বাংলাদেশে আজ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গতিশীল অর্থনীতির দেশ; আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মতে, বর্তমানে বাংলাদেশের জিডিপির পরিমাণে প্রায় ৫২০ বিলিয়ন ডলার যা দক্ষিণ এশিয়ায় দ্বিতীয় বৃহত্তম। স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশটিকে যখন বলা হতো ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ তখন দেশের জিডিপির পরিমাণ ছিল ৮.৭৫ বিলিয়ন ডলার। সেই তলাবিহীন ঝুড়ি’ থেকে বাংলাদেশ আজ এশিয়ার অন্যতম উদীয়মান অর্থনীতির দেশ হিসেবে পরিচয় লাভ করেছে। এ টেকসই উন্নয়নের অগ্রযাত্রায় অগ্রসর হয়ে বাংলাদেশ আজ নিম্ন-মধ্যম আয়ের দেশ থেকে মধ্যম আয়ের দেশে উন্নীত হওয়ার পথে।
ফলে ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর বাংলাদেশ এলডিসি উত্তরণ সম্পন্ন করবে এবং বাংলাদেশের স্থান হবে মধ্যম আয়ের দেশের কাতারে, যেটি আমাদের জন্য বৈশ্বিক পর্যায়ে একটি শক্তিশালী ভাবমূর্তি প্রতিষ্ঠা করবে। বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রায় বৈদেশিক বিনিয়োগ (FDI) একটি গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছে। যদিও বিদেশি মূলধন, প্রযুক্তি ও ব্যবস্থাপনাগত জ্ঞান দেশের উৎপাদনশীলতা বাড়াতে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে ও বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ শক্তিশালী করতে ভূমিকা রেখেছে তবুও বাস্তবতা হচ্ছে বাংলাদেশের বৈদেশিক বিনিয়োগের পরিমাণ এখনো প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF)-এর তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রতি বছর গড়ে ২ থেকে ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিমাণ বৈদেশিক বিনিয়োগ আসে, যা ভিয়েতনাম বা ইন্দোনেশিয়ার মতো প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম।
জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা (UNCTAD)-এর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বৈদেশিক বিনিয়োগে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারত ও ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক পেছনে অবস্থান করছে বাংলাদেশ, ফলে বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় এ দেশগুলো বাংলাদেশের চেয়ে সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ আকর্ষণের মূল ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে তৈরি পোশাকশিল্প, টেলিযোগাযোগ, বিদ্যুৎ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও তথ্যপ্রযুক্তি খাত বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। এ সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নীতিগত অনিশ্চয়তা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল অবকাঠামো ও অনিশ্চিত আইনি কাঠামোর কারণে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এখনো বাংলাদেশে বড় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যথেষ্ট সতর্ক অবস্থান বজায় রাখছেন। বিনিয়োগের এ তুলনামূলক পিছিয়ে থাকা চিত্রটি কেবল পরিসংখ্যান নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক রূপান্তরের পথে বিদ্যমান চ্যালেঞ্জগুলোকেও নির্দেশ করে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ ঘোষিত দীর্ঘমেয়াদি টেকসই উন্নয়নের যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয়েছে, বাংলাদেশ এখন ঘোষিত সেই টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs) বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জের মুখে। এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু দেশি মূলধন নয়, বৈদেশিক মূলধনেরও প্রয়োজন রয়েছে। বৈদেশিক বিনিয়োগ কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিই নয়, বরং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি এবং ন্যায্য শ্রমনীতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। উদাহরণস্বরূপ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশকে জ্বালানি নিরাপত্তার পাশাপাশি কার্বন নিঃসরণ হ্রাসের পথে সহায়তা করতে পারে। তেমনি, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে বহুজাতিক কোম্পানির বিনিয়োগ তরুণদের জন্য উচ্চ দক্ষতার কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারে- যা ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’-এর সুফলকে কাজে লাগাতে সহায়ক হবে।
