ঢাকা ২৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শুক্রবার, ১২ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
গোলের চেয়ে লাল কার্ড বেশি, লজ্জার ইতিহাস ৪০ বছর বয়সেও অদম্য জিকো মাঠে উল্লাস, বাইরে মৃত্যু বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ৩ লাল কার্ড, জয়ে শুরু মেক্সিকোর বিশ্বকাপ ফুটবল ও গাজাবাসীর বাস্তবতা কানাডার স্বপ্নযাত্রা নাকি বসনিয়ার চমক? রিয়াল মাদ্রিদের কোচ হলেন মরিনিও পেনাল্টি শূন্য ম্যারাডোনা কুইনোনসের গোলে প্রথমার্ধে এগিয়ে মেক্সিকো ৬০০ ভক্তের যাতায়াত খরচ দেবেন জার্মানির ফুটবলাররা ‘ফিফা বিশ্বের রাজা নয়’ শাকিরার সুরের মূর্ছনায় বিশ্বকাপের বর্ণিল উদ্বোধন দর্শকের ভালোবাসাই আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি: সূচরিতা বিইউপি মিডিয়া অ্যান্ড কমিউনিকেশন ক্লাবের আয়োজনে আনস্ক্রিপ্টেড ১.০ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্ট দলে তাওহিদ-রবিউল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টি-টোয়েন্টি দল ঘোষণা বাংলাদেশের খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আগুন, নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে ফায়ার সার্ভিস পরাশক্তিরা যেদিন মাঠ ছেড়েছিল কান্নাভেজা চোখে দেশে ফের ভূমিকম্প অনুভূত আবারও রক্তাক্ত কাশ্মীর, সংঘর্ষে নিহত ১৬ সরকারের এই বাজেট ঐতিহাসিক প্রস্তাবিত বাজেট রাজনৈতিক চমকবাজি ছাড়া আর কিছু নয়: জাসদ ক্রিকেটার নাসির-তামিমাকে খালাস দেওয়ার পেছনে বিচারকের পর্যবেক্ষণ জাতীয় সংসদের জন্য বরাদ্দ ২৯১ কোটি টাকা বাজেট ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ: ইসি পাবে ৪ হাজার ৪০১ কোটি টাকা বড় বাজেটের বোঝা কী জনগণের ঘাড়েই, প্রশ্ন বাসদের আবাসন বৃত্তির অর্থ পাচ্ছে জবি শিক্ষার্থীরা ‘ফাঁপা’ বাজেটে বৈষম্য বাড়বে: সিপিবি জুনের শেষে প্রধানমন্ত্রীর চীন সফর: ডেপুটি স্পিকার অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে টাইগারদের ওয়ানডে সিরিজ জয়
Nagad desktop

প্রতিটি রাষ্ট্রই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল

প্রকাশ: ২২ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৫২ পিএম
প্রতিটি রাষ্ট্রই পরস্পরের ওপর নির্ভরশীল
এয়ার ভাইস মার্শাল মাহমুদ হোসেন (অব.)

বিশ্বায়নের এ যুগে রাজনীতিবিদদের ভুলে গেলে চলবে না যে, একটি রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, প্রতিটি রাষ্ট্রই বিভিন্ন কারণে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা প্রথম’ স্লোগানের মধ্যে যে লোকপ্রিয়তাবাদী জাতীয় ঔদ্ধত্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুঃখজনক পরিণতি বহন করে।...

Hubris, এই ইংরেজি শব্দটি অধুনা প্রায়ই পশ্চিমা রাজনৈতিক বিশ্লেষণে একাডেমিক গুণীজনরা ব্যবহার করে থাকেন। অভিধানে Hubris-এর বাংলা অর্থ হলো- ঔদ্ধত্য, দাম্ভিকতা, অযথা গর্ব কিংবা অত্যাধিক অহংকার। ঔদ্ধত্যের মূল উৎস ক্ষমতা। এ ক্ষমতার বলে ঔদ্ধত্যের সৃষ্টি হয়ে থাকে তিনটি কারণে: সামাজিক পদমর্যাদা, আর্থিক প্রতিপত্তি কিংবা পাণ্ডিত্যপূর্ণ জ্ঞান। এ তিনটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান অদ্বিতীয়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো কোনো রাষ্ট্র এ পর্যন্ত তৈরি হয়নি। যুদ্ধ শেষে পৃথিবী যখন অর্থনৈতিক ধ্বংসের মুখোমুখী, যুক্তরাষ্ট্র তখন বিশ্বের ৪০-৫০ শতাংশ উন্নয়ন প্রবৃদ্ধির উৎপাদনকারী। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কেবলমাত্র অর্থনৈতিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে ছিল তা নয়, তার প্রকৃত চারণভূমি ছিল মেধার চর্চা। বিজ্ঞান এবং প্রযুক্তির অর্জনে যুক্তরাষ্ট্রের সমকক্ষ কোনো রাষ্ট্রই দাঁড়াতে পারেনি। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ ৫০ বছর পর হলেও চন্দ্র পরিভ্রমণে পুনরায় নভোচারী পাঠানোর Artemis-II-এর অভিযান মানবজাতির প্রতিনিধি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের অসাধারণ মেধার পরিচয় বহন করে। ২০২৮ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা রয়েছে Artemis-III মহাকাশযান চন্দ্রপৃষ্ঠে অবতরণ করানোর। বিজ্ঞানের প্রতি ভালোবাসা এবং তার জন্য নিরলস পরিশ্রম করার অভিপ্রায় আর দ্বিতীয় কোনো রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে এত প্রবলভাবে দেখা যায় না। কিন্তু আমাদের সংকটের মুখোমুখী হতে হয়, যখন যুক্তরাষ্ট্র বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রাকে তাদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে। এ মিথষ্ক্রিয়ায় পরাশক্তির মানসিক পটভূমিতে যে বৈশিষ্ট্য গেঁথে বসে তা হলো ধারণাতীত ঔদ্ধত্য।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র জাপানের হিরোশিমা এবং নাগাসাকি শহর দুটিতে আনবিক বোমা নিক্ষেপ করেছিল, ফলে প্রায় ২ লাখ বেসামরিক লোকের মৃত্যু ঘটে। অথচ এ বোমা দুটি জাপানের ওপর নিক্ষেপের কোনো প্রয়োজনই ছিল না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ প্রায় তখন শেষের পথে এবং যুদ্ধের সব ফ্রন্টেই জাপানের সামরিক বাহিনী সম্পূর্ণরূপে পরাভূত। মানুষের কল্যাণের জন্য যে আনবিক শক্তি উপৎপাদনের সমীকরণটি আলবার্ট আইনস্টাইন আবিষ্কার করেছিলেন, প্রেসিডেন্ট হ্যারি এস ট্রুমেন সে উদ্ভাবনকেই ঔদ্ধত্যে রূপান্তরিত করলেন সভ্যতা ধ্বংসের মাধ্যমে।

দুঃখের বিষয় হলো কেবলমাত্র ঔদ্ধত্যের বশবর্তী হয়ে যুক্তরাষ্ট্র প্রায় ১৩ বছর ভিয়েতনামে যুদ্ধ পরিচালনা করেছিল। যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের পরাজয় হলো। এ যুদ্ধে ১০ লাখের বেশি সামরিক এবং বেসামরিক লোকের মৃত্যু ঘটে, যার মধ্যে মার্কিনি এবং মিত্রপক্ষের সদস্য সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। সোভিয়েত ইউনিয়নপুষ্ট কমিউনিস্ট সরকারের পতন তো ঘটলই না বরং বর্তমানে চীনের পর ভিয়েতনাম যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্যিক পার্টনার।

এখানে উল্লেখ্য, যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে যে স্নায়ুযুদ্ধ ১৯৪৫ থেকে ১৯৮৯ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত হয়েছিল, তার মূল মতাদর্শিক কারণ ছিল কমিউনিজম (সাম্যবাদ) এবং ক্যাপিটালিজমের (পুঁজিবাদ) মধ্যে তাত্ত্বিক দ্বন্দ্ব। এ দুটি বৃহৎ শক্তির মানসিক দ্বন্দ্বের খেসারত দিতে হয়েছে ভিয়েতনাম, কোরিয়া, পূর্ব এবং পশ্চিম ইউরোপ, দক্ষিণ আমেরিকা এবং আফ্রিকার বহু ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে। ইতিহাসের নির্মম পরিণতি হলো সোভিয়েত ইউনিয়নে কমিউনিজমের পতন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের মধ্যদিয়ে হয়নি, হয়েছিল অভ্যন্তরীণ আর্থ-সামাজিক রক্তক্ষরণের কারণে।

সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর আশা করা হয়েছিল যে, কেবলমাত্র একটি পরাশক্তির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিশ্বে শান্তির সূচনা হবে। কিন্তু তা সম্ভব হলো না, যদিওবা জ্যেষ্ঠ বুশ, ক্লিনটন এবং ওবামার প্রশাসনের সময় কিছুটা হলেও সে প্রচেষ্টা অব্যাহত ছিল। কমিউনিজমের পর পরই যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদের ধারা অব্যাহত রাখার জন্য প্রয়োজন পড়ল আর এক শত্রুর। যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকরা খুঁজে পেলেন ইসলামভীতির (Islamophobia) মধ্যে সেই কাল্পনিক শত্রু। মধ্যপ্রাচ্য পরিণত হলো ইসলামভীতির সেই লক্ষ্যভূমিতে। ইরাক, লিবিয়া এবং সিরিয়াকে সন্ত্রাসের লীলাভূমি আখ্যায়িত করে ধ্বংস করা হলো। এ রাষ্ট্রগুলোকে ধ্বংস করার পেছনে অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ন্যাটোর পশ্চিমা বন্ধু রাষ্ট্রগুলোরও হাত ছিল। মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর কাছে গণবিধ্বংসী মারণাস্ত্র থাকতে পারে এ অপবাদ দিয়ে তাদের সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, দুর্বৃত্ত রাষ্ট্র ও পতিত রাষ্ট্র হিসেবে আখ্যায়িত করা হলো। এর পরিণামে সৃষ্ট হলো দায়েশ কিংবা ISIS-এর মতো মারাত্মক সংগঠন। এখন পর্যন্ত এ রাষ্ট্রগুলোকে পশ্চিমা বয়ানের ঔদ্ধত্যের প্রতিনিয়ত সম্মুখীন হতে হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রও যে খুব স্থিতিশীল অবস্থানে আছে তা বলা যাবে না। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রকে উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলো, যেমন- সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান, বাহরাইন, কুয়েতের সুরক্ষার জন্য প্রায় ৫০ হাজার সৈন্য মোতায়েন করতে হচ্ছে।

তালেবানদের সঙ্গে যুদ্ধকে সন্ত্রাসবিরোধী বৈশ্বিক যুদ্ধ (Global War on Terror) হিসেবে আখ্যায়িত করে সারা পৃথিবীতে মুসলমানদের চরিত্র হননের যে প্রচেষ্টা আমরা এ শতকের প্রথমার্থে দেখেছি তা বৃহৎ শক্তিগুলোর ঔদ্ধত্যেরই প্রায়োগিক রূপায়ণমাত্র। অবশ্য এ ব্যাপারে কতিপয় মুসলিম রাষ্ট্রেরও নির্বাক সমর্থন ছিল। ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন জোট তালেবানদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা থেকে অপসারণ করে। ২০ বছরের গৃহ বিদ্রোহের পর পুনরায় ২০২১ সালে তালেবানরা আফগানিস্তানে তাদের ক্ষমতা দখল করে। এত ক্ষয়ক্ষতির পর যুক্তরাষ্ট্রকে শেষ পর্যন্ত আফগানিস্তান থেকে ফিরে আসতে হলো। মূলত যুক্তরাষ্ট্রেরই পরাজয় হয়েছে।

ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের সর্বশেষ পরিচয় পাওয়া যায় রাশিয়ার ইউক্রেন আক্রমণে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ইরানের প্রতি অবজ্ঞামূলক আচরণে। ইউক্রেনে রাশিয়ার যুদ্ধ প্রায় তিন বছর ধরে চলছে। এ যুদ্ধে রাশিয়া যে ভূমি দখলের আশা করেছিল তা মূলত ধূলিসাৎ হতে চলেছে। পুতিন নিশ্চয়ই এত দিনে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছেন যে, যুদ্ধ কেবলমাত্র রাশিয়াকে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বলই করেছে। স্নায়ুযুদ্ধ অবসানের পর পুতিনের সুযোগ ছিল ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের, কিন্তু এ পর্যন্ত সেটা সম্ভব হলো না কেবলমাত্র তার নিজের পার্শ্ববর্তী দেশের প্রতি ক্ষমতার ঔদ্ধত্যের প্রকাশের জন্য। অবশ্য এ ক্ষেত্রে জেলেনস্কির অবদান কম নয়। জেলেনস্কির ন্যাটোর সদস্য হওয়ার একপেশি মনোভাবই ইউক্রেনের জনসাধারণের জন্য মহাবিপদ ডেকে এনেছে।

বিশ্বায়নের এ যুগে রাজনীতিবিদদের ভুলে গেলে চলবে না যে, একটি রাষ্ট্র যতই শক্তিশালী হোক না কেন, প্রতিটি রাষ্ট্রই বিভিন্ন কারণে একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ‘আমেরিকা প্রথম’ স্লোগানের মধ্যে যে লোকপ্রিয়তাবাদী জাতীয় ঔদ্ধত্যের পরিচয় পাওয়া যায়, তা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে অত্যন্ত দুঃখজনক পরিণতি বহন করে। ভেনেজুয়েলার ক্ষেত্রে ট্রাম্পের আচরণ মোটেই গ্রহণযোগ্য বলে মনে হওয়ার কোনো করাণ নেই। কিউবার মতো একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রকে জিম্মি করে তার জনসাধারণকে অসহায়ত্বের দিকে ঠেলে দেওয়াটা কোনো মানদণ্ডেই সভ্য সমাজের আচরণ বলা যায় না। কিউবার ওপর তেল এবং জরুরি খনিজ ও চিকিৎসাসামগ্রীর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কারণে কিউবা এখন মানবিক সংকটের কবলে।

সবচেয়ে দুঃখের বিষয় হলো প্যালেস্টাইন এবং লেবাননের ওপর ইসরায়েলের অমানবিক আচরণ। নেতানিয়াহুর এ ঔদ্ধত্যপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির পেছনে ডোনাল্ড ট্রাম্পের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। অথচ ফিলিস্তিনিদের নিরাপত্তা এবং সার্বভৌমত্বকে কেন্দ্র করেই ইরানের রাজনৈতিক দাবিগুলো উঠে আসছে। এ পর্যন্ত ইসরায়েল যে নির্বিচারে ১ লাখ ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে, তা নিয়ে কোনো মাথাব্যথা না থাকলেও ইরানের হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্রোধের অন্ত নেই। তার কারণ হরমুজ প্রণালি সমগ্র বিশ্বের অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িত বলে পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলো চাপ দিচ্ছে। অথচ প্রবহমান যুদ্ধে বেসামরিক ইরানিদের ওপর যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বিমান আক্রমণের ব্যাপারে ন্যাটোভুক্ত দেশগুলোকে তেমন কঠোর হতে দেখা যায় না। অবশ্য ইদানীং ইউরোপও ট্রাম্প এবং নেতানিয়াহুর ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণে ক্লান্ত বলে মনে হয়। ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট ভন দের লেয়েনের ১৩ এপ্রিল ২০২৬ তারিখের বক্তব্য ‘মধ্যপ্রাচ্য কিংবা গাল্ফ উপসাগরে আমরা স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে পারব না যতদিন পর্যন্ত লেবাননে তীব্র ইসরায়েলি বিমান হামলার অগ্নিকাণ্ডের লেলিহান শিখা বজায় থাকবে’- এ মন্তব্য আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতির এক কঠিন সত্যকেই বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরেছে।

আমরা এ প্রবন্ধ Artemis-II-এর এক অনবদ্য সাফল্যের কাহিনি দিয়ে শুরু করেছিলাম। এ সাফল্যে যুক্তরাষ্ট্রের অনস্বীকার্য আনন্দের কারণ রয়েছে। কিন্তু এ আনন্দ ভবিষ্যতে যাতে জাতীয় গর্বের ঔদ্ধত্যপূর্ণ কর্মকাণ্ডে রূপান্তরিত না হয়, সেটাই যুক্তরাষ্ট্র মহাকাশ বিজ্ঞানী এবং নীতিনির্ধারকদের জন্য হবে উদ্বেগের ব্যাপার। কারণ মহাকাশের জয়যাত্রা তখন পর্যবসিত হবে মহাকাশ যুদ্ধে।

লেখক: ডিস্টিংগুইস্ড এক্সপার্ট, অ্যাভিয়েশন 
অ্যান্ড অ্যারোস্পেস বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ এবং সাবেক রাষ্ট্রদূত

মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৭:৪৫ পিএম
মূল্যস্ফীতি ও সাধারণ মানুষের বাস্তবতা
ড. লিপন মুস্তাফিজ

এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এটি শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি সংকেত। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।...

