এ দেশে শিক্ষা সংকট চিরকালীন। সরকার আসে, সরকার যায়। শিক্ষাব্যবস্থা যে তিমিরে ছিল, সে তিমিরেই রয়ে যায়। ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী সময়ে শিক্ষক সমাজ আশা করেছিল এবার কোনো পরিবর্তন আসবে কিন্তু বাস্তবতা আরও খারাপ। শিক্ষার নানামুখী সংকট নিয়ে শিক্ষক সমাজের চলতি বছর আন্দোলনের খুব জনপ্রিয় স্লোগান ছিল ইউনূস তোমার বাংলায় শিক্ষক কেন মার খায়? বেসরকারি শিক্ষার নানামুখী সংকট নিয়ে ডাকা আন্দোলনে এই স্লোগান প্রকম্পিত করছিল চারপাশ। শিক্ষকরা মার খান। সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান, লাঠিচার্জ করা হয় শিক্ষকদের ওপর। পৃথিবীর কোনো সভ্য দেশে শিক্ষকদের সঙ্গে এমন ন্যক্কারজনক আচরণ করা হয় কি না সেটা অনুসন্ধানের দাবি রাখে। কোনো রাজনৈতিক সরকারের বাইরে পুলিশের এমন আচরণ অনভিপ্রেত। শিক্ষকের অপরাধ সে তার ন্যায্যতা আর অধিকারের প্রশ্নে আপসহীন। সে শ্রমদাস নয়, শ্রমের বিনিময়ে সে পারিশ্রমিক চায়। যে দেশে ক্ষমতাসীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, আইন উপদেষ্টা, শিক্ষা উপদেষ্টা অত্যন্ত জনপ্রিয় ডাকসাইটে শিক্ষক হওয়ার পরও শিক্ষক রাজপথে মার খান, এটি একটি সভ্য সমাজের জন্য চরম অবমাননাকর ও অমানবিক। এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে এ দেশের রাজপথে, যা অতীতের সব ঘটনাকে ছাড়িয়ে গেছে। শিক্ষায় বহুমুখী সংস্কার পরিকল্পনা নিয়ে এই সরকার ক্ষমতায় আসলেও শিক্ষকদের সমস্যা সমাধানে সরকার আন্তরিক নয়। উল্টো শিক্ষকদের ওপর অতীতের সব বর্বরতাকে হার মানায় সরকারের শিক্ষক দমননীতি। যেকোনো পেশাজীবীর চেয়ে শিক্ষকরা আলাদা- তারা যদি রাজপথে মার খান, তবে সেই লজ্জা ও অপমান গোটা রাষ্ট্রের ওপর বর্তায়।
গত দুই দশকে শিক্ষার কোনো সমস্যাই সরকার আমলে নেয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার শিক্ষকদের ওপর গরম পানি ছুড়ে ও লাঠিচার্জ করে জানিয়ে দেয় তারা শিক্ষার জন্য নিবেদিত নয়।
বর্তমান সরকারও কোনো অংশে কম নয়। তারা টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, জলকামান আর লাঠিচার্জ করে জানিয়ে দিলেন শিক্ষা সংস্কার আর বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠায় তারাই সবচেয়ে বড় বাধা। এখানে বলে রাখা দরকার বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়েই জন্ম নিয়েছে এই সরকার। শিক্ষক কেন ৩২ বছর বেতন পায় না। এই বৈষম্য কি তারা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। এটাকে বিশ্বে নজিরবিহীন এক ঘটনা বলে ইতোমধ্যে জাতিসংঘ উল্লেখ করেছে।
দীর্ঘ ৩২ বছরে বেসরকারি কলেজ অনার্স শিক্ষকরা বেতন পাননি। হাইকোর্টের রায় নিজেদের পক্ষে ছিল, মন্ত্রণালয়ের সুস্পষ্ট নির্দেশনা, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সুপারিশ থাকলেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাপক ব্যবসায়িক স্বার্থ থাকাই সেটা আলোর মুখ দেখেনি।
চলতি বছর জুলাই বিপ্লবে সরকার পতন হলে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসলে দীর্ঘদিন বঞ্চিত সব শিক্ষকের প্রত্যাশা বেড়ে যায় বহুগুণে। জাতীয়করণ, বদলি, বেতন বৃদ্ধি, এমপিওসহ নানা ইস্যুতে তারা রাজপথে সোচ্চার হয় কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, আওয়ামী লীগ আমলের চেয়েও চলমান সরকারের আমলে শিক্ষকরা বেশি নিগ্রহের শিকার হন।
গত ১২ অক্টোবর প্রেস ক্লাবের মূল ফটকের সামনে আন্দোলনরত শিক্ষকদের ওপর শাহবাগ থানার ওসি মাসুদ ট্যাংক, জলকামান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে। শুধু তাই নয়, শিক্ষকদের এই যৌক্তিক আন্দোলনকে নস্যাৎ করতে ওসি মাসুদ টিয়ার শেল, সাউন্ড গ্রেনেড, লাঠিচার্জ করে তারা শিক্ষকদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। ন্যায্যতা আর মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় তারা সরকারের সহযোগী হতে চায়। তাদের ন্যায্য দাবিকে উল্টো চরম অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দেওয়াটা চরমভাবে মানবতা বিবর্জিত কাজ। একজন শিক্ষক একটা জাতি গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষায় সব শিক্ষকের অবদান অনস্বীকার্য।
শিক্ষা এবং শিক্ষকই যদি জাতিকে আলোর পথ দেখায় তাহলে শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে জাতি আলোকিত হবে কীভাবে! আর ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্ন তো ইউটোপিয়া। একজন শিক্ষকই যখন আরেকজন শিক্ষকের বেদনা বুঝতে অক্ষম সেখানে বিগত সরকারগুলোর আচরণ আর আগামীর সরকারের কাছ থেকে আরও ভালো কিছু আশা করা নিছক বাতুলতা ছাড়া কিছুই নয়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও শিক্ষা গবেষক