রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শরীরে মোহরে নবুয়াত ছিল। নবুয়াতের নিদর্শনস্বরূপ তার পিঠে দুই কাঁধের মাঝখানে একটি মোহরে নবুয়াত স্থাপিত ছিল, অনেক সাহাবিদের বর্ণনার আলোকে সেটা প্রমাণিত। তবে মোহরে নবুয়াতটি দেখতে কেমন ছিল, কেমন ছিল সেটার আকৃতি ও রঙ—তা নিয়ে বেশ কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। হাদিসের আলোকে পাঁচটি বর্ণনার কথা তুলে ধরা হলো—
১. হাজালা পাখির ডিম বা পর্দার বোতামের মতো: সাইব ইবনে ইয়াজিদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘...এরপর রাসুলুল্লাহ (সা.) অজু করলেন এবং আমি তাঁর অজুর পানি থেকে কিছুটা পান করলাম। অতঃপর আমি তাঁর পিঠের পেছনে দাঁড়ালাম এবং দুই কাঁধের মধ্যস্থলে থাকা মোহরে নবুয়াত দেখতে পেলাম। সেটা ছিল হাজালা পাখির ডিমের মতো।’ (বুখারি, হাদিস: ১৯০, ৩৫৪১; মুসলিম, হাদিস: ২৩৪৫)
হাদিসে উল্লিখিত শব্দদ্বয় ‘জিররিল হাজালা’ শব্দের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি (রহ.) লিখেছেন, ‘নববধূর জন্য তাঁবুর মতো ছোট্ট ঘরে যে পর্দা দিয়ে সজ্জিত করা হয় এবং তাতে বোতাম থাকে।’ (শরহুন নববি, ১৫/৯৮)
এ ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোহরে নবুয়াতের আকৃতি ছিল পর্দায় লাগানো বোতাম বা ঘুণ্টির মতো। আবার কোনো কোনো মুহাদ্দিস বলেছেন, হাদিসে উল্লিখিত ‘হাজালা’ মানে এক প্রকার পাখি আর ‘জিররুন’ মানে ডিম। সুতরাং রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোহরে নবুয়াতের আকৃতি ছিল পাখির ডিমের মতো।
২. লাল মাংসপিণ্ডের মতো: জাবের ইবনে সামুরা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর দুই কাঁধের মাঝখানে থাকা কবুতরের ডিমসদৃশ লাল মাংসপিণ্ডের মতো মোহরে নবুয়াত দেখেছি।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৩৪৪)
মোল্লা আলি কারি (রহ.) এ ব্যাপারে লিখেছেন, ‘মোহরে নবুয়াতের রঙ রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শরীরের অন্য অঙ্গের রঙের মতো ছিল।’ (মিরকাতুল মাফাতিহ, ৯/৩৬৯৮)
তার এ ব্যাখ্যা দ্বারা বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোহরে নবুয়াতটি মাংসপিণ্ড বা মাংসপিণ্ডসদৃশ রঙের ছিল।
৩. এক টুকরো বাড়তি গোশতের মতো: আবু নাদরা (রহ.) আবু সাইদ খুদরিকে (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোহরে নবুয়াতটি কেমন ছিল? তিনি (আবু সাইদ খুদরি) বললেন, তা ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পিঠে এক টুকরো বাড়তি গোশত। (তারিখুল বুখারি, ২/৮৫)
মোল্লা আলি কারি (রহ.) এ ব্যাপারে লিখেছেন, উল্লিখিত বর্ণনায় ব্যবহৃত আরবি শব্দের অর্থ হলো শরীরের উঁচু অংশ। (জামউল ওসাইল, ১/৭১)
এর দ্বারা বোঝা যায়, রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর মোহরে নবুয়াতটি শরীরের এক টুকরো বাড়তি গোশতের মতো ছিল।
৪. একগুচ্ছ কেশ বা চুলের মতো: আবু জায়েদ আমর ইবনে আনসারি (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে বলেন, হে আবু জায়েদ! আমার কাছে এসো এবং আমার পিঠে হাত বুলাও বা মাসাহ করে দাও। তখন আমি তাঁর পিঠে হাত বুলাতে বা মাসাহ করতে থাকলাম। একসময় আমার আঙুলগুলো মোহরে নবুয়াতের ওপর লেগে গেল। তাকে জিজ্ঞেস করা হলো, মোহরে নবুয়াতটি কেমন ছিল? তিনি বলেন, একগুচ্ছ কেশ বা চুল।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ২০৭৩২)
মোল্লা আলি কারি (রহ.) এ হাদিসের ব্যাখ্যায় লিখেছেন, সাহাবির বর্ণনা থেকে জানা যায়, তিনি মোহরে নবুয়াতটি দেখেননি; বরং হাতে ছুঁয়েছেন। সুতরাং মোহরে নবুয়াতের আশপাশে থাকা চুল তার হাতে লেগেছে। তবে মোহরে নবুয়াতটি চুলবিশিষ্ট অথবা তাতে চুল থাকা বা এর ওপরে চুল থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। (জামউল ওসাইল, ১/৬৪)
৫. মুষ্টিবদ্ধ আঙুলের মতো: আবদুল্লাহ ইবনে সারজিদ (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে গেলাম। তিনি তখন সাহাবিদের মধ্যে বসা ছিলেন। আমি কিছুটা ঘুরে তাঁর পেছনে গেলাম। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমার ইচ্ছা বুঝতে পেরে পিঠ থেকে চাদর সরিয়ে নিলেন। ফলে আমি তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মুষ্টিবদ্ধ আঙুলের মতো মোহরে নবুয়াতটি দেখতে পেলাম, যার আশপাশে আঁচিলের মতো কিছু তিলক শোভা পাচ্ছিল।’ (মুসলিম, হাদিস: ২৩৪৬)
সবগুলো বর্ণনার সারাংশ হলো—কেউ বলেছেন, মোহরে নবুয়াতটি ছিল মূলত একটি গোশতের টুকরা, যার রঙ ছিল রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর শরীরের রঙের মতো। কারও মতে, ছোট অবস্থায় সেটা ছিল কবুতরের ডিমের মতো এবং বড় অবস্থায় সেটা ছিল মুষ্টিবদ্ধ হাতের মতো। অনেকে সাহাবির বর্ণনা থেকে জানা যায়, মোহরে নবুয়াতটির আশপাশে তিলক ও কেশগুচ্ছ ছিল। (শামায়েলে তিরমিজি, ইমাম তিরমিজি, ব্যাখ্যা: সালেহ আল-মুনাজ্জিদ, অনুবাদ: ইলিয়াস খান, পথিক প্রকাশন, পৃষ্ঠা: ৫৮)
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক