নীলফামারী-৪ (সৈয়দপুর-কিশোরগঞ্জ) আসনের ভোটের হিসাব এখনো বেশ জটিল। বিএনপি, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের পাশাপাশি এখানে শক্তিশালী স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। আপাতদৃষ্টিতে ভোটের মাঠে ত্রিমুখী লড়াই মনে হলেও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের কারণে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতা বহুমাত্রিক রূপ নিয়েছে। এমন অবস্থায় নির্বাচনি লড়াইয়ে কোন প্রার্থী শেষ পর্যন্ত এগিয়ে থাকবেন তা নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়েছে। আসনটিতে অবাঙালি, হিন্দু ও নতুন ভোটাররা জয়-পরাজয়ের মূল ফ্যাক্টর। তারা রাজনৈতিক দলের চেয়ে প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, সামাজিক সম্পর্ক এবং এলাকায় উপস্থিতিকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই আসনের ভোটার সংখ্যা ৪ লাখ ৫১ হাজার ৮১৪ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ২৬ হাজার ৭২৮ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ২৫ হাজার ৮১৪ জন ও তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার পাঁচজন। আসনটি বরাবরই জাতীয় পার্টি ও আওয়ামী লীগ জোটের দখলে ছিল। ভোটারদের একটি বড় অংশ অবাঙালি।
তারা জানিয়েছেন, ভোটাররা এবার শুধু দলীয় পরিচয়ের ওপর ভরসা রাখতে চাইছেন না। অনেকের মধ্যেই দীর্ঘদিনের রাজনীতি নিয়ে হতাশা রয়েছে। একই সঙ্গে রয়েছে পরিবর্তনের প্রত্যাশা। নির্বাচনের আগে প্রার্থীরা ক্যাম্পবাসীর উন্নয়নে অনেক প্রতিশ্রুতি দেন। কিন্তু বাস্তবে পূরণ করেন না। তারা এমন প্রার্থীকে বিজয়ী করবেন যিনি নিয়মিত এলাকায় থাকবেন। প্রয়োজনে তার কাছে যাওয়া যাবে। তাদের কথা শুনবেন। তাদের জীবনমান উন্নয়নে কাজ করবেন। এমন প্রেক্ষাপটে দলীয় প্রার্থীর চেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দিকে আগ্রহ বেশি দেখা যাচ্ছে।
সৈয়দপুরে অবাঙালিদের ২১টি ক্যাম্প রয়েছে। এসব ক্যাম্পে বসবাসকারীদের জীবনমান উন্নয়নে একটি কমিটি কাজ করে। ওই কমিটির সভাপতি মাজিদ ইকবাল বলেন, ‘আমরা এমন জনপ্রতিনিধি চাই, যিনি সব সময় এলাকায় থাকবেন। আমাদের সমস্যার কথা শুনে তা সমাধানে উদ্যোগী হবেন।’
আসনটির ফল নির্ধারণে তরুণ ভোটাররা বড় ভূমিকা রাখতে পারেন। কর্মসংস্থানের অভাব ও প্রশিক্ষণ সংকটের কারণে এ অঞ্চলের তরুণরা দীর্ঘদিন ধরে বেকারত্বের সমস্যায় ভুগছেন। বিভিন্ন সময় তাদের দাবিতে আইটি-কারিগরি প্রশিক্ষণ, ছোট শিল্প গড়ে তোলা এবং উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি উঠে আসে। তারা বলছেন, শুধু স্লোগান নয়, যিনি বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে পারবেন, তরুণদের সঙ্গে বসে কথা বলবেন, এলাকায় থেকে কাজ করবেন তাকেই ভোট দেওয়া হবে।
এই আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী আব্দুল গফুর সরকার একজন অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ। কর্মী ও সমর্থকদের সরব উপস্থিতি তার সবচেয়ে বড় শক্তি। তবে এবার বিএনপির ভোটব্যাংক ভাগ হয়ে যাওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। কারণ দলটির দুই মনোনয়নপ্রত্যাশী স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে রয়েছেন। বিএনপির একাধিক সমর্থক বলছেন, তারা দলকে সমর্থন করলেও স্থানীয়ভাবে যিনি বেশি গ্রহণযোগ্য, তাকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অন্যদিকে জাতীয় পার্টির প্রার্থী সিদ্দিকুল আলম সিদ্দিক উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার ধারাবাহিকতার কথা তুলে ধরছেন। তার সমর্থকদের দাবি, অতীতে এই আসনে যে উন্নয়ন হয়েছে, তার সুফল মানুষ এখনো পাচ্ছেন। জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী হাফেজ আব্দুল মুনতাকিম দুর্নীতিমুক্ত নেতৃত্ব ও সুশাসনের বার্তা দিচ্ছেন। বিশেষ করে কিছু তরুণ ও ধর্মপ্রাণ ভোটারের মধ্যে তার বক্তব্য প্রভাব ফেলছে বলে মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে।
তবে আসনটিতে স্বতন্ত্র প্রার্থীরা বড় ফ্যাক্টর হয়ে উঠেছেন। ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী রিয়াদ আরফান সরকার রানা তরুণ ও অবাঙালি ভোটারদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগকে তার শক্তি হিসেবে দেখছেন। তা ছাড়া তার বাবা সাবেক সংসদ সদস্য আমজাদ হোসেন সরকার ভজে দীর্ঘদিন বিএনপি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। একাধিকবার পৌর মেয়র নির্বাচিত হওয়ায় তার বাবার স্থানীয় ভোটব্যাংক রয়েছে। তারা এখন ছেলের দিকে ঝুঁকছেন। এ ছাড়া মোটরসাইকেল প্রতীকের প্রার্থী মামুন অর রশিদও তরুণ ভোটারদের সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। তরুণ ভোটাররা মনে করছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী বিজয়ী হলে দলীয় চাপের বাইরে থেকে এলাকার জন্য কাজ করতে পারবেন। এই ভাবনাই স্বতন্ত্রদের প্রতি তাদের আস্থা বাড়াচ্ছে।