দেশের একটি স্বনামধন্য দৈনিক পত্রিকায় প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে দেশে মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতিতে ক্রমবর্ধমান চাপের ইঙ্গিত বহন করছে। এটা একটা দেশের অর্থনীতির জন্য সুখকর নয়। যদিও আমরা জানি যে আমাদের দেশের নতুন সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। তবুও বাংলাদেশের অর্থনীতিতে সাম্প্রতিক সময়ের অন্যতম আলোচিত বিষয় হলো মূল্যস্ফীতি। এপ্রিলে মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ০৪ শতাংশে পৌঁছানো শুধু একটি পরিসংখ্যানগত তথ্য নয়, বরং এটি দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ওপর ক্রমবর্ধমান চাপের প্রতিফলন। এই উচ্চ মূল্যস্ফীতি দেশের নিম্ন ও মধ্যবিত্ত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক, কারণ তাদের আয়ের বড় অংশই ব্যয় হয় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে। ফলে মূল্যস্ফীতির সামান্য বৃদ্ধি হলেও তাদের জীবনে বড় ধরনের প্রভাব পড়ে।

এর আগে আমাদের সবার জানা দরকার মূল্যস্ফীতি বলতে আমরা কী বুঝি? সাধারণ মানুষ মূল্যস্ফীতি এবং মুদ্রাস্ফীতি নিয়ে মাঝে মাঝে বিপাকে পড়েন। মূল্যস্ফীতি বলতে বোঝায় নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পণ্য ও সেবার গড় মূল্যস্তরের বৃদ্ধি। যখন মূল্যস্ফীতি বাড়ে, তখন মানুষের হাতে থাকা অর্থের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়। অর্থাৎ, একই পরিমাণ অর্থ দিয়ে আগের তুলনায় কম পণ্য ও সেবা ক্রয় করা সম্ভব হয়। এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি মানে হলো, গত বছরের একই সময়ের তুলনায় গড়পড়তা পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। এটি এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি করে যেখানে মানুষের আয় অপরিবর্তিত থাকলেও ব্যয় বেড়ে যায়। ফলে জীবনযাত্রার মান ধীরে ধীরে নেমে আসে। এই মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে খাদ্যপণ্যের ওপর। চাল, ডাল, ভোজ্য তেল, সবজি, মাছ ও মাংসের দাম বৃদ্ধি সাধারণ মানুষের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে। কিছুদিন আগে জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির কারণে এক লাফে সবকিছুর দাম বেড়েছে। তথ্যপ্রযুক্তি ও সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে কোনো খবর চাপা থাকে না। ফলে গ্রামগঞ্জেও এর প্রভাব পড়ে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায় আগের দামে কেনা পণ্যের দাম হুট করেই বেড়ে যায়। আবার কোনো কোনো স্থান ভেদে একই পণ্য কমবেশি দামে বিক্রি করে। দুই দিন আগে আমি ইস্কাটনে একটা নরমাল হোটেলে মোগলাই অর্ডার করি, যার দাম ছিল ৯০ টাকা। ঠিক একদিন পরে বারডেম হাসপাতালে রোগী দেখার জন্য গিয়ে সেখানে ছাদের ওপরের রেস্টুরেন্টে মোগলাই খেলাম ১২০ টাকা দিয়ে। একই জিনিস স্থানভেদে আমাকে ৩০ টাকা বেশি খেতে হলো। এই চাপ বা অতিরিক্ত খরচ আমি না হয় সামাল দিলাম কিন্তু নিম্ন আয়ের মানুষ কী করবে। তাদের কি মোগলাই খেতে ইচ্ছে করবে না? তারা কি মাসে একবার গোশত খাবে না? নেবে না ইলিশের সুবাস? বিশেষ করে নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য খাদ্যব্যয়ের চাপ অসহনীয় হয়ে উঠছে। অনেক পরিবার তাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকা থেকে পুষ্টিকর খাবার বাদ দিতে বাধ্য হচ্ছে, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। ইদানীং পে-স্কেলের কথা শোনা যায় পত্রপত্রিকার মাধ্যমে। তখন যদি বেতন বৃদ্ধি পায় তাহলে আরেক দফায় পণ্য ও সেবার দাম বাড়বে বৈ কমবে না। আগামী অর্থবছরের বাজেট নিয়ে আলোচনা চলছে। সুতরাং বাজেট ঘোষণার পরে আবারও পণ্যের দাম বাড়বেই। তখন সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ কী করবে? কীভাবে জীবন ধারণ করবে।

গ্রামাঞ্চল থেকে শহর–সব জায়গাতেই এ প্রভাব স্পষ্টভাবে লক্ষ্য করা যাচ্ছে। একজন নিম্ন আয়ের শ্রমিকের উদাহরণ ধরা যেতে পারে। আগে যে আয় দিয়ে একটি পরিবার মাসের পুরো সময় স্বাচ্ছন্দ্যে চলতে পারত, এখন সেই একই আয় দিয়ে মাসের মাঝামাঝি সময়েই টান পড়ছে। ফলে তারা বাধ্য হয়ে কম দামে নিম্নমানের খাদ্য কিনছে বা ঋণের ওপর নির্ভর করছে। এই বাস্তবতা শুধু একটি পরিবারের নয়, বরং লাখো মানুষের প্রতিদিনের অভিজ্ঞতা। শুধু খাদ্যপণ্যই নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় অন্যান্য খাতেও মূল্যস্ফীতির প্রভাব স্পষ্ট। বাসাভাড়া, পরিবহন খরচ, শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যয় সবকিছুই ধীরে ধীরে বাড়ছে। ফলে একটি পরিবারের মাসিক ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে, কিন্তু আয় সেই অনুপাতে বাড়ছে না। এর ফলে মানুষের সঞ্চয় কমে যাচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে মানুষ ঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এটি অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা ও মানসিক চাপ বাড়িয়ে দেয়। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি একটি বড় কারণ। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেল, গম এবং ভোজ্য তেলের দাম বৃদ্ধি পেলে আমদানিনির্ভর দেশ হিসেবে বাংলাদেশও তার প্রভাব থেকে মুক্ত থাকতে পারে না। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের বিঘ্ন এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়ন আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। যখন টাকার মান কমে যায়, তখন একই পণ্য আমদানি করতে বেশি টাকা খরচ করতে হয়। এই অতিরিক্ত খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর চাপ হিসেবে পড়ে। অভ্যন্তরীণ বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা মূল্যস্ফীতিকে আরও ত্বরান্বিত করে। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য, মজুতদারি এবং পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব বাজারে অস্থিতিশীলতা তৈরি করে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এমন যে বইয়ের শেখা থিওরির সঙ্গে মেলাতে পারি না। এই উচ্চমূল্যস্ফীতি সামগ্রিক অর্থনীতির ওপরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। যখন মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যায়, তখন বাজারে চাহিদা হ্রাস পায়। এর ফলে ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন, কারণ তাদের পণ্যের বিক্রি কমে যায়। অন্যদিকে, উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পাওয়ায় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও চাপে পড়ে, যা বিনিয়োগ এবং কর্মসংস্থানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটেও মূল্যস্ফীতি একটি বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশ্বের অনেক দেশই বর্তমানে উচ্চমূল্যস্ফীতির সঙ্গে লড়াই করছে। তবে উন্নত দেশগুলোতে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থা শক্তিশালী হওয়ায় সাধারণ মানুষ তুলনামূলকভাবে কম ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে এই সুরক্ষাব্যবস্থা সীমিত হওয়ায় প্রভাবটা বেশি তীব্রভাবে অনুভূত হয়।

নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য পরিস্থিতি সবচেয়ে কঠিন। তাদের আয়ের বড় অংশই খাদ্য এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের পেছনে ব্যয় হয়। ফলে পণ্যের দাম বাড়লে তারা অন্য প্রয়োজনীয় খাতে খরচ কমাতে বাধ্য হয়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, তারা চিকিৎসা বা শিক্ষার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতেও ব্যয় কমিয়ে দেয়। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে মানবসম্পদ উন্নয়ন ব্যাহত হয় এবং দারিদ্র্যের চক্র আরও গভীর হয়। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারের কার্যকর ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি। বাজার তদারকি জোরদার করতে হবে যাতে কোনো ধরনের মজুতদারি বা কৃত্রিমসংকট সৃষ্টি না হয়। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে এবং প্রয়োজনে আমদানি সহজ করতে হবে। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ভর্তুকি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আরও সম্প্রসারণ করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। মুদ্রানীতি কঠোর করা, সুদের হার সমন্বয় এবং বাজারে অতিরিক্ত তারল্য নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে মূল্যস্ফীতি কমানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে এসব পদক্ষেপ গ্রহণের সময় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি যেন ব্যাহত না হয়, সেটিও বিবেচনায় রাখতে হবে। একটি ভারসাম্যপূর্ণ নীতি গ্রহণই এখানে সবচেয়ে কার্যকর হতে পারে।

