দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম—রাহনুমা প্রকাশনীর প্রকাশক। মানসম্মত বই প্রকাশ ও ইসলামি বইয়ের জাগরণের ক্ষেত্রে নানামুখী কাজ করছেন তিনি। কেন প্রকাশক হলেন তিনি, কোন ধরনের বই প্রকাশে তিনি আগ্রহী, ইসলামি বইয়ের জাগরণের ক্ষেত্রে করণীয়, তরুণ প্রকাশক ও লেখকদের জন্য দিকনির্দেশনা এবং লেখক-প্রকাশকের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত—এসব বিষয়ে কথা বলেছেন খবরের কাগজের সঙ্গে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রায়হান রাশেদ
খবরের কাগজ: আপনি প্রকাশক হলেন কেন?
দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম: আমরা যারা কওমি মাদরাসায় পড়েছি, আমাদের অন্যতম একটি বৈশিষ্ট্য হলো, আমরা আমাদের শিক্ষকদের প্রতি অনেক বেশি শ্রদ্ধাশীল। আমার সম্মানিত শিক্ষকদের মাঝে মাওলানা মাসউদুর রহমান (রহ.) ছিলেন একজন উচুঁমানের লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদক। তার বইগুলো বিশেষ করে তারবিয়াতুস সালিক এবং তাবেঈদের ঈমানদীপ্ত জীবন বই দুটি জীবন্ত করা বা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে আমার প্রকাশক হওয়া।
খবরের কাগজ: আপনার প্রকাশনী সম্পর্কে কিছু বলুন। কী ধরনের বই প্রকাশে আপনারা আগ্রহী?
দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম: রাহনুমা প্রকাশনী কওমি ঘরানার প্রকাশনী। শুরু থেকেই আমাদের আকাবির-আসলাফের বইগুলো বেশি গুরুত্ব দিয়ে আসছি আমরা। পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জীবনযাপনে অত্যধিক গুরুত্ব রাখে, এমন সব বই সাধারণত আমরা প্রকাশ করি। তরুণ এবং ছাত্রদের প্রয়োজনের কথাও আমরা বরাবর মনে রেখেছি। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের জন্যও আমাদের বিভিন্ন আয়োজন রয়েছে। আমাদের প্রকাশিত বইয়ের বিষয়বস্তুর মধ্যে রয়েছে, আকিদা ও তাওহিদ, ফিকহ ও মাসয়ালা, সিরাত ও ইতিহাস, আত্মশুদ্ধি ও আখলাক, আধুনিক সমাজ ও ইসলাম, তরুণদের প্রয়োজনীয় বইপুস্তক, আধুনিক ও মোটিভেশনাল বই, ইসলামি সাহিত্যের গল্প-কবিতা-উপন্যাস এবং শিশু-কিশোরদের চরিত্র গঠনমূলক বিভিন্ন বই।
খবরের কাগজ: মানসম্মত বই প্রকাশে আপনাদের ভূমিকা কেমন?
দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম: মানসম্মত বই প্রকাশে আমরা শতভাগ অঙ্গীকারবদ্ধ। সংক্ষেপে যদি বলি—
- বিশুদ্ধ ও প্রামাণ্য বিষয়বস্তু নিশ্চিত করা।
- যাচাই-বাছাইয়ের মাধ্যমে মানসম্পন্ন লেখা নির্বাচন।
- স্পষ্ট ও সহজবোধ্য ভাষায় বই প্রকাশ।
- শরয়ি ও প্রয়োজনীয় সম্পাদনা ও ভাষাগত নির্ভুলতা নিশ্চিত করা।
- সাম্প্রতিক চাহিদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ বই প্রকাশ।
- নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া।
- ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও বিপণন ব্যবস্থার উন্নয়ন।
- পাঠকদের প্রশ্ন ও পরামর্শ গ্রহণ করা।
খবরের কাগজ: ইসলামি বইয়ের জাগরণের ক্ষেত্রে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে?
দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম: ইসলামিক বইয়ের জাগরণ একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক ও সুপরিকল্পিত উদ্যোগের মাধ্যমে হবে। আমরা বাংলাবাজারের অনেক প্রতিষ্ঠানে এর মধ্যে সম্মিলিতভাবে ইসলামি বইয়ের জাগরণের জন্য নানামুখী কার্যক্রম শুরু করেছি। যেমন—
- পাঠকের মধ্যে আগ্রহ তৈরি এবং নতুন নতুন পাঠককে ইসলামি বই পড়ায় উদ্বুদ্ধ করতে গত ছয়-সাত বছর যাবৎ আমরা সারা বাংলাদেশে ইসলামি বইমেলার আয়োজন করছি। সেখানে জ্ঞানগর্ভ কুইজের পাশাপাশি প্রচুর ফ্রি বই উপহার দিচ্ছি।
- ইসলামিক প্রকাশকদের মানোন্নয়ন ও বিভিন্ন বিষয়ে সম্মিলিতভাবে সহযোগিতার চেষ্টা করছি। আমাদের সম্মিলিত চেষ্টায় এবার কম-বেশি ৩০টি প্রতিষ্ঠান ঢাকার একুশে বইমেলায় এবং অনন্ত দশটি প্রতিষ্ঠান চট্টগ্রাম একুশে বইমেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ পেয়েছে। আলহামদুলিল্লাহ।
- আমরা প্রতিনিয়ত নতুন নতুন লেখক তৈরিতে ভূমিকা রাখছি। সবাই মিলে চেষ্টা করছি, আন্তর্জাতিক বইগুলোর পাশাপাশি মৌলিক বইও আগের থেকে বেশি পরিমাণ প্রকাশ করার। শিশু-কিশোর সাহিত্যের যে শূন্যতা রয়েছে, সেটা পূরণে আমরা সবাই মিলে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করেছি এবং আমরা মানসম্মত মুদ্রণ ও ডিজাইনের প্রতি যথেষ্ট পরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে আসছি।
- বইমেলা ছাড়াও সাধারণ মানুষের কাছে বই পৌঁছে দিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক প্রচার চালাতে আমরা অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বিভিন্নভাবে বুক রিভিউ, ইসলামিক স্কলারদের মাধ্যমে ভালো বই পড়ার গুরুত্ব ও আলোচনার ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত আগের থেকে বাড়িয়েছি।
আরও পড়ুন: ইসলামি বইয়ের জাগরণে দরকার প্রতিটি শহরে সম্মিলিত বিক্রয়কেন্দ্র ও পাঠাগার
খবরের কাগজ: তরুণ লেখক-প্রকাশকদের জন্য আপনার অভিজ্ঞতালব্ধ পরামর্শ প্রত্যাশা করছি।
দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম: ইসলামি সাহিত্য ও জ্ঞানচর্চার জগতে নতুন লেখক ও প্রকাশকদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমি মনে করি, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও গুণগত মানের প্রতি দায়বদ্ধতা থাকার পাশাপাশি পাঠকদের মনোযোগ আকর্ষণ এবং সঠিক প্রচারের মাধ্যমে ইসলামিক বই ও জ্ঞানচর্চার জাগরণ ঘটানো সম্ভব।
তরুণ লেখকদের জন্য পরামর্শ হলো,
- জ্ঞানের গভীরতা অর্জনে গভীর পড়াশোনা ও বিশুদ্ধ সূত্র অনুসরণ করুন।
- লেখার দক্ষতা বাড়াতে নিয়মিত লেখালিখি, সহজ ও সাবলীল ভাষা ব্যবহার এবং সম্পাদনার প্রতি গুরুত্ব দিন।
- সময়োপযোগী বিষয়বস্তু বাছাই করে তরুণদের জন্য উপযোগী লেখা তৈরি করুন: বর্তমান প্রজন্মের চিন্তাধারা, সমস্যা ও চাহিদা মাথায় রেখে বই বা প্রবন্ধ লিখুন।
- পাঠকদের মতামত নিন ও বড়দের পরামর্শ গ্রহণ করুন।
তরুণ প্রকাশকদের জন্য পরামর্শ হলো—
- গুণগত মান বজায় রাখতে সঠিক পাণ্ডুলিপি নির্বাচন করুন। ভালো সম্পাদকের কদর করুন। সুন্দর প্রচ্ছদ ও বইয়ের ভেতরের কাজে আন্তর্জাতিক ট্রেন্ড ফলো করুন।
- ইসলামি প্রকাশনা নীতিমালা মেনে চলুন।
- প্রচার ও বিপণনে নতুনত্ব আনতে অফলাইন ও অনলাইন দুই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করুন। দেশব্যাপী সারা বছর বিভিন্ন বইমেলায় অংশগ্রহণ করুন।
- বইয়ের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ভার্সন বা বইয়ের পিডিএফ, ইপাব ও অডিওবুক সংস্করণ তৈরি করুন। ইসলামি প্রচার-প্রচারণার উদ্দেশ্যে বিনামূল্যে কিছু বই বিতরণ করুন।
খবরের কাগজ: লেখক প্রকাশকের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত?
দেওয়ান মো. মাহমুদুল ইসলাম: লেখক ও প্রকাশকের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একজন অপরজনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল, নির্ভরশীল ও সহযোগিতামূলক হওয়া উচিত। একজন লেখক যেমন তার সৃজনশীলতা ও গবেষণার মাধ্যমে মূল্যবান কনটেন্ট তৈরি করেন, তেমনি একজন প্রকাশক সেই লেখাকে পাঠকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্পাদনা, রুচিশীল উপস্থাপনা ও বিপণনের দায়িত্ব নেন। সুতরাং এই সম্পর্ক যত সুদৃঢ় ও পেশাদার হবে, ততই মানসম্পন্ন বই প্রকাশ সম্ভব হবে। এ বিষয়ে যা করা যেতে পারে-
- উভয়ের ভেতর সম্মানজনক ও বিশ্বাসের সম্পর্ক মজবুত করা জরুরি। পাশাপাশি কৃতিত্বের বিষয়টিতে একে অপরের প্রচেষ্টা বড় করে দেখার অভ্যাস তৈরি করতে হবে।
- পেশাদারিত্ব ও চুক্তির স্বচ্ছতায় লেখক-প্রকাশক লিখিত চুক্তি করা এবং তা রক্ষা করা।
- বিপণন ও প্রচারণায় সমন্বয় সাধনে লেখক-প্রকাশক সমান্তরালভাবে পারস্পরিক সহায়তায় ভূমিকা রাখা।