বাংলাদেশে বিনিয়োগের প্রধান বাধাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। একটি বিদেশি কোম্পানিকে বিনিয়োগ করতে হলে একাধিক মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের অনুমোদন নিতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ ও ব্যয়বহুল। ব্যবসার পরিবেশ উন্নয়নে ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ চালু হলেও এর কার্যকারিতা এখনো সীমিত। এ ছাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও পরিবহন খাতে অবকাঠামগত সীমাবদ্ধতা; শিল্পাঞ্চলে বিদ্যুৎ ঘাটতি, বন্দরে জট ও সড়ক যোগাযোগে অদক্ষতা ফলে বিনিয়োগকারীরা অনেক ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত হন, পাশাপাশি দুর্বল আইনি কাঠামো ও নীতির অস্থিরতা বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ঝুঁকি সৃষ্টি করে। এবং ব্যবসার নিয়মকানুন ঘন ঘন পরিবর্তন, ট্যাক্স নীতিতে অস্পষ্টতা, জমির মালিকানা-সংক্রান্ত অনিশ্চয়তা বিনিয়োগে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দুর্নীতি ও স্বচ্ছতার ঘাটতির ফলে বিদেশি উদ্যোক্তাদের আস্থা হ্রাস পায় এবং বিনিয়োগ অন্যত্র স্থান্তরিত হয়। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের সূচক অনুযায়ী, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশে ব্যবসায়িক স্বচ্ছতার মাত্রা এখনো নিচু।
বর্তমান বৈশ্বিক অর্থনীতি এক ধরনের ‘বিনিয়োগ প্রতিযোগিতার যুগে’ প্রবেশ করেছে। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যেখানে সাশ্রয়ী শ্রম ও অনুকূল ব্যবসা পরিবেশ পায়, সেখানে তাদের উৎপাদন ঘাঁটি স্থানান্তর করছে। ফলে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ড বা ভারত এখন এশিয়ার বিনিয়োগ আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে। এসব বহুজাতিক কর্পোরেশনগুলকে বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হলে আমাদের অর্থনীতিক এবং অবকাঠামোগত খাতগুলকে ঢেলে সাঁজাতে হবে। দক্ষিণ এশিয়ার এসব দেশের তুলনায় আমাদের শ্রম ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হলেও উৎপাদন দক্ষতা, লজিস্টিক সুবিধা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার পাশাপাশি, রপ্তানি বৈচিত্র্যহীনতা ও প্রযুক্তিগত পশ্চাদপদতা বিনিয়োগকারীদের বিকল্প এ দেশগুলোর দিকে ঝুঁকতে বাধ্য করছে।
আতএব, বিনিয়োগ বাড়াতে হলে শুধু প্রণোদনা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি জরুরি। এজন্য আমরা কয়েকটি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করতে পারি। প্রথমত, বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (BIDA) ও অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষকে (BEZA) আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে। ‘ওয়ান স্টপ সার্ভিস’ ডিজিটাল ও দ্রুতগতিতে পরিচালনা করা গেলে বিনিয়োগকারীরা আস্থাশীল হবেন। দ্বিতীয়ত, করনীতিতে স্থিতিশীলতা ও স্বচ্ছতা আনতে হবে। একদিকে বিনিয়োগবান্ধব ট্যাক্স রেয়াত দিতে হবে, অন্যদিকে রাজস্ব ক্ষতি রোধে নীতিমালা নির্দিষ্ট মেয়াদে পর্যালোচনা করতে হবে। তৃতীয়ত, গণপরিবহন ও বন্দর অবকাঠামো আধুনিকীকরণ করতে হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর (SEZs) কার্যক্রম দ্রুত বাস্তবায়ন ও নির্ভরযোগ্য জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে পারবেন। চতুর্থত, বিচার ব্যবস্থা ও প্রশাসনিক জবাবদিহি শক্তিশালী করতে হবে এবং বিনিয়োগ বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত ও নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা চালু করতে হবে যেটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে সক্ষম। সবশেষে, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি ও টেকসই শিল্পনীতি প্রণয়ন অপরিহার্য। বিদেশি বিনিয়োগকারীরা শুধু সস্তা শ্রম নয়, বরং দক্ষ ও প্রশিক্ষিত কর্মশক্তি চান। তাই কারিগরি শিক্ষা ও শিল্প প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন জরুরি।
সর্বোপরি, টেকসই উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির বিষয় নয়; এটি সামাজিক ন্যায়বিচার, পরিবেশ সুরক্ষা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির সঙ্গেও সম্পর্কিত। বাংলাদেশে বৈদেশিক বিনিয়োগকে তাই শুধু মুনাফাকেন্দ্রিক নয়, বরং নৈতিক ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে হবে। যেমন- সবুজ জ্বালানি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য পণ্য, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও কার্বন হ্রাসের মতো প্রকল্পে বিনিয়োগকে কর-রেয়াত দেওয়া যেতে পারে। এতে টেকসই উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের ব্র্যান্ড ইমেজও শক্তিশালী হবে। বাংলাদেশ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে বৈদেশিক বিনিয়োগের গুণগত বৃদ্ধি টেকসই উন্নয়নের গতিপথ নির্ধারণ করতে পারে। কর্মসংস্থান, প্রযুক্তি হস্তান্তর, রপ্তানি বৈচিত্র্য ও পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের মাধ্যমে এফডিআই দেশকে পরবর্তী উন্নয়ন ধাপে এগিয়ে নিতে পারে। তবে এজন্য প্রয়োজন কাঠামোগত সংস্কার, নীতির স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা। বাংলাদেশ যদি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরি করতে পারে, তবে বিদেশি মূলধন শুধু অর্থনীতিকেই নয়- পরিবেশ, সমাজ ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের উন্নয়নকেও টেকসই ভিত্তিতে রূপান্তরিত করবে।
লেখক: শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষাবর্ষ ২০২০-২১
shahidul46878@gmail