সবশেষে বলা যায়, এপ্রিলে ৯ দশমিক ০৪ শতাংশ মূল্যস্ফীতি বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। এটি শুধু বর্তমান পরিস্থিতির প্রতিফলন নয়, বরং ভবিষ্যতের জন্যও একটি সংকেত। যদি এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয়, তাহলে এই মূল্যস্ফীতি দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক উন্নয়ন এবং মানুষের জীবনমানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তবে আশার কথা হলো, সঠিক নীতি, কার্যকর বাস্তবায়ন এবং সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। সরকার, ব্যবসায়ী এবং সাধারণ মানুষ সবাই যদি দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করে, তাহলে মূল্যস্ফীতির এই চাপ কমিয়ে একটি স্থিতিশীল, সহনশীল এবং টেকসই অর্থনীতি গড়ে তোলা সম্ভব।

লেখক: ব্যাংকার ও কলামিস্ট

খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে সাধারণ জনগণ

প্রকাশ: ১১ জুন ২০২৬, ০৬:৫৯ পিএম
খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে সাধারণ জনগণ
আবু আহমেদ

ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না, ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। সরকারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীন অসম আকার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংস্কার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে।...

আগামী বাজেটের আকার ৯ লাখ কোটি টাকার বেশি হবে। এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন করতে হলে সরকারের আয় বাড়াতে হবে। এনবিআরের রাজস্বের আওতা ও লক্ষ্যমাত্রা বাড়াতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে নতুন করে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করতে হবে। এতে অনেক পণ্যের দাম বাড়বে। সেবা খাতের  খরচ বাড়বে। যা জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়াবে। এখনই সাধারণ মানুষ খরচের চাপে আছে। আরও খরচ বাড়লে বিপাকে পড়বে।

রাজস্ব আদায়ের ঘাটতি ১ লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। অর্থসংকটে নিয়মিত খরচ চালিয়ে যাওয়াও সরকারের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে জিনিসপত্রের দাম বাড়ায় জীবনযাত্রার ব্যয় মেটাতে হিমশিম খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আগামী বাজেটে খরচ কমানোর প্রত্যাশা করলেও তা বাস্তবায়ন হবে না। বরং বাজেটে সরকার আয় বাড়াতে গিয়ে আগামী অর্থবছরের বাজেটে অনেক জিনিসপত্রের দাম বাড়াচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার ব্যয়, ব্যবসাবাণিজ্য, শিল্প খাতে খরচ বাড়বে। এরই মধ্যে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাবে বাড়বে মূল্যস্ফীতি। অন্যদিকে নতুন অর্থবছরে ১ লাখ কোটি টাকার বেশি ভ্যাটের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানো হয়েছে। অন্য সব বাদ দিয়ে শুধু এই দুই কারণেই অনেক কিছুর দাম ও খরচ বাড়বে। শেষ পর্যন্ত এ সবকিছুই জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়িয়ে ফেলবে।

আগামী অর্থবছরের বাজেটে শুল্ক-কর-ভ্যাটের কারণে বিভিন্ন নিত্যপণের দাম বাড়বে। চিকিৎসা ও যাতায়াতের খরচ বাড়বে। শিক্ষা উপকরণের দাম বাড়বে। আমদানি করা পণ্যের দামও বাড়বে। দেশি পোশাকের দাম বাড়বে। ঠিকাদার ব্যবসায়ের লাইসেন্স ফি বাড়বে। বাজেটে চাল, ডাল, চিনি ও ভোজ্য তেলের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি পর্যায়ে উৎসে কর কিছুটা কমিয়ে বহাল থাকছে। আমদানিকারকরা এই বহাল থাকা করের অজুহাতে পণ্যের দাম বাড়িয়ে রাখার সুযোগ পেতে পারেন। এমনও জানা যাচ্ছে যে, আগামী বাজেটে তামাকপণ্যের দাম বাড়বে। কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক বাড়ানোয় দেশে উৎপাদিত পণ্যের দাম বাড়বে। এমনকি আমদানি করা গুঁড়া দুধ, মাছ ও শুকনা ফলের দাম বাড়বে।

মোটরসাইকেল উৎপাদনে ব্যবহৃত যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিদ্যমান রাজস্ব বহাল থাকলেও উচ্চ সিসির সম্পূর্ণ মোটরসাইকেল আমদানিতে শুল্ক হার বাড়বে। এতে আমদানি করা বেশি সিসির মোটরসাইকেলের দাম বাড়বে। অন্যদিকে আসন্ন বাজেটে আমদানিকৃত প্লাস্টিক পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে। পার্লারের খরচ ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবহনে চলাচল খরচও আসন্ন বাজেটে বেশি থাকবে। আগামী বাজেটে দেশে শিল্প খাতে ব্যবহৃত অনেক কাঁচামালের আমদানি নিরুৎসাহিত করা হবে। বিশেষভাবে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামাদি, লোহার রড, স্ক্র্যাব, টেক্সটাইল, চামড়া খাত, পাটশিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালের সম্পূরক শুল্ক বাড়ানো হবে। দেশি গরুর দুধ, মসলা ও দেশি শিল্পে বানানো খেলনার দাম বাড়বে না।

আবার, দেশে ব্যাংকিং খাতের দীর্ঘদিনের কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধারে সরকার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছে। ব্যাংকের মূলধন ঘাটতি, তারল্যসংকট, দেউলিয়া বা অস্তিত্বের জন্য হুমকি, এমন সব ঝুঁকির সময়োপযোগী সমাধান এবং আর্থিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে ইতোমধ্যে ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিগত সময়ে আর্থিক খাতে ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে। নজিরবিহীন অপশাসনের মাধ্যমে ব্যাংক খাতকে প্রায় ধ্বংসের মধ্যে ফেলে দেওয়ার অপচেষ্টা করা হয়েছিল। ব্যাংকগুলো লুটপাটের কারণেই আর্থিক খাতের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে দেশের পুঁজিবাজারেও। দেশ থেকে প্রচুর টাকা পাচার হয়েছে। ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র এখন সামনে আসতে শুরু করেছে। ২০২৩ সালের জুনে খেলাপি ঋণের হার ছিল ১০ দশমিক ১১ শতাংশ। ২০২৪ সালের ডিসেম্বর শেষে দাঁড়িয়েছে ২০ দশমিক ২০ শতাংশে। অর্থাৎ খেলাপি ঋণ প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে এ ব্যাংকগুলোকে প্রায় শেষ করে দিয়েছে মাফিয়া গ্রুপ। এ সরকারের সময় আর সেই সুযোগ নেই। এদের বিচারের আওতায় আনতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে।

দেশের অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সরকারকে সংস্কারের দিকে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে হলে রাজনৈতিক পরিস্থিতি অনুকূলে রাখতে হবে। মনে রাখতে হবে, দেশের মধ্যে অশান্তি সৃষ্টি করে ভালো কিছু আশা করা যায় না। আমাদের রাজস্ব বাজেটের আকার বেড়েছে, যা এডিপির তুলনায় প্রায় আড়াই গুণ। রাজস্ব নিয়ে আমাদের আগে থেকেই আরও চিন্তাভাবনা করা উচিত ছিল। আগের সরকার নির্বাচনের নামে নানারকম প্রহসন করেছে। ফলে অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। কাজেই গণতন্ত্রের নামে আমরা এখনো যদি বিভাজন করি, তাহলে কোনোভাবেই সামনে এগোনো সম্ভব নয়। দেশে বিনিয়োগ অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি হলেই ব্যবসা ও বিনিয়োগ সৃষ্টিতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা আস্থা ফিরে পাবেন। কৃষকের জন্য কোনো কিছুর ভর্তুকি দেওয়ার উদ্যোগ খুবই ভালো দিক।

শেয়ারবাজারকে পুনরায় চাঙা করে তুলতে কিছু পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত ও তালিকাভুক্ত নয় এমন কোম্পানির মধ্যকার করপোরেট করহারের ব্যবধান বৃদ্ধি এবং ব্রোকারেজ হাউসের লেনদেনের ওপর ধার্য কর কমানো। এসব প্রণোদনার সুবিধাভোগী শেয়ারবাজার-সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান সরাসরি বিনিয়োগকারীরা কোনো সুবিধা পাবেন না। যদিও বাজেটের আগে বিনিয়োগকারীদের লভ্যাংশ আয় থেকে শুরু করে মূলধন মুনাফার ওপর থেকে কর প্রত্যাহারে জন্য দাবি জানানো হয়েছিল। আমরা যে বাজেট প্রণয়ন করি, তার ৭০ শতাংশই রাজস্ব বাজেট। এর কারণ হলো, আমাদের অর্থনীতির তুলনায় বিশাল আকারের সরকার নিয়ে আমরা বসে আছি। এখন এ বিশাল আকারের সরকারকে চালাতে হলে জনগণকে কর দিতে হবে। সরকার দক্ষ না হলে দেশের অর্থনীতিতে গতি আসবে না। বড় অর্থনীতির দেশ অথচ সরকারের পরিধি অনেক ছোট, এমন অনেক দেশ আছে। তারা পারছে, কাজেই আমাদেরও সেটা পারতে হবে। বাজারে কোনো কোম্পানি যখন লাভ করতে পারছে না, সেটাকে ভর্তুকি দিয়ে টিকিয়ে রাখার কোনো দরকার নেই। একটা লোকসানি শিল্পকে কেন সরকারের মধ্যে রাখতে হবে?

কিছু ভুল সিদ্ধান্তের কারণে আমরা বছরের পর বছর লোকসান দিয়ে যাচ্ছি। যতদিন এ ভর্তুকির সংস্কৃতি থেকে বের হতে না পারব, ততদিন আমাদের অর্থনৈতিক দৈন্য থেকেই যাবে। আর এসব কারণেই আমরা কর সংগ্রহ যতটুকুই করি, খরচটা অপব্যয় হচ্ছে এবং সেটা রোধ করতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে যে ক্ষেত্রগুলো করহারের অধীনে আসেনি সেগুলোকে করহারের আওতায় আনতে হবে। সে ক্ষেত্রে অটোমেশনে যেতে হবে। যাদের ঢাকা শহরে অনেক বাড়ি আছে, অথচ তারা সরকারকে কর ফাঁকি দিচ্ছে। এ রকম উদাহরণ বহু আছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান আছে কিন্তু আয়কর রিটার্ন দিচ্ছে না, ফাইভ স্টার হোটেলে ডিনার করছে, অথচ কর দিচ্ছে না, কোম্পানির ডিভিডেন্ট দেয় না, অথচ ওই কোম্পানির এমডি পাজেরো গাড়িতে চড়ে ঘুরে বেড়ান, তাদের জরিমানাসহ করের আওতায় আনতে হবে। সরকারের আয়-ব্যয়ের সমন্বয়হীন অসম আকার অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলবেই। সে ক্ষেত্রে আমাদের অবশ্যই সংস্কার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা অর্জনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। 

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও চেয়ারম্যান, আইসিবি 

গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:০৯ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৬:১০ পিএম
গণতন্ত্রমুখী বাজেট ও প্রত্যাশার সমীকরণ
ডা. আবু হেনা মোস্তফা কামাল

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহীন যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।...

অতীতে দেশের অর্থনীতি যে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বার্থরক্ষা এবং বাহ্যিক চাকচিক্য প্রদর্শনের হাতিয়ারে পরিণত হয়েছিল, তা সবার জানা। স্বৈরাচারী সরকারের আমলে গৃহীত উচ্চাভিলাষী, মেগা-প্রকল্পনির্ভর এবং খাতাকলমে বড় জিডিপি প্রবৃদ্ধির বাজেটগুলো দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও নেতিবাচক ধস নামিয়েছিল। সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস, ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ-সংকট এবং ব্যাংক খাতের ভঙ্গুর দশা তারই অকাট্য প্রমাণ। বিভিন্ন সূত্রের আভাসে জানা গেছে, এবারের বাজেট হতে যাচ্ছে ‘গণতন্ত্রমুখী’। সাম্যবাদী বাংলাদেশ বিনির্মাণের অভিযাত্রায় ‘গণতন্ত্রমুখী বাজেট’ ধারণাটি অত্যন্ত সময়োপযোগী ও অপরিহার্য।

গণতন্ত্রমুখী বাজেট বলতে এমন একটি অর্থনৈতিক দর্শনকে বোঝায়–যেখানে বাজেটের কেন্দ্রে থাকে সাধারণ নাগরিক। এতকাল ধরে যে ‘টপ-ডাউন’ অর্থনৈতিক মডেল অনুসরণ করা হয়েছে, তার অবসান ঘটিয়ে তৃণমূল মানুষের অধিকার ও চাহিদাকে প্রাধান্য দেওয়াই এ বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে। স্বৈরাচারী কাঠামোর প্রধান বৈশিষ্ট্যই ছিল কতিপয় সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর পকেট ভারী করা এবং এমন কিছু দৃশ্যমান অবকাঠামো তৈরি করা, যা সাধারণ মানুষের মৌলিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে খুব কমই অবদান রাখে। এর ফলে সমাজে তৈরি হয়েছে তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য।

বাজেটকে শুধু মুখে ‘গণতন্ত্রমুখী’ বললেই হবে না। এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট খাতের পুনর্বিন্যাস এবং কাঠামোগত সংস্কার। একটি গণতান্ত্রিক ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের ভিত্তি শক্ত হয় তার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার নিশ্চিতকরণের ওপর। আর এ অধিকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি স্তম্ভ হলো– কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য। বিগত সরকারের আমলে এই তিন খাতের ওপর দিয়ে যে অবহেলার ঝড় বয়ে গেছে, তার ক্ষত এখনো দগদগে। মেগা প্রকল্পের আড়ালে দেশের ফুসফুসখ্যাত এ খাতগুলোকে ক্রমাগত সংকুচিত করা হয়েছে। তাই নতুন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পুনর্গঠন নিশ্চিত করতে এই তিন খাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির অন্য কোনো বিকল্প নেই।

যে দেশের সিংহভাগ মানুষ এখনো প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কৃষির ওপর নির্ভরশীল, মানসম্মত শিক্ষা নতুন প্রজন্মের একমাত্র ভবিষ্যৎ এবং সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বড় অংশ চলে যায় চিকিৎসার পেছনে, সেখানে এই তিন খাতকে পেছনে ফেলে কোনো টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। এবারের বাজেটকে যদি সত্যিকার অর্থেই একটি ঐতিহাসিক ও রূপান্তরকামী দলিল হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, তবে রাষ্ট্রকে তার ব্যয়ের অগ্রাধিকার আমূল বদলে ফেলতে হবে। এই বিনিয়োগই নির্ধারণ করবে আমরা কেমন বাংলাদেশ পেতে যাচ্ছি।

বিগত সরকার অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি কৃষিকে এক প্রকার উপেক্ষাই করেছে। অথচ জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি, বিশ্ববাজারের অস্থিরতা এবং দেশের অভ্যন্তরীণ উচ্চমূল্যস্ফীতির এই ক্রান্তিকালে খাদ্য নিরাপত্তাই হলো আমাদের সবচেয়ে বড় ঢাল। সরকারের প্রথম দায়িত্ব হলো দেশের মানুষের জন্য পুষ্টিকর খাবার নিশ্চিত করা। এর জন্য প্রয়োজন কৃষি খাতে ভর্তুকি বাড়ানো, আধুনিক প্রযুক্তির সহজলভ্যতা এবং বীজ ও সারের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকরা যাতে তাদের উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য পান, সে জন্য বাজেটে সুনির্দিষ্ট বাজারজাতকরণ কাঠামোর জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ রাখতে হবে। কৃষি খাদ্য নিরাপত্তার পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টিরও সবচেয়ে বড় উৎস। ফলে কৃষির আধুনিকায়ন ও কৃষিজাতশিল্পে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করলে তা গ্রামীণ অর্থনীতিকে চাঙা করবে।

কৃষির পর যে খাতটি জাতির মেরুদণ্ড শক্ত করে, তা হলো ‘শিক্ষা’। বিগত আমলগুলোতে শিক্ষা খাতকে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ কারিকুলাম, গবেষণায় বরাদ্দের অভাব এবং দলীয়করণের কারণে শিক্ষার গুণগত মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। নতুন বাংলাদেশে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি বরাদ্দের গুণগত ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। ইউনেস্কোর পরামর্শ অনুযায়ী শিক্ষা খাতে জিডিপির অন্তত ৬ শতাংশ বা মোট বাজেটের ২০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া উচিত, অথচ আমাদের দেশে তা বরাবরই উপেক্ষিত ছিল। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরের বাজেটে এই ক্ষতি পূরণে সাহসী পদক্ষেপ দেখতে চায় দেশবাসী। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষকদের উপযুক্ত বেতন ও প্রশিক্ষণ এবং উচ্চশিক্ষায় গবেষণার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ওপর জোর দিয়ে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে না পারলে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুযোগ আমরা হারাব। শিক্ষা খাতকে বৈষম্যমুক্ত করা না গেলে কোনো দিনই একটি সাম্যবাদী ও গণতান্ত্রিক সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব নয়।

