সিলেটে পরিবেশ ধ্বংস মোকাবিলায় বন্ধ করা পাথরমহাল খুলে দেওয়ার দাবিতে একাট্টা হয়েছেন বিএনপি-জামায়াত ও এনসিপির নেতারা। এর মধ্যে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। দোটানা মতামত এনসিপির।
তারা বলছেন, ‘আমরা চাই মহাল (কোয়ারি) খুলে দেওয়া হোক। পরিবেশও রক্ষা হোক।’ আর জামায়াতের পক্ষ থেকে দৃঢ়তা নিয়ে বলা হয়েছে, ‘আমরা দলীয় সিদ্ধান্ত নিয়েই পাথরমহাল খোলার দাবিতে একাত্ম হয়েছি’।
বুধবার (২৫ জুন) জামায়াত ও এনসিপি নেতাদের সঙ্গে খবরের কাগজ যোগাযোগ করলে এমন প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। একইভাবে বিএনপিতেও রয়েছে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। জেলার নেতাদের ডিঙিয়ে কেন মহানগর বিএনপির নেতারা একাত্ম হলেন, এ নিয়ে ভেতরে ভেতরে চলছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। তবে দাবির প্রতি একাট্টা হওয়া বিএনপির নেতারা এ নিয়ে কিছু বলছেন না। ফোনে যোগাযোগ করলে তারা কথা বলতে অপারগতা প্রকাশ করেন।
এ বিষয়ে সিলেট বিভাগের সাংগঠনিক দায়িত্বপ্রাপ্ত বিএনপির কেন্দ্রীয় সহসাংগঠনিক সম্পাদক মিফতাহ্ সিদ্দিকী খবরের কাগজকে বলেন, ‘এটা দলীয় একাত্মতা নয়। যারা এ দাবির প্রতি একাত্ম হয়েছেন, ব্যক্তিগতভাবে হয়েছেন। আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, বিএনপি দাবি বা আন্দোলনে একাত্ম না হয়ে জনতার ম্যান্ডেট নিয়ে ক্ষমতাসীন হলে এ ব্যাপারে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেবে।’
সিলেট জেলায় সায়রাত মহালের ব্যবস্থাপনায় ছয়টি পাথরমহাল রয়েছে। এগুলো থেকে পাথর উত্তোলনের জন্য শুরু হয়েছিল বোমা মেশিনের ব্যবহার। এতে ভূগর্ভের স্তর পরিবর্তনের শঙ্কা দেখা দিলে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে পরিবেশ অধিদপ্তর এই মেশিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ভূমিধসে শতাধিক শ্রমিকেরও মৃত্যু হয়। শ্রমিকরা তখন সনাতন পদ্ধতিতে পাথর উত্তোলনের দাবি জানান। কিন্তু দেশের পাথর, সিলিকা বালু, নুড়ি পাথর, সাদা মাটি মহালগুলোর ব্যবস্থাপনাসংক্রান্ত সভায় পরিবেশের সংকট বিবেচনায় ৫১টি পাথরমহালের মধ্যে ১৭টির ইজারা স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত হয়। এই স্থগিতাদেশের মধ্যে সিলেট বিভাগের ছয়টি পাথরমহাল রয়েছে। এর মধ্যে পাঁচটি সিলেটের।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, জাফলংকে সংকটাপন্ন ঘোষণা দিয়ে ২০১৫ সাল থেকে ইজারা কার্যক্রম বন্ধ রাখা হয়। এরপর করোনাকালে শাটডাউন করে ২০২০ সালে বাকি চারটি পাথরমহালের ইজারা স্থগিত রাখা হয়েছে। খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টাকে নিয়ে গত ১৪ জুন পরিবেশ ও জলবায়ু উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান জাফলং পরিদর্শন করে বলেছেন, ‘সিলেটের পাথরমহাল আর লিজ দেওয়া হবে না।’
উপদেষ্টার এ সিদ্ধান্তের পর সংবাদ সম্মেলন করে আন্দোলনে নামে সিলেটে পাথরসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী, মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদ। সংগঠনটি ১৮ জুন সংবাদ সম্মেলন করে। এরপর গত মঙ্গলবার মানববন্ধন করে টানা কর্মসূচি ঘোষণা করে। কর্মসূচির মধ্যে রয়েছে ২৮ জুন সিলেটের সব পাথর ও বালুমহাল থেকে লোড-আনলোড পরিবহন কর্মবিরতি, ২ জুলাই থেকে অনির্দিষ্টকালের পণ্য ও গণপরিবহন কর্মবিরতি। এতে একাত্মতা প্রকাশ করে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি।
জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সিলেট জেলার আহ্বায়ক নাজিম উদ্দিন সাহান খবরের কাগজকে বলেন, ‘পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়ার দাবিতে ব্যবসায়ী, মালিক-শ্রমিক ঐক্য পরিষদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে মানববন্ধন করা দলীয় সিদ্ধান্ত না। এখানে জামায়াত, বিএনপি, এনসিপিসহ সব রাজনৈতিক দল ছিল। আমাদের সিলেটের হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান নেই। পাথর কোয়ারি বন্ধ হওয়ার কারণে শত শত শ্রমিক কষ্ট করছেন। তারা উপার্জন করতে পারছেন না। আমাদের সিলেটের মানুষের ম্যান্ডেন্ট থেকেই আমরা মানববন্ধনে গিয়েছি।’
এক প্রশ্নের জবাবে এনসিপি নেতা সাহান বলেন, ‘এটা কোনো কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত না। তবে আমি চাই পরিবেশ ঠিক থাকুক। পরিবেশ ঠিক রেখে কীভাবে পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়া যায় সেই ব্যবস্থা যেন সরকার করে। আমরা চাই, কোয়ারি খুলে দেওয়া হোক এবং পরিবেশও রক্ষা হোক। দুটিই আমাদের দরকার। পরিবেশ ধ্বংস করার পক্ষে আমরা না।’
এদিকে পাথরমহাল খুলে দেওয়ার দাবি জামায়াতের দলীয় দাবি বলে জানিয়েছেন সিলেট মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মোহাম্মদ শাহজাহান আলী। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা দলীয়ভাবে চাই সিলেটে পাথর কোয়ারি খুলে দেওয়া হোক। এখানে অসংখ্য মানুষের রুটিরুজির ব্যাপার আছে। আমরা মানবিকভাবে এটার পক্ষে। ভারত থেকে ঠিকই পাথর তোলা হচ্ছে, কিন্তু পরিবেশের দোহাই দিয়ে আমাদের পাথর তোলা বন্ধ। আমরা বলছি, পাহাড় কেটে পাথর উত্তোলন করা যাবে না। নদীর মধ্যে যে স্বাভাবিকভাবে পাথর আসে সেটা উত্তোলন হোক। নদীর গতিপথ ঠিক হোক। পাহাড় কেটে, মাটি খুঁড়ে পাথর উত্তোলন আমরা চাই না।’
পাথর আমদানি বন্ধের দাবি জানিয়ে জামায়াতের এই নেতা বলেন, ‘এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে একই পাথর কেনা হচ্ছে। তাই আমরা চাই আমাদের দেশের উৎপাদন বাড়িয়ে এলসি বন্ধ হোক। পরিবেশের ক্ষতি হোক এটা আমরা চাই না।’
পাথরমহাল খোলার দাবিটি কেবল পরিবেশ ধ্বংসের নয়, আদালত অবমাননার শামিল বলে মনে করছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) সিলেট বিভাগীয় সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট শাহ সাহেদা।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘অবৈধ কোনো কার্যক্রম জোর করে চালালেও বৈধতা পাওয়া যায় না। বর্তমানে সিলেটের পরিবেশ সংকটাপন্ন এলাকাগুলোতে যা হচ্ছে, তা চলমান থাকলে পরিবেশের ভয়াবহ ক্ষতি হবে। আর পরিবেশের ক্ষতি হলে জীববৈচিত্র্য, যা ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়েছে সেটা আরও ধ্বংস হবে। ওই সব এলাকার ভূখণ্ড নষ্ট হবে। ব্যাপকহারে জনবসতি নিশ্চিহ্ন হবে। প্রাণহানির ঘটনা বাড়তেই থাকবে। পাশাপাশি সামাজিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ভারসাম্য নষ্ট হবে। পাথর তোলা ও অবৈধ ব্যবসায় কিছুসংখ্যক মানুষের কাছে টাকা-পয়সা বেশি থাকবে এবং কিছুসংখ্যক মানুষ আজীবনই শ্রমিক থাকবেন।’