মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান—মাকতাবাতুল আশরাফের স্বত্বাধিকারী। ঢাকার নবাবগঞ্জে বাড়ি, জন্ম ১৯৬৮ সালে। পড়াশোনার হাতেখড়ি কামরাঙ্গীরচরের মাদরাসা-ই-নূরিয়ায়। পাকিস্তানের জামিয়া ফারুকিয়া করাচি থেকে দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) এবং উচ্চতর আইন গবেষণা পড়েছেন। আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্য বিষয়ে পড়েছেন দারুল উলুম করাচি থেকে। তার প্রকাশক হওয়ার গল্প, কোন ধরনের বই প্রকাশে তিনি আগ্রহী, মানসম্মত বই প্রকাশ, ইসলামি বইয়ের জাগরণের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে, তরুণ-লেখক প্রকাশক সম্পর্কে তার ভাবনা ইত্যাদি বিষয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ
খবরের কাগজ: আপনি প্রকাশক হলেন কেন?
মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান: লেখালেখি শুরু করি হেফজখানায় পড়ার সময়। তখন ১৯৭৮ সাল। হাফেজ্জি হুজুর (রহ.)-এর প্রতিষ্ঠিত নূরিয়া মাদরাসায় পড়ি। সে সময় মাদরাসা থেকে ‘আল-আশরাফ’ নামে একটি দেওয়ালিকা বের হতো। সেখানে লিখেছি। পরে দেওয়ালিকাটি ম্যাগাজিন আকারে প্রকাশ হয়েছিল। সেখানেও আমার লেখা ছিল। ১৯৮২ সালে লালবাগ মাদরাসায় ভর্তি হই। লালবাগ মাদরাসার কাছেই ছিল দৈনিক আজাদ পত্রিকার অফিস। আজাদ সে সময়ের নামিদামি পত্রিকা। শিশু-কিশোরদের জন্য বের হতো মুকুলের মাহফিল; সেখানে শুরুতে কবিতা-গল্প লিখেছি। পরে সিরাত-বিষয়ে পত্রিকাটির উপসম্পাদকীয় পাতায় লিখেছি। আমার লেখা দেখে শিক্ষকরা খুশি হয়েছিলেন। দোয়া দিয়েছিলেন। করাচিতে পড়াকালে দৈনিক ইনকিলাবে নিয়মিত লিখতাম। বেশ ভালো সম্মানী পেয়েছিলাম।
শাইখুল ইসলাম মুফতি মুহাম্মাদ তাকি উসমানির দুটি বইয়ের অনুবাদ করলাম সে সময়। বাংলাদেশের একজন বিখ্যাত আলেম প্রকাশক খুব আগ্রহের সঙ্গে নিলেন। তিনি তার সফরে সেটি সঙ্গে রাখলেন, পড়লেনও। এক-দেড় মাস পর পাণ্ডুলিপিটি এক প্রকার নষ্ট করে আমাকে ফেরত দিলেন। ব্যাপারটি আমার পরিবারের লোকজন জানলেন। বিশেষ করে মেজোভাই— তার প্রেস ও কাগজের ব্যবসা ছিল। তিনি বললেন, তুমিই ছাপো। ছাপলাম। বই আকারে প্রকাশ পেল আপন ঘর বাঁচান ও মুমিন-মুনাফিক। আল্লাহতায়ালা আমাকে কুদরতিভাবে প্রকাশক বানিয়ে দিলেন। সেই প্রকাশকের উপেক্ষা ও অবহেলা আমাকে প্রকাশক হতে কিছুটা বাধ্য করেছে। সেই ১৯৯৬ সালে যাত্রা শুরু করে মাকতাবাতুল আশরাফ- এ পর্যন্ত তিন শতাধিক বই প্রকাশ করেছে। ১০ থেকে ১৫ খণ্ডে বইও আছে আমাদের।
খবরের কাগজ: আপনার প্রকাশনী সম্পর্কে কিছু বলুন। কী ধরনের বই প্রকাশে আপনারা আগ্রহী?
মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান: আমি আলেম প্রকাশক। শিক্ষা ও শিক্ষকতার বয়স প্রায় পঞ্চাশ পেরিয়েছি। আমরা একনিষ্ঠতার সঙ্গে দ্বীনি বই প্রকাশ করি। বিশেষ করে তাফসির, হাদিস ও সিরাত। মানুষের আত্মশুদ্ধিমূলক বইপত্রও প্রকাশ করি। হাকিমুল উম্মাত মাওলানা আশরাফ আলি থানভি (রহ.) এক বিস্ময়কর মানুষ— ছেলেবেলা থেকে আমি তার লেখার ভক্ত। তার নামে আমার প্রকাশনীর নাম। থানভি (রহ.), মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.), সাইয়েদ আবুল হাসান আলি নদভি (রহ.), মনজুর নুমানি (রহ.) ও শাইখুল ইসলাম মুফতি মুহাম্মাদ তাকি উসমানিসহ এই ধরনের বুজুর্গ ব্যক্তিদের বই আমরা প্রকাশ করি। আমাদের একটি সেরা কাজ হলো— রিয়াজুস সালেহিনের অনুবাদ। হাদিসের কিতাব হিসেবে সারা বিশ্বে এর কদর রয়েছে। ৯ খণ্ডে অর্ধেক প্রকাশিত হয়েছে এর মধ্যে আরও ছয়-সাত খণ্ড প্রকাশিত হবে। এটি বাংলা ভাষায় যুগান্তকারী একটি কাজ হয়েছে বলে আমি বিশ্বাস করি। আমাদের এখন বড় প্রজেক্ট হলো, মালফুজাতে হাকিমুল উম্মত— এটি ৩২ খণ্ড। এর প্রথম খণ্ড গেল সপ্তাহে ছেপে এসেছে। অমর একুশে বইমেলায় আরেকটি খণ্ড প্রকাশিত হবে।
খবরের কাগজ: মানসম্মত বই প্রকাশে আপনাদের ভূমিকা কেমন?
মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান: বাংলাবাজারে ইসলামি প্রকাশনার সঙ্গে যারা জড়িত, তারা তো স্বীকার করেনই; এমনকি অন্যরাও স্বীকার করেন, মাকতাবাতুল আশরাফ অফসেট পেপারে উন্নত বাইন্ডিং রুচিশীল প্রচ্ছদে মানসম্মত বই প্রকাশে সেরা। আমার প্রথম অনুবাদ দুটি প্রকাশ করে যখন আমার হেফজের শিক্ষক লেখালেখির গুরু হাফেজ খালেদ সাহেবের কাছে নিয়ে গেলাম, কভার দেখে তিনি বললেন, এ তো হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের কভারের মতো হয়েছে। প্রথমে বোর্ড দিয়ে বাঁধাই করে তার ওপর জ্যাকেট লাগানোর প্রচলন, ইসলামি বই অফসেট পেপারে ছাপা, দৃষ্টিনন্দন প্রচ্ছদ এবং উন্নত বাইন্ডিং আমাদের মাধ্যমেই হয়েছে। এর আগে অবশ্য দারুল কিতাবের মালিক মুফতি মুহাম্মাদ উবাইদুল্লাহ সাহেব রুচিশীল বই প্রকাশে ভালো ভূমিকা রেখেছিলেন। আমার সামর্থ্য থাকলে কোরআন-হাদিসের বই সোনা-রুপা দিয়ে ছাপতাম।
খবরের কাগজ: ইসলামি বইয়ের জাগরণের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান: প্রকাশনাজগতে সবচেয়ে বড় সমিতি হলো, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি (বাপুস)। এটা সব ধরনের প্রকাশকদের অন্তর্ভুক্ত করে। কিন্তু ইসলামি প্রকাশকদের শক্তিশালী সংগঠন নেই। বাংলাবাজারে কয়েকটি সংগঠন আছে, কিন্তু সেগুলো নিয়মতান্ত্রিক ও সাংগঠিনক কাঠামোতে তেমন সরব নয়। আমাদের একটি শক্তিশালী সংগঠন হওয়া দরকার। লেখক ও সম্পাদকদের অধিকারে সচেষ্ট হওয়া প্রয়োজন। লেনদেন অনেকে খারাপ করে। অভিযোগও আসে এ নিয়ে। নিয়ম-কানুন থাকলে সুন্দরভাবে সবকিছু সম্পন্ন করা যাবে।
প্রত্যেক শহরে যদি প্রকাশকরা মিলে সম্মিলিত বিক্রয়কেন্দ্র করতে পারেন, যেখানে সব প্রকাশনীর বই থাকবে; তা হলে বেশ ভালো ব্যাপার হবে। একাকী মার্কেটিং করার চেয়ে সম্মিলিত প্রচেষ্টায় করলে ফলপ্রসূ হবে। বিভিন্ন জায়গায় পাঠাগার করা যেতে পারে। ইসলামি বক্তারাও বই পড়া নিয়ে মানুষদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন।
খবরের কাগজ: তরুণ লেখক-প্রকাশকদের জন্য আপনার অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ প্রত্যাশা করছি।
মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান: লেখা ও প্রকাশনা—দুটিই সাধনার বিষয়। সুন্দর সাজানো জিনিস জাতিকে দেওয়ার ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া করা যাবে না। লেখক ও অনুবাদক হতে হলে প্রচুর পড়াশোনা করতে হয়। পরিশ্রম করতে হয়। নিজের লেখা বারবার নিজেকে সম্পাদনা করতে হয়। অভিজ্ঞ লেখক বা সম্পাদকের মাধ্যমে সম্পাদনা করাতে পারলে দিনশেষে একটা ভালো বইয়ের জন্ম হয়। প্রকাশকদেরও মনে রাখতে হবে, পাণ্ডুলিপি পেলেই সঙ্গে সঙ্গে ছাপানো যাবে না। তাড়াহুড়া করা যাবে না। দায়িত্ব নিয়ে ভেবেচিন্তে খেটে সম্পাদনা করে যুৎসই অঙ্গসজ্জা দিয়ে ছাপাতে হবে। লেখদের সঙ্গে উত্তম আচরণ করতে হবে। তাদের সম্মানী যথাসময়ে বুঝিয়ে দিতে হবে। তরুণ লেখক ও প্রকাশদের বলব, এই জায়গায় ধীরেসুস্থে এগিয়ে যেতে হবে। তাড়াহুড়া করা যাবে না। একটি বই একাধিক প্রকাশনী থেকে অনুবাদ করার ব্যাপারটি বন্ধ হওয়া প্রয়োজন। কোনো বইয়ের চাহিদা থাকলেই সেটি সব প্রকাশনীর অনুবাদ করে প্রকাশ করা উচিত নয়। অন্যের হক নষ্ট করে কাজ করা যাবে না।
খবরের কাগজ: লেখক-প্রকাশকের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
মুহাম্মাদ হাবীবুর রহমান খান: লেখক মেধা ও পরিশ্রম দিয়ে একটি বই তৈরি করেন। প্রকাশক সাধ্যমতো সুন্দর মোড়কে বাজারজাত করেন। লেখকের হক এবং সম্মানী যদি যথাযথ দেওয়া না হয়, তা হলে লেখকের হক নষ্ট করা হয়। তাকে অসম্মানিত করা হয়। অনেক প্রকাশক আছেন, লেখকদের থেকে টাকা নিয়ে বই ছাপেন। এটি খুবই বিশ্রী ব্যাপার। বই প্রকাশ হলেই লেখকদের যথাযথ সম্মানটা জানাতে হবে। লেখক-প্রকাশকের চুক্তিটা লিখিত হতে হবে; এটি কোরআনের নির্দেশ।