বিশ্বায়নের এ যুগে রাজনীতিবিদদের ভুলে গেলে চলবে না যে, একটি রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, প্রতিটি রাষ্ট্রই বিভিন্ন কারণে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা প্রথম’ স্লোগানের মধ্যে যে লোকপ্রিয়তাবাদী জাতীয় ঔদ্ধত্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুঃখজনক পরিণতি বহন করে।...

Hubris, এই ইংরেজি শব্দটি অধুনা প্রায়ই পশ্চিমা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে একাডেমিক গুণীজনরা ব্যবহার করে থাকেন। অভিধানে Hubris-এর বাংলা অর্থ হলো- ঔদ্ধত্য, দাম্ভিকতা, অযথা গর্ব কিংবা অত্যাধিক অহংকার। ঔদ্ধত্যের মূল উৎস ক্ষমতা। এ ক্ষমতার বলে ঔদ্ধত্যের সৃষ্টি হয়ে থাকে তিনটি কারণে: সামাজিক পদমর্যাদা, আর্থিক প্রতিপত্তি কিংবা পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞান। এ তিনটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অদ্বিতীয়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো রাষ্ট্র এ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। যুদ্ধ শেষে পৃথিবী যখন অর্থনৈতিক ধ্বংসের মুখোমুখী, যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্বের ৪০-৫০ শতাংশ উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির উৎপাদনকারী। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবলমাত্র অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে ছিল তা নয়, তার প্রকৃত চারণভূমি ছিল মেধার চর্চা। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ কোনো রাষ্ট্রই দাঁড়াতে পারেনি। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ৫০ বছর পর হলেও চন্দ্র পরিভ্রমণে পুনরায় নভোচারী পাঠানোর Artemis-II-এর অভিযান মানবজাতির প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অসাধারণ মেধার পরিচয় বহন করে। ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা রয়েছে Artemis-III মহাকাশযান চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করানোর। বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা এবং তার জন্য নিরলস পরিশ্রম করার অভিপ্রায় আর দ্বিতীয় কোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এত প্রবলভাবে দেখা যায় না। কিন্তু আমাদের সংকটের মুখোমুখী হতে হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে। এ মিথষ্ক্রিয়ায় পরাশক্তির মানসিক পটভূমিতে যে বৈশিষ্ট্য গেঁথে বসে তা হলো ধারণাতীত ঔদ্ধত্য।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহর দুটিতে আনবিক বোমা নিক্ষেপ করেছিল, ফলে প্রায় ২ লাখ বেসামরিক লোকের মৃত্যু ঘটে। অথচ এ বোমা দুটি জাপানের ওপর নিক্ষেপের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় তখন শেষের পথে এবং যুদ্ধের সব ফ্রন্টেই জাপানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাভূত। মানুষের কল্যাণের জন্য যে আনবিক শক্তি উপৎপাদনের সমীকরণটি আলবার্ট আইনস্টাইন আবিষ্কার করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমেন সে উদ্ভাবনকেই ঔদ্ধত্যে রূপান্তরিত করলেন সভ্যতা ধ্বংসের মাধ্যমে।
দুঃখের বিষয় হলো কেবলমাত্র ঔদ্ধত্যের বশবর্তী হয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৩ বছর ভিয়েতনামে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় হলো। এ যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি সামরিক এবং বেসামরিক লোকের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে মার্কিনি এবং মিত্রপক্ষের সদস্য সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। সোভিয়েত ইউনিয়নপুষ্ট কমিউনিস্ট সরকারের পতন তো ঘটলই না বরং বর্তমানে চীনের পর ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক পার্টনার।
এখানে উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ ১৯৪৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়েছিল, তার মূল মতাদর্শিক কারণ ছিল কমিউনিজম (সাম্যবাদ) এবং ক্যাপিটালিজমের (পুঁজিবাদ) মধ্যে তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। এ দুটি বৃহৎ শক্তির মানসিক দ্বন্দ্বের খেসারত দিতে হয়েছে ভিয়েতনাম, কোরিয়া, পূর্ব এবং পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার বহু ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে। ইতিহাসের নির্মম পরিণতি হলো সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমের পতন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যদিয়ে হয়নি, হয়েছিল অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক রক্তক্ষরণের কারণে।
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আশা করা হয়েছিল যে, কেবলমাত্র একটি পরাশক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বে শান্তির সূচনা হবে। কিন্তু তা সম্ভব হলো না, যদিওবা জ্যেষ্ঠ বুশ, ক্লিনটন এবং ওবামার প্রশাসনের সময় কিছুটা হলেও সে প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। কমিউনিজমের পর পরই যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন পড়ল আর এক শত্রুর। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা খুঁজে পেলেন ইসলামভীতির (Islamophobia) মধ্যে সেই কাল্পনিক শত্রু। মধ্যপ্রাচ্য পরিণত হলো ইসলামভীতির সেই লক্ষ্যভূমিতে। ইরাক, লিবিয়া এবং সিরিয়াকে সন্ত্রাসের লীলাভূমি আখ্যায়িত করে ধ্বংস করা হলো। এ রাষ্ট্রগুলোকে ধ্বংস করার পেছনে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যাটোর পশ্চিমা বন্ধু রাষ্ট্রগুলোরও হাত ছিল। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কাছে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র থাকতে পারে এ অপবাদ দিয়ে তাদের সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র ও পতিত রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হলো। এর পরিণামে সৃষ্ট হলো দায়েশ কিংবা ISIS-এর মতো মারাত্মক সংগঠন। এখন পর্যন্ত এ রাষ্ট্রগুলোকে পশ্চিমা বয়ানের ঔদ্ধত্যের প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রও যে খুব স্থিতিশীল অবস্থানে আছে তা বলা যাবে না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, যেমন- সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, কুয়েতের সুরক্ষার জন্য প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করতে হচ্ছে।
তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধকে সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ (Global War on Terror) হিসেবে আখ্যায়িত করে সারা পৃথিবীতে মুসলমানদের চরিত্র হননের যে প্রচেষ্টা আমরা এ শতকের প্রথমার্থে দেখেছি তা বৃহৎ শক্তিগুলোর ঔদ্ধত্যেরই প্রায়োগিক রূপায়ণমাত্র। অবশ্য এ ব্যাপারে কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্রেরও নির্বাক সমর্থন ছিল। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট তালেবানদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে। ২০ বছরের গৃহ বিদ্রোহের পর পুনরায় ২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানে তাদের ক্ষমতা দখল করে। এত ক্ষয়ক্ষতির পর যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তান থেকে ফিরে আসতে হলো। মূলত যুক্তরাষ্ট্রেরই পরাজয় হয়েছে।
ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের সর্বশেষ পরিচয় পাওয়া যায় রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের প্রতি অবজ্ঞামূলক আচরণে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রায় তিন বছর ধরে চলছে। এ যুদ্ধে রাশিয়া যে ভূমি দখলের আশা করেছিল তা মূলত ধূলিসাৎ হতে চলেছে। পুতিন নিশ্চয়ই এত দিনে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, যুদ্ধ কেবলমাত্র রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলই করেছে। স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর পুতিনের সুযোগ ছিল ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের, কিন্তু এ পর্যন্ত সেটা সম্ভব হলো না কেবলমাত্র তার নিজের পার্শ্ববর্তী দেশের প্রতি ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের প্রকাশের জন্য। অবশ্য এ ক্ষেত্রে জেলেনস্কির অবদান কম নয়। জেলেনস্কির ন্যাটোর সদস্য হওয়ার একপেশি মনোভাবই ইউক্রেনের জনসাধারণের জন্য মহাবিপদ ডেকে এনেছে।
বিশ্বায়নের এ যুগে রাজনীতিবিদদের ভুলে গেলে চলবে না যে, একটি রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, প্রতিটি রাষ্ট্রই বিভিন্ন কারণে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা প্রথম’ স্লোগানের মধ্যে যে লোকপ্রিয়তাবাদী জাতীয় ঔদ্ধত্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুঃখজনক পরিণতি বহন করে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আচরণ মোটেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হওয়ার কোনো করাণ নেই। কিউবার মতো একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে জিম্মি করে তার জনসাধারণকে অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দেওয়াটা কোনো মানদণ্ডেই সভ্য সমাজের আচরণ বলা যায় না। কিউবার ওপর তেল এবং জরুরি খনিজ ও চিকিৎসাসামগ্রীর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে কিউবা এখন মানবিক সংকটের কবলে।
সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো প্যালেস্টাইন এবং লেবাননের ওপর ইসরায়েলের অমানবিক আচরণ। নেতানিয়াহুর এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। অথচ ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করেই ইরানের রাজনৈতিক দাবিগুলো উঠে আসছে। এ পর্যন্ত ইসরায়েল যে নির্বিচারে ১ লাখ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা না থাকলেও ইরানের হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রোধের অন্ত নেই। তার কারণ হরমুজ প্রণালি সমগ্র বিশ্বের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত বলে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো চাপ দিচ্ছে। অথচ প্রবহমান যুদ্ধে বেসামরিক ইরানিদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান আক্রমণের ব্যাপারে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে তেমন কঠোর হতে দেখা যায় না। অবশ্য ইদানীং ইউরোপও ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে ক্লান্ত বলে মনে হয়। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ভন দের লেয়েনের ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের বক্তব্য ‘মধ্যপ্রাচ্য কিংবা গাল্ফ উপসাগরে আমরা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারব না যতদিন পর্যন্ত লেবাননে তীব্র ইসরায়েলি বিমান হামলার অগ্নিকাণ্ডের লেলিহান শিখা বজায় থাকবে’- এ মন্তব্য আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক কঠিন সত্যকেই বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে।
আমরা এ প্রবন্ধ Artemis-II-এর এক অনবদ্য সাফল্যের কাহিনি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এ সাফল্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনস্বীকার্য আনন্দের কারণ রয়েছে। কিন্তু এ আনন্দ ভবিষ্যতে যাতে জাতীয় গর্বের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডে রূপান্তরিত না হয়, সেটাই যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ বিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য হবে উদ্বেগের ব্যাপার। কারণ মহাকাশের জয়যাত্রা তখন পর্যবসিত হবে মহাকাশ যুদ্ধে।
লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন
অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত



