ে যাচ্ছিল। তার পর ইউনূস সরকার এসে নিয়মিত ক্যাম্পেইন বাতিল করে দেয় যা হামের প্রাদুর্ভাবে বড় ভূমিকা রাখে।
জনস্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে আমি একটি বিষয়ে কিঞ্চিত বিস্মিত এবং সেটি বোঝার চেষ্টা করে যাচ্ছি। কেন হাম আক্রান্ত প্রায় ৩৪ শতাংশ শিশু ৯ মাসের কম বয়সী তা একটি রহস্যের বিষয়। কেননা বাংলাদেশে সাধারণ হামের প্রথম টিকা দেওয়া হয় শিশুর ৯ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় টিকা দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে। উল্লেখ্য, কানাডায় শিশুদের প্রথম টিকা দেওয়া হয় ১৫ মাস বয়সে এবং দ্বিতীয় টিকা দেওয়া হয় চার বছর বয়সে যখন তারা স্কুলে যাওয়া শুরু করে। ফলে ৯ মাসের আগে শিশুদের হামের এই প্রাদুর্ভাব খুব একটা স্বাভাবিক ঘটনা নয়। এ বিষয়ে আমার গবেষণা যা বলে তা হচ্ছে, বাংলাদেশে ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়া- এটা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি বড় জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়। সাধারণত এ বয়সী শিশুরা নিজেরা টিকা নেওয়ার আগেই মায়ের শরীর থেকে পাওয়া অ্যান্টিবডির মাধ্যমে সুরক্ষা পায়। কিন্তু যখন এ শিশুরাই আক্রান্ত হতে শুরু করে, তখন বুঝতে হবে সমস্যাটা পুরো স্বাস্থ্যব্যবস্থার এক বা একাধিক দুর্বলতাকে ইঙ্গিত করছে।
প্রথমত, মাতৃ-ইমিউনিটির দুর্বলতা একটি বড় কারণ হতে পারে। আগে মায়েরা স্বাভাবিকভাবে হাম আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ ক্ষমতা অর্জন করতেন। এখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে টিকার মাধ্যমে সেই সুরক্ষা তৈরি হয়, যা তুলনামূলকভাবে দ্রুত কমে যেতে পারে। ফলে মায়ের শরীর থেকে শিশুর কাছে যে সুরক্ষা যাওয়ার কথা, তা অনেক সময়ই পর্যাপ্ত থাকে না বা খুব অল্প সময়েই কমে যায়।
দ্বিতীয়ত, টিকাদান কর্মসূচিতে ইউনূস সরকারের অবহেলা এবং কোভিড-পরবর্তী নিয়মিত ক্যাম্পেইন না চালানোর ফলে একটি দুর্বলতা তৈরি হওয়া পরিস্থিতিকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে। বাংলাদেশে হাম টিকার প্রথম ডোজ সাধারণত ৯ মাস বয়সে দেওয়া হয়। তার আগে শিশুর সুরক্ষা পুরোপুরি নির্ভর করে সমাজের সামগ্রিক প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর। যখন সেই ‘হার্ড ইমিউনিটি’ দুর্বল হয়ে পড়ে অর্থাৎ অনেক শিশু টিকা পায় না বা সময়মতো পায় না, তখন ভাইরাস সহজেই ছড়িয়ে পড়ে এবং অতি ছোট শিশুরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। ইউনূস সরকারের ইনফর্মড ব্যর্থতা এ ক্ষেত্রে অগ্রাহ্য করার কোনো সুযোগ নেই।
তৃতীয়ত, নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রমে বিঘ্ন ঘটলে তার প্রভাব খুব দ্রুত দৃশ্যমান হয়। মাঠপর্যায়ে টিকার সরবরাহ, জনবল, ব্যবস্থাপনা বা নীতিগত সমন্বয়ের অভাব তৈরি হলে অনেক শিশু টিকার বাইরে থেকে যায়। এ ‘গ্যাপ’ পরে সংক্রমণের ক্লাস্টার তৈরি করে।
চতুর্থত, বাংলাদেশের উচ্চ জনঘনত্ব এ সংক্রমণকে আরও দ্রুত ছড়িয়ে দিয়ে থাকতে পারে। হাম বিশ্বের সবচেয়ে সংক্রামক রোগগুলোর একটি- একজন আক্রান্ত ব্যক্তি সহজেই অনেককে সংক্রমিত করতে পারে। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ঝুঁকি বহু গুণ বেড়ে যায় এবং সহজেই শিশুরা সংক্রমিত হয়ে পড়ে।
পঞ্চমত, অপুষ্টি একটি নীরব কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অপুষ্ট মায়েদের শরীরে প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে, যা শিশুর ওপরও প্রভাব ফেলে। ফলে সংক্রমণের ঝুঁকি যেমন বাড়ে, তেমনি রোগের তীব্রতাও বেশি হয়। বাংলাদেশে সরকারি পুষ্টি প্রোগ্রামগুলো ইউনূসের সময় অবহেলিত থেকেছে, এটি মনে রাখা দরকার।
ষষ্ঠত, সম্পূরক টিকাদান কর্মসূচি সময়মতো ও কার্যকরভাবে পরিচালিত না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়। এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্যই হলো যারা টিকার বাইরে থেকে গেছে তাদের অন্তর্ভুক্ত করা। কিন্তু সেগুলো বিলম্বিত বা দুর্বল হলে প্রতিরোধের ঘাটতি থেকেই যায়। ইউনূস সরকারের সিদ্ধান্ত কেন দেশকে এ ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দিল, তা এখন পরিষ্কার।
সব মিলিয়ে একটি বিষয় স্পষ্ট, ৯ মাসের কম বয়সী শিশুদের মধ্যে হাম ছড়িয়ে পড়া একমাত্র সমস্যা নয়, এটি একটি জনস্বাস্থ্য বিপর্যয়ের সূত্রপাত মাত্র। যখন একটি দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সামষ্টিক প্রতিরোধ ক্ষমতা নষ্ট হয়, তখন সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণরাই আগে আঘাতপ্রাপ্ত হয়, এ ক্ষেত্রে তাই হয়েছে শিশুদের, যারা এখনো টিকা নেওয়ার বয়সেই পৌঁছায়নি।
আবারও সমস্যার মূলে ফিরে যাওয়া যাক। ১৯৯৮ সাল থেকে অপারেশনাল প্ল্যানগুলোই ছিল বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের মেরুদণ্ড- রোগ প্রতিরোধ, সেবা প্রদান, অবকাঠামো উন্নয়ন- সবকিছুর দিকনির্দেশনা এসেছে এখান থেকেই। ইউনূস সরকার সে ভিত্তিটাই হঠাৎ ভেঙে ফেলার ফলে প্রায় দেড় বছর ধরে স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা কার্যত পঙ্গু হয়ে আছে।
প্রায় ২৫ হাজার স্বাস্থ্যকর্মী চাকরি হারিয়েছেন বা বেতন পাচ্ছেন না। এর মধ্যে আছেন ৩,৮৫৫ জন ফিল্ড ভলান্টিয়ার এবং ১,০৮৬ জন আনসার সদস্য। এমনকি জরুরি স্বাস্থ্যসেবার কিছু কর্মসূচিও বন্ধ হয়ে গেছে- যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি এই বিপর্যয়কে গুরুত্ব দিয়ে দেখব, নাকি আরও বড় বিপর্যয়ের অপেক্ষা করব?
লেখক: অধ্যাপক ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ

