একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ এবং বাহাত্তরের সংবিধানের চার মূলনীতির প্রশ্নে আপস করার প্রস্তাবনা আসায় জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে যাবেন না বাম দলগুলোর নেতারা।
বৃহস্পতিবার (১৬ অক্টোবর) রাজধানীর পুরানা পল্টনে সিপিবি কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে এ কথা জানিয়েছেন সিপিবি, বাসদ, বাসদ (মার্কসবাদী), বাংলাদেশ জাসদের নেতারা।
সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন, সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন, বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশীদ ফিরোজ, বাসদের (মার্কসবাদী) সমম্বয়ক মাসুদ রানা, বাংলাদেশ জাসদের স্থায়ী কমিটির সদস্য ডা. মুশতাক হোসেন সংবাদ সম্মেলনে নানা প্রশ্নের জবাব দেন।
লিখিত বক্তব্যে তারা বলেন, ‘সংবিধানে বিদ্যমান চার মূলনীতি- গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতীয়তাবাদ এবং ১৫০(২) অনুচ্ছেদের ক্রান্তিকালীন বিধানের তফসিল পরিবর্তনে সম্মতি দিতে বলা হয়েছে আমাদের। জুলাই সনদের প্রস্তাবনায় এসব বিষয়ে আদালতে প্রশ্ন করা যাবে না এমন অঙ্গীকারও করতে বলা হয়েছে। এ ধরনের সনদে আমরা স্বাক্ষর করতে পারি না।’
জুলাই সনদের প্রস্তাবনায় সংবিধানের ১৫০(২) অনুচ্ছেদে ক্রান্তিকালীন বিধানে ষষ্ঠ তফসিলে থাকা স্বাধীনতার ঘোষণা ডিক্লারেশন অব ইনডিপেন্ডেন্সে এবং সপ্তম তফসিলে থাকা প্রক্লেমেশন অব ইনডিপেন্ডেন্স বাদ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এর বিরোধিতা করে বাম নেতারা বলেন, ‘যা আমাদের স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি সেটা বাদ দিলে তো বাংলাদেশের অস্তিত্বই থাকে না। অথচ জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে যুক্ত করার কথা বলা হচ্ছে।’
বাম নেতারা বলেন, ‘সনদের প্রথম অংশে পটভূমিতে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার ইতিহাস এবং বাংলাদেশের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাস সঠিকভাবে উপস্থাপিত হয়নি। আমরা বারবার সংশোধনী দিলেও সেগুলো সন্নিবেশিত করা হয়নি।’
অন্তর্বর্তী সরকার সংস্কারের জন্য ১১টি কমিশন গঠন করে। প্রথমে গঠিত ৬টি সংস্কার কমিশনের সুপারিশ নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে পর্যায়ক্রমে আলোচনা ও মতামত নেওয়া হয়। পরে প্রধান উপদেষ্টার নেতৃত্বে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন গঠন করা হয়। দ্বিতীয় পর্যায়ে আলোচনা এ বছরের ৩ জুন শুরু হয়ে ৩০ জুলাই শেষ হয়। কয়েকটি দলের দাবির প্রেক্ষিতে তৃতীয় পর্যায়ে জুলাই জাতীয় সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে আবারও আলোচনায় বসে ঐকমত্য কমিশন। টানা ৫ দিন আলোচনা হয়ে ৮ অক্টোবর শেষ হয়। সর্বশেষ গত ১৫ অক্টোবর (বুধবার) বিকেলে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন সভা আহ্বান করে। প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এ সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন। এ সভায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দিলেও বাম দলগুলোর কাউকে আহ্বান জানানো হয়নি।
বাম নেতাদের অভিযোগ, ‘প্রধান উপদেষ্টার সামনে ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ বন্ধ করতেই এ ধরনের অন্যায্য আচরণ করা হয়েছে।’
বাম নেতারা সংবাদ সম্মেলনে জানান, গত ১৪ অক্টোবর জুলাই সনদের চূড়ান্ত কপি তারা হাতে পেয়েছেন। তারা দেখতে পান,
সেখানে ‘সর্বসম্মত’ বিষয় ছাড়াও ‘নোট অব ডিসেন্ট’ (ভিন্নমত) দেওয়া প্রস্তাবগুলো সনদে যুক্ত করা হয়েছে। বাম দলগুলোর দেওয়া ‘নোট অব ডিসেন্টগুলোর’ কারণও যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি।
জুলাই সনদ অঙ্গীকারনামার ২নং অনুচ্ছেদে জুলাই সনদ সংবিধানের তফসিলে বা যথোপযুক্ত স্থানে যুক্ত করার কথা বলা হয়েছে। বাম নেতারা সর্বসম্মত জুলাই সনদ সংবিধানে যুক্ত করার পক্ষে। কিন্তু নোট অব ডিসেন্টসহ সনদ কীভাবে সংবিধানে যুক্ত হবে, তা বাম নেতাদের কাছে বোধগম্য নয়।
বাম নেতারা বলেন, ‘জুলাই সনদ পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ভিন্নমত থাকলে তা বাস্তবায়নের অঙ্গীকার কীভাবে সম্ভব তা আমাদের কাছে বোধগম্য নয়।’
জুলাই সনদ নিয়ে আদালতের দ্বারস্থ হওয়া যাবে না মর্মেও বিধান লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এ বিধান নাগরিকের ‘মৌলিক ও গণতান্ত্রিক অধিকার পরিপন্থি’ বলে মনে করেন বাম নেতারা।
সনদের পটভূমিতে অভ্যুত্থান-পরবর্তী সংবিধানের ১০৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সুপ্রিম কোর্টের রেফারেন্স নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হওয়ার কথা ছিল। আগে পাঠানো সনদের খসড়ায় সে কথা উল্লেখ থাকলেও চূড়ান্ত সনদে ১০৬ অনুচ্ছেদের কথা বাদ দেওয়া হয়েছে। এ নিয়ে বাম নেতাদের আপত্তি রয়েছে।
শুক্রবার (১৭ অক্টোবর) বিকেলে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় জুলাই সনদে স্বাক্ষর অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। শুধু বাম দলগুলোই নয়, জুলাই সনদ স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) যাবে না।
জয়ন্ত/এসজি/