শিক্ষা ও কৃষির মতোই আরেকটি ভঙ্গুর ও উপেক্ষিত খাত হলো ‘স্বাস্থ্য’ খাত। বিগত দিনগুলোতে স্বাস্থ্য খাতের দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা দেশের মানুষকে কতটা নিঃস্ব করেছে, তা সবার জানা। সাধারণ মানুষের আয়ের একটি বিশাল অংশ চলে যায় চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে, যা অনেক মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারকে দারিদ্র্যের চরম সীমায় ঠেলে দিচ্ছে। একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র কখনোই তার নাগরিকদের চিকিৎসার অভাবে মরতে দিতে পারে না। এবারের বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ জিডিপির অন্তত ২ থেকে ৩ শতাংশে উন্নীত করা সময়ের দাবি। উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের হাসপাতালগুলোর আধুনিকায়ন, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসকের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালুর জন্য বাজেটে পাইলট প্রজেক্টের সূচনা করা যেতে পারে। চিকিৎসাসেবা যখন সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আসবে, তখনই বাজেটের গণতান্ত্রিক চরিত্র সাধারণ মানুষের কাছে দৃশ্যমান হবে।

কৃষি, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য–এই তিন স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়েই এবারের বাজেট একটি নতুন ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করতে পারে। কেবল বরাদ্দ বৃদ্ধি করলেই এই গণতন্ত্রমুখী বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের ঘরে পৌঁছাবে না, সমান্তরালে সুশাসন ও কাঠামোগত সংস্কারও নিশ্চিত করতে হবে। স্বৈরাচারী সরকারের রেখে যাওয়া আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং জবাবদিহিহী যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, তা উপড়ে ফেলাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। বাজেটের টাকা যাতে কোনো বিশেষ গোষ্ঠী বা সিন্ডিকেটের পকেটে না গিয়ে সরাসরি মাঠপর্যায়ে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের কাছে পৌঁছায়, তার জন্য একটি স্বচ্ছ, আধুনিক ও ডিজিটাল মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। প্রতিটি খাতের খরচের হিসাব জনগণের সামনে উন্মুক্ত রাখতে হবে, যেন বাজেটের ওপর নাগরিকের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়। এটিই হবে বাজেটের প্রকৃত গণতন্ত্রীকরণ।

এই বিশাল বাজেটের অর্থসংস্থানের ক্ষেত্রেও একটি বড় ধরনের পরিবর্তনের প্রয়োজন রয়েছে। পরোক্ষ কর বা ভ্যাটের বোঝা সাধারণ মানুষের ওপর থেকে নামিয়ে ফেলতে হবে। একটি গণতন্ত্রমুখী বাজেটের নীতি হওয়া উচিত প্রত্যক্ষ করের ওপর জোর দেওয়া। অর্থাৎ, ধনীদের ওপর করের হার বাড়িয়ে দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের করের বোঝা কমাতে হবে। কর ফাঁকি রোধ, অর্থ পাচার বন্ধ এবং খেলাপি ঋণ আদায়ের মাধ্যমে যদি অভ্যন্তরীণ সম্পদ আহরণ বৃদ্ধি করা যায়, তবে বিদেশি ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা অনেকাংশে কমে আসবে। স্বনির্ভর অর্থনীতি গড়ে তোলার এ প্রক্রিয়াটি দেশের সার্বভৌমত্ব ও গণতান্ত্রিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করবে। যুবসমাজের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পকে প্রণোদনা দেওয়া এবং সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর পরিধি আরও সম্প্রসারিত করার মাধ্যমেই এ বাজেটের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় প্রতিফলিত হবে।

লেখক: চিকিৎসক, ছড়াকার ও কলামিস্ট
[email protected]

দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি–পথের সন্ধানে

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৩১ পিএম
আপডেট: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:৩২ পিএম
দারিদ্র‍্য থেকে মুক্তি–পথের সন্ধানে
কাজী খলীকুজ্জমান আহমদ

বাংলাদেশের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শনির্ভর এক দৃঢ় ভিত্তি–সাম্য, মানবাধিকার, মানবমর্যাদা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা। একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ ও কার্যকারণ তাই বংলাদেশের জন্মলগ্মেই নিহিত। এ পর্যন্ত দেশকে সে পথে তেমন পরিচালনা করা হয়নি; তাই বলে তা কখনো বাস্তবায়িত হবে না–এ কথা বলা যায় না। বরং সেই আদর্শিক তাগিদ বাস্তবায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়।...

জন্মের সময় মানুষের মাথায় স্বাধীনতার তিলক থাকে এবং তখন মানবমর্যাদা ও সব মানবাধিকার তার প্রাপ‍্য থাকে। কিন্তু সমাজ ও রাজনৈতিক ব‍্যবস্থা মানুষের মধ‍্যে ভেদাভেদ সৃষ্টি করে। ক্ষমতা ও সম্পদের বদৌলতে কিছু মানুষ সমাজের ওপরতলা দখলে নেয়। তাদের দাপটে অসংখ‍্য মানুষ ছিটকে পড়ে জন্মগত অধিকার থেকে। তারা হয় দরিদ্র, বঞ্চিত, অবহেলিত, অনেক সময় লাঞ্ছনার শিকার।

বর্তমান সময়ে সম্পদে-প্রযুক্তিতে পৃথিবী অচিন্তনীয় উচ্চতায় অধিষ্ঠিত। থেমে নেই অগ্রগতি–উভয় ক্ষেত্রে দ্রুত নতুন নতুন চূড়া প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে। অপরদিকে পৃথিবীর সর্বত্র, বিশেষ করে স্বল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোতে পিছিয়ে থাকা, পিছিয়ে পড়া ও পিছিয়ে রাখা মানুষের লম্বা মিছিল বিদ‍্যমান। বিশ্বব‍্যাপী বিভাজনের এই কুৎসিত স্বরূপ বোঝার জন‍্য নিম্নোক্ত তথ‍্য কয়েকটিই যথেষ্ট। বিশ্ব বৈষম‍্য প্রতিবেদন-২০২২ (World Inequality Report 2022) অনুযায়ী, বিশ্বের অতি ধনী ১০ শতাংশ মানুষের মালিকানায় বিশ্বের ৭৬ শতাংশ সম্পদ, তার মধ্যে ৪০ শতাংশের হাতে ২২ শতাংশ আর পেছনের ৫০ শতাংশের হাতে মাত্র ২ শতাংশ। বিশ্বব‍্যাংকের তথ‍্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে মূল‍্যের ভারসাম‍্য রক্ষাকারী ডলারে দৈনিক ৩ দশমিক শূন্য ডলার আয়সীমার ভিত্তিতে বিশ্বে অতি দারিদ্র‍্যকবলিত মানুষের সংখ‍্যা ৮০৮ মিলিয়ন (৯ দশমিক ৯ শতাংশ), আর দৈনিক আয়সীমা ৮ দশমিক ৩০ শতাংশ পিপিপি ডলারের ভিত্তিতে দরিদ্র মানুষের সংখ‍্যা প্রায় ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন (৪৫ শতাংশ)। যেখানে বর্তমানে সম্পদ ও প্রযুক্তিতে বিশ্ব সনৈ সনৈ করে শিখরে ওঠার উদাহরণ স্থাপন করে চলেছে, সেখানে বৈষম‍্য ও দারিদ্র্যের এই ভয়াবহতা মানবতার চরম অবমাননা এবং মানবতার ধ্বজা সমুন্নত রাখতে বিশ্বনেতাদের নৈতিক ও নীতিগত গুরুতর সীমাবদ্ধতার নির্দেশক।

এবার আসি বাংলাদেশের কথায়। প্রাপ্ত তথ‍্য থেকে দেখা যায়, বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ধনী ১০ শতাংশ মানুষের হাতে দেশের মোট সম্পদের ৫৮ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ৪১ শতাংশ। অপরদিকে, সবচেয়ে পেছনের ১০-এর হাতে জাতীয় আয়ের ১ দশমিক ৩১ শতাংশ এবং জাতীয় সম্পদের ১ শতাংশের কম। পেছনের ৫০ শতাংশ মানুষের মালিকানায় রয়েছে জাতীয় সম্পদের মাত্র ৪ দশমিক ৭ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ১৯ শতাংশ।

