একটুখানি ভাবুন তো, জীবনের শেষ প্রান্তে এসে যখন শরীর আর চোখ কোনোটিই ঠিকমতো সঙ্গ দেয় না, তখন লাখ লাখ টাকা খরচের হজের সফর কি আদৌ সম্ভব? বিশেষ করে যখন একমাত্র সম্বল বলতে থাকে রাস্তার পাশে বসে ফুটপাতে ঐতিহ্যবাহী খাবার বা জাউ বিক্রি করা! কিন্তু ইচ্ছা আর আল্লাহর প্রতি অবিচল বিশ্বাস থাকলে যে বয়সের জীর্ণতা কিংবা দারিদ্র্য কোনো কিছুই বাধা হতে পারে না, তা প্রমাণ করে বিশ্ববাসীকে তাক লাগিয়ে দিয়েছেন এক মহীয়সী নারী। ফুটপাতে খাবার বিক্রির যৎসামান্য খুচরো পয়সা জমিয়ে ১০৪ বছর বয়সে ২০২৬ সালের সবচেয়ে বয়স্ক হাজি হিসেবে হজের বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন তিনি।
ইন্দোনেশিয়ার পূর্ব জাভার কেদিরি এলাকার বাসিন্দা এমবা মারসিয়াহ। ১৯২১ সালের ১ জুলাই জন্ম নেওয়া এই নারী যখন ২০২১ সালে শতবর্ষ পার করে হজের জন্য নাম নিবন্ধন করেন, তখন অনেকেই হয়তো বিষয়টিকে অসম্ভব ভেবেছিলেন। কিন্তু পর্দার আড়ালের গল্পটা ছিল এক দীর্ঘ সাধনার।
হজ মিডিয়া সেন্টারকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মার্সিয়াহ তার এই দীর্ঘ সংগ্রামের রহস্য উন্মোচন করে বলেন, আমি স্থানীয় বাজারে ও রাস্তার পাশে ঐতিহ্যবাহী জাউ বিক্রি করতাম। সেখান থেকে প্রতিদিন সামান্য যে লাভ হতো, তা অত্যন্ত গোপনে একটি মাটির পাত্রে জমিয়ে রাখতাম। দীর্ঘ সময় ধরে অল্প অল্প করে জমানো এই অর্থই আজ আমাকে কাবার দুয়ারে নিয়ে এসেছে। আর শেষ মুহূর্তে এসে অর্থের সামান্য যা ঘাটতি ছিল, তা আমার ছেলে যোগ করে দিয়েছে।
মার্সিয়াহর এই সফলতার পেছনে সবচেয়ে শিক্ষণীয় এবং নতুন দিকটি হলো তার গোপনীয়তা। বছরের পর বছর ধরে হজের টাকা জমালেও তিনি তার এই স্বপ্ন ও সঞ্চয়ের কথা কাছের কোনো আত্মীয়, প্রতিবেশী বা বন্ধুবান্ধব কাউকেই জানতে দেননি। যখন সঞ্চয়ের পরিমাণ হজের খরচের সমপরিমাণে পৌঁছায়, কেবল তখনই তিনি বিষয়টি প্রকাশ করেন। রিয়া বা লোকদেখানো অহংকার থেকে নিজের নিয়তকে পবিত্র রাখার এই এক অনন্য নববি শিক্ষা।
বয়সের ভারে এখন লাঠির সাহায্য ছাড়া এক কদমও চলতে পারেন না মার্সিয়াহ। তবে হজের অদম্য ইচ্ছা তার শারীরিক অক্ষমতাকে জয় করেছে। ২০২৬ সালের ২২ মে সকালে তিনি ইন্দোনেশিয়ার অনুমোদিত ২ লাখ ২১ হাজার হজযাত্রীর কাফেলার অংশ হিসেবে পবিত্র মক্কা নগরীতে এসে পৌঁছান। সফরে তার সার্বক্ষণিক সঙ্গী হিসেবে আছেন তার ৬৭ বছর বয়সী মেয়ে মুইদাহ। বেশিরভাগ সময় হুইলচেয়ারের সাহায্যে চলাফেরা করলেও ইন্দোনেশিয়ার ১১২তম সুরাবায়া এমবারকেশন গ্রুপের প্রধান আবিসওয়াতুন নাধিরোহ হজের দ্বিতীয় দিনে নিশ্চিত করেছেন যে, ১০৪ বছর বয়সী এই নারী সম্পূর্ণ সুস্থ আছেন এবং হজের প্রতিটি রুকন বা কার্যক্রমে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিচ্ছেন। (তথ্যসূত্র: সৌদি হজ মিডিয়া সেন্টার ও ইন্দোনেশিয়ান এমবারকেশন গ্রুপ রিপোর্ট, মে ২০২৬)
এমবা মার্সিয়াহর এই গল্প আমাদের শেখায় যে, হজের ডাক টাকা বা শারীরিক শক্তির ওপর নির্ভর করে না, বরং তা নির্ভর করে অন্তরের ব্যাকুলতার ওপর। মাটির পাত্রে জমানো জাউ বিক্রির টাকাও যে কাবা শরিফ ছোঁয়ার টিকিট হতে পারে, মার্সিয়াহ তার জীবন্ত প্রমাণ।