বিশ্বব‍্যাপী সম্পদ ও আয় বিভাজনের তুলনায় বাংলাদেশে তা খানিকটা কম প্রকট। বলাবাহুল‍্য, তার পরও অতি প্রকট। মৌলিক চাহিদার খরচের ভিত্তিতে বিশ্বব‍্যাংকের প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫ সালে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ছিল ২১ দশমিক ৪ থেকে ২২ দশমিক ৯ শতাংশের মধ‍্যে। বিদ‍্যমান সম্পদ ও আয় বিভাজন থেকে প্রতীয়মান হয় যে, বাংলাদেশে দারিদ্র্যসীমার ওপরের অসংখ‍্য মানুষ সেই সীমার এত সন্নিকটে যে তাদের নানা টানাপোড়নের মধ‍্যদিয়ে চলতে হয়। দরিদ্র এবং দরিদ্রসম মানুষের অনুপাত দেশের সব মানুষের ৬০ বা ততধিক শতাংশ হতে পারে।

দারিদ্র‍্য শুধু অর্থনৈতিক বিষয় নয়। দারিদ্র‍্য আসলে মহুমাত্রিক, যেমন জীবনের নানা মাত্রা রয়েছে। আয় ছাড়াও মাত্রাগুলোর মধ‍্যে রয়েছে: শিক্ষা, স্বাস্থ‍্য‍, সক্ষমতা, সমাজে অবস্থান, আইনের বিচারের নিশ্চয়তা, সব মানবাধিকারে যথাযথ অভিগম‍্যতা এবং মানব-মর্যাদা। এই নিরিখে বিচার করলে দেখা যাবে পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষ কোনো না কোনোভাবে বঞ্চিত। মুষ্টিমেয়ের নিয়ন্ত্রণে রাষ্ট্র, অর্থনীতি, রাজনীতি ও সমাজব‍্যবস্থা। অবশ‍্য উন্নত বিশ্বে আইনের শাসনের প্রচলন তুলনামূলকভাবে উন্নতমানের থাকায়, দেখা যায় মৌলিক মানব স্বাধীনতা মোটামুটি সবাই ভোগ করেন।

লক্ষণীয়, পৃথিবীর প্রায় সর্বত্র ওয়াশিংটন সমঝোতা-ভিত্তিক নব‍্য উদারতাবাদ দাপটের সঙ্গে বিরাজমান। এর মূল সুর হলো যাদের যত বেশি সম্পদ ও ক্ষমতা আছে তারাই অগ্রগতির সিংহভাগ নিজেদের করে নেয়।

তদুপরি, উন্নয়নশীল বিশ্বে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তবতা এমন যে, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো ক্ষমতাধর রাষ্ট্রগুলোর ভূরাজনৈতিক স্বার্থের বলি হয় বিভিন্নভাবে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ক্ষমতার পরিবর্তনও ঘটানো হয়। আবার উন্নয়নশীল বিভিন্ন দেশে অনেক সময় আন্তর্জাতিক যোগসাজশে দেশ পরিচালনা করা হয়, ক্ষমতাবলয়ের স্বার্থ রক্ষার কৌশল হিসেবে।

এ বাস্তবতায় কোনো উন্নয়নশীল দেশে মানবকেন্দ্রিক কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন কীভাবে সম্ভব হতে পারে, সে প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই সামনে আসে। পরিবর্তনের সম্ভাবনা অবশ্যই রয়েছে, কিন্তু তার জন‍্য প্রয়োজন জনমুখী রাষ্ট্রচিন্তা, গণতান্ত্রিক জবাবদিহি, মানবাধিকারের প্রতি অঙ্গীকার এবং বৈষম‍্য হ্রাসে কার্যকর রাজনৈতিক সদিচ্ছা। বিদ‍্যমান বৈশ্বিক ও দেশীয় ক্ষমতাকাঠামোর বাস্তবতায় এমন পরিবর্তন সহজে ঘটবে–তার নিশ্চয়তা নেই।

স্মর্তব‍্য, ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘ মানবাধিকারের সর্বজনীন ঘোষণাপত্র গ্রহণ করে। এ প্রবন্ধের শুরুতে যে বক্তব‍্য উল্লেখ করা হয়েছ, তা এ ঘোষণাপত্রের প্রথম ধারায় বলা হয়েছে: মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন এবং মর্যাদা ও সব মানবাধিকারের অধিকারী। সুতরাং, যদি এমন একটি সমাজ গড়ার লক্ষ‍্য থাকে যেখানে ব্রত হবে দারিদ্র্যের উল্লিখিত বহুমাত্রিকতার উপশমে সচেষ্ট হওয়া, তবে সেখান থেক শুরু করতে হবে। অর্থাৎ, সোজা কথায়–মানুষ হিসেবে সব মানুষ সমান; আর মানবতার দাবি হচ্ছে, কারও প্রতি বৈরিতা, অবহেলা, অন‍্যায় আচরণ না করা এবং সবার জন‍্য ন‍্যায‍্য রাষ্ট্রীয় ও আইনি ব‍্যবস্থা নিশ্চিত করা। তবেই জনকেন্দ্রিক, সুস্থ, ন‍্যায়ভিত্তিক ও বহুমাত্রিক-দারিদ্র্যমুক্ত রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনের পথ প্রশস্ত হতে পারে।

এই আলোকে বলা যায়, বাংলাদেশের রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শনির্ভর এক দৃঢ় ভিত্তি–সাম্য, মানবাধিকার, মানবমর্যাদা, গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িকতা। একটি ন্যায়ভিত্তিক মানবিক সমাজ নির্মাণের জন্য প্রয়োজনীয় মূল্যবোধ ও কার্যকারণ তাই বংলাদেশের জন্মলগ্মেই নিহিত। এ পর্যন্ত দেশকে সে পথে তেমন পরিচালনা করা হয়নি; তাই বলে তা কখনো বাস্তবায়িত হবে না–এ কথা বলা যায় না। বরং সেই আদর্শিক তাগিদ বাস্তবায়িত হওয়া বাঞ্ছনীয়।

লেখক: অর্থনীতিবিদ ও সমাজচিন্তক

রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ০৫:১৭ পিএম
রামিসা ও নূরজাহান হত্যা: আমাদের মূল্যবোধের পচন
ড. নাহিদ ফেরদৌসী

নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।...

বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি বিচারিক কার্যকারিতা ও শিশু সুরক্ষার বিষয়ে গভীর উদ্বেগের সূত্রপাত করেছিল। ঘটনা সংঘটনের ১৯ দিন পর, ঘথ ৭ জুন বহুল প্রতীক্ষিত রায় প্রকাশ হয়েছে।

এতে দুজন মূল অপরাধীকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে। এই যুগান্তকারী রায়টি নিঃসন্দেহে দ্রুত বিচারের একটি নজির সৃষ্টি করেছে। রায়টি শোকাহত মা-বাবার জন্য কতটুকু স্বস্তি ও মানসিক মুক্তি এনে দিয়েছে এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে কি না, তা নির্ভর করছে রায়টির দ্রুত বাস্তবায়নের ওপর।

স্বপ্ন মানুষের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান, যা কারও দ্বারা দখল বা কেড়ে নেওয়া যায় না। একজন বাবা-মা সারাজীবন কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে সন্তানের ভবিষ্যৎকে ঘিরে যে স্বপ্ন বুনে যান, তা কেবল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ নয়; বরং তা একটি গভীর মানবিক প্রতিশ্রুতি, ভালোবাসা ও আশার প্রতিফলন।

কিন্তু আজ আমরা এমন এক সামাজিক বাস্তবতার মুখোমুখি, যেখানে শিশুদের–বিশেষ করে কন্যাশিশুদের নিরাপত্তা ক্রমেই অনিশ্চিত হয়ে উঠছে। তাদের মৌলিক অধিকার, নিরাপদ শৈশব ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা আজ গভীর প্রশ্নের সম্মুখীন।

রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত নৃশংস ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড কেবল একটি বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ, নৈতিক কাঠামো এবং রাষ্ট্রীয় সুরক্ষাব্যবস্থার গভীর সংকটকে উন্মোচিত করেছে। এই নির্মম ঘটনা জাতির বিবেককে যেমন গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে, তেমনি সমাজের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সহিংসতা ও অবক্ষয়ের নগ্ন চিত্রও স্পষ্ট করেছে।

যে মা-বাবা তাদের সন্তানের স্বপ্ন, আশা ও ভবিষ্যৎকে কেন্দ্র করে জীবনের প্রতিটি ত্যাগ স্বীকার করেন, তাদের জন্য সন্তানের নিথর ও ক্ষতবিক্ষত দেহের সামনে দাঁড়ানো অকল্পনীয়, ভাষাহীন ও চিরস্থায়ী বেদনার অভিজ্ঞতা। এই বেদনা কেবল একটি পরিবারের নয়, এটি সমগ্র মানবিক সমাজের ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি।

এই নির্মম ঘটনার জন্য প্রকৃত দায় কার–পরিবার, সমাজ, নাকি রাষ্ট্র? নাকি আমাদের সম্মিলিত উদাসীনতা, নৈতিক অবক্ষয় এবং কার্যকর নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ব্যর্থতাই এই ট্র্যাজেডির মূল কারণ?

আজ প্রশ্ন আরও গভীরভাবে উঠে আসে–শিশুদের সার্বিক সুরক্ষার চূড়ান্ত দায়িত্ব কার ওপর বর্তায়? এবং কেন বারবার এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটে চলেছে?

বছরের পর বছর কত আর মা-বাবাকে সন্তানের শোকে আজীবন মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে দিন কাটাতে হবে? রামিসার মতো অসংখ্য শিশু ও পরিবার আজ একই অনিশ্চয়তা ও ভয়ের মধ্যে বসবাস করছে, এটাই আমাদের সমকালীন সামাজিক বাস্তবতার নির্মম চিত্র।

এখন সময় এসেছে ন্যায়বিচারের এমন একটি দৃষ্টান্তমূলক ও কার্যকর ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার, যেখানে অপরাধের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া হবে দ্রুত, নিশ্চিত ও নির্ভরযোগ্য; যাতে আর কোনো মা-বাবাকে সন্তানের নির্মম মৃত্যু স্মরণ করে আজীবন মানসিক যন্ত্রণায় ভুগতে না হয়।

বাংলাদেশের আইনি প্রেক্ষাপটে এ ধরনের জঘন্য অপরাধ মোকাবিলার জন্য সুস্পষ্ট আইনগত কাঠামো বিদ্যমান। দণ্ডবিধি-১৮৬০ (Penal Code, 1860)-এর অধীনে হত্যা (ধারা ৩০২) এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত গুরুতর অপরাধগুলোর জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। পাশাপাশি, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০ (Women and Children Repression Prevention Act, 2000) শিশু ধর্ষণ, ধর্ষণের পর হত্যা এবং যৌন সহিংসতার মতো অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত বিচার ও কঠোর শাস্তির জন্য বিশেষ বিধান প্রণয়ন করেছে, যেখানে অনেক ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড নির্ধারিত। এ ছাড়া শিশু সুরক্ষার ক্ষেত্রে শিশু আইন-২০১৩ (Children Act, 2013) রাষ্ট্রকে শিশুর সর্বোত্তম স্বার্থ নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা আরোপ করেছে, যা সংবিধানের ২৭, ২৮, ৩১ ও ৩২ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে জীবন, মর্যাদা ও সমতার অধিকারকে সুরক্ষা দেয়। তবুও বাস্তবতা হলো, আইনগত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও এর কার্যকর প্রয়োগ, দ্রুত বিচার প্রক্রিয়া এবং প্রতিরোধমূলক সামাজিক ব্যবস্থা যথেষ্ট শক্তিশালী না হলে এ ধরনের নির্মম ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে দ্রুত নিরপেক্ষ ও সময়বদ্ধ বিচার নিশ্চিত করা জরুরি, যাতে অপরাধীরা কোনোভাবেই আইনের ফাঁক গলে বেরিয়ে যেতে না পারে। শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্র, সমাজ ও পরিবারকে সমন্বিতভাবে কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা ও নজরদারি কাঠামো গড়ে তুলতে হবে।

আইন ও ন্যায়বিচারের দৃষ্টিকোণ থেকে রামিসার ওপর সংঘটিত ধর্ষণ ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড এমন এক অপরাধ, যা সমাজের সামষ্টিক বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট Bachan Singh v. State of Punjab (1980) এবং পরবর্তীতে Machhi Singh v. State of Punjab (1983) মামলায় ‘Rarest of the Rare Cases’ নীতি প্রবর্তন করে ঘোষণা করেন যে, যখন কোনো অপরাধের নৃশংসতা, ভুক্তভোগীর অসহায়ত্ব, অপরাধের সামাজিক অভিঘাত এবং মানবিক মূল্যবোধের ওপর আঘাত এতটাই গভীর হয় যে, সাধারণ শাস্তি ন্যায়বিচারের উদ্দেশ্য পূরণে অপর্যাপ্ত হয়ে পড়ে, তখন সর্বোচ্চ শাস্তি বিবেচিত হতে পারে। আদালত আরও উল্লেখ করেন যে, এমন অপরাধ সমাজের ‘collective conscience’ বা সামষ্টিক বিবেককে স্তম্ভিত করে দেয়। রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ শিশুর ওপর সংঘটিত এই পাশবিক নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ড সেই নীতির আলোকে বিচারযোগ্য একটি ঘটনা হিসেবে জনমনে প্রতীয়মান হয়েছে, যেখানে ন্যায়বিচার কেবল একটি পরিবারের জন্য নয়, বরং সমগ্র সমাজের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য অপরিহার্য।

গত ৩১ মে ঢাকার মিরপুর-১১-এর একটি অভিজাত ফ্ল্যাট থেকে উদ্ধার করা হয় ৭৫ বছর বয়সী নূরজাহান বেগমের অর্ধগলিত মরদেহ। তার পাশেই ছিল সন্তানদের পাসপোর্ট সাইজের ছবি, সার্টিফিকেটের ফ্রেম–এক যুগ্ম সচিব, এক বুয়েট শিক্ষক, এক কানাডাপ্রবাসী ছেলে আর এক স্কুলশিক্ষিকা কন্যার মা। কিন্তু মা মারা গেছেন কবে? কেউ জানেন না। গন্ধ ছড়ালে প্রতিবেশীরা ফোন দেয় ৯৯৯-এ। এ ঘটনা কোনো ইংরেজি থ্রিলারের দৃশ্য নয়। এ আমাদের সমাজের সাদা-কালো সিসিটিভির ফুটেজ–যেখানে বড় পদ, বিদেশি ডিগ্রি, চমকানো সিভির নিচে পুঁতে রাখা আছে এক প্রবীণের নিঃশব্দ যন্ত্রণা, অবহেলা আর অপেক্ষার অবসান।

বাংলাদেশে ‘পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ আছে। আইনটি স্পষ্ট বলেছে: সন্তানকে মায়ের ভরণপোষণ দিতেই হবে–খাদ্য, বস্ত্র, চিকিৎসা, বাসস্থান, এমনকি ‘সঙ্গ’ দেওয়াও আইনি দায়িত্ব। পিতা-মাতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের বৃদ্ধাশ্রমে পাঠানো যাবে না। অমান্য করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা ৩ মাসের কারাদণ্ড। এসব বিধান দেখে মনে হয়, নূরজাহান বেগমের সন্তানদের জেলে যাওয়া উচিত। কিন্তু প্রশ্ন হলো–কে যাবে আদালতে? আইনে বলা আছে, শুধু ভুক্তভোগী বাবা বা মা নিজেই অভিযোগ করতে পারবেন। যে মা মারা গেছেন, তিনি তো আর মামলা করবেন না। অথচ বেঁচে থাকতেও তিনি কি পারতেন? নিজের সন্তান–যুগ্ম সচিব আর বুয়েট শিক্ষক, যাদের মুখে সমাজের ‘আইন’ ও ‘নীতি’ উচ্চারিত হয়, তাদের বিরুদ্ধে থানায় গিয়ে লিখিত অভিযোগ দেওয়া, কোন বৃদ্ধ বাবা-মা সেটা পারেন?

এটাই এই আইনের মারাত্মক দুর্বলতা। বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা একটি ‘নীরব অপরাধ’–কারণ ভুক্তভোগী নিজে প্রায়শই শারীরিক, মানসিক বা আর্থিকভাবে অসহায়; আর সামাজিক লজ্জায় চুপ করে থাকেন। নূরজাহান বেগমের মরদেহ পরীক্ষা করলে আইনের চেয়ে বেশি ধরা পড়ে আমাদের মূল্যবোধের পচন। যে দেশের সংবিধান বলে জনগণের মৌলিক অধিকারের কথা, সেই দেশের বৃদ্ধ বাবা-মায়ের অধিকার কেবল কাগজে বন্দি হবে না–এ দাবি এখন সময়ের।

লেখক: ডিন, স্কুল অব ল, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় 
[email protected]