আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে যে অসুস্থ থাকবে অথবা সফরে থাকবে, তার জন্য অন্য সময়ে সে রোজা পূরণ (কাজা আদায়) করে নিতে হবে। আর এটা যাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টদায়ক, তারা এর পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে। যে ব্যক্তি সন্তুষ্টির সঙ্গে সৎকর্ম করবে, তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। (সুরা বাকারা, ১৮৪)
কাজা হলো একটি রোজার পরিবর্তে একটি রোজা রাখা। আর কাফফারা হলো একটির পরিবর্তে বিরামহীনভাবে ৬০টি রোজা রাখা। তবে কাফফারার আরও দুইটি বিকল্প আছে। তা হলো, ৬০টি রোজার পরিবর্তে ৬০ জন গরিব মানুষকে দুইবেলা খাওয়াতে হবে। এ ছাড়া গোলাম মুক্তিকরণেরও একটি মাধ্যম রয়েছে। ফকিহগণ বলেন, বর্তমানে যেহেতু দাসদাসী বা গোলামের প্রচলন নেই, সুতরাং কাফফারার এ বিকল্পটির সুযোগ আর বাকি নেই। উল্লেখ্য, রমজান মাস ছাড়া অন্য সময়ে রোজা ভঙ্গের কোনো কাফফারা নেই, শুধু কাজা আছে।
আর ফিদিয়া হলো, বার্ধক্য বা জটিল কোনো রোগের কারণে যার রোজা রাখার একেবারেই সামর্থ্য নেই এবং পরে কাজা করার সামর্থ্য ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই— এমন ব্যক্তি রোজার পরিবর্তে ফিদিয়া প্রদান করবে। ফিদিয়া হলো, প্রত্যেক রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিন দুইবেলা তৃপ্তিসহ খাবার খাওয়ানো বা এর মূল্য দেওয়া। এক রোজার পরিবর্তে এক ফিদিয়া ওয়াজিব হয়। (আদ-দুররুল মুখতার, ২/৪২৬)
একদা রমজানে এক লোক রাসুলাল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসুলাল্লাহ (সা.)!, আমি নিজেকে ধ্বংস করে ফেলেছি, আমি রোজা পালন অবস্থায় স্ত্রী সহবাস করে ফেলেছি। রাসুলাল্লাহ (সা.) তাকে বললেন, তুমি একজন দাসকে মুক্ত করে দাও। সে বলল, এমন সক্ষমতা আমার নেই। রাসুলাল্লাহ (সা.) বললেন, তবে এর বদলে দুই মাস (৬০ দিন) রোজা রাখো। লোকটি বলল, এমন শারীরিক সক্ষমতা আমার নেই। তখন তিনি (সা.) বললেন, তবে তুমি ৬০ জন মিসকিনকে খাওয়াবে। লোকটি বলল, হে আল্লাহর রাসুল (সা.), এ রকম আর্থিক সক্ষমতাও তো আমার নেই। তখন তিনি (সা.) তাকে অপেক্ষা করতে বললেন। এর কিছুক্ষণ পর কোনো একজন সাহাবি রাসুল (সা.)কে এক ঝুড়ি খেজুর হাদিয়া দিলেন। তখন রাসুলাল্লাহ (সা.) ওই লোকটিকে ডেকে বললেন, এগুলো নিয়ে গিয়ে গরিবদের মধ্যে সদকা করে দাও। লোকটি বলল, ইয়া রাসুলাল্লাহ! এ এলাকায় আমার মতো গরিব আর কে আছে? এ কথা শুনে রাসুলে কারীম (সা.) স্বাভাবিকের চেয়ে একটু বেশি হাসলেন। তিনি বললেন, আচ্ছা, তবে খেজুরগুলো তুমিই তোমার পরিবার নিয়ে খাও। (বুখারি, ১৩৩৭; মুসলিম, ১১১১)।
যেসব কারণে রোজার কাজা আদায় করতে হয়, তা হলো— ১. স্ত্রীকে চুম্বন বা স্পর্শ করার কারণে যদি বীর্যপাত হয়। ২. ইচ্ছাকৃত মুখ ভরে বমি করলে। ৩. পাথরের কণা, লোহার টুকরা, ফলের বিচি গিলে ফেললে। ৪. ডুশ গ্রহণ করলে। ৫. নাকে বা কানে ওষুধ দিলে (যদি তা পেটে পৌঁছে)। ৬. মাথার ক্ষতস্থানে ওষুধ দেওয়ার পর তা যদি মস্তিষ্কে বা পেটে পৌঁছে। ৭. যোনিপথ ব্যতীত অন্য কোনোভাবে সহবাস করার ফলে বীর্য নির্গত হলে। ৮. স্ত্রী লোকের যোনিপথে ওষুধ দিলে। ৯. মুসাফির অবস্থায়। ১০. রোগব্যাধি বৃদ্ধির বেশি আশঙ্কা থাকলে। ১১. মাতৃগর্ভে সন্তানের ক্ষতির আশঙ্কা থাকলে। ১২. এমন ক্ষুধা বা তৃষ্ণা হয়— যাতে মৃত্যুর আশঙ্কা থাকতে পারে। ১৩. শক্তিহীন বৃদ্ধ হলে। ১৪. কোনো রোজাদারকে সাপে দংশন করলে। ১৫. মহিলাদের মাসিক হায়েজ-নেফাসকালীন রোজা ভঙ্গ করা যায়। উল্লিখিত কারণে রমজান মাসে রোজা ভঙ্গ করা যাবে, কিন্তু পরে তা কাজা করতে হবে। আর যেসব কারণে কাজা ও কাফফারা উভয়ই আদায় করতে হয় (অর্থাৎ একটি রোজার পরিবর্তে ১+৬০= ৬১টি রোজা রাখতে হবে) তা হলো, ১. রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃত পানাহার করলে। ২. রোজা অবস্থায় ইচ্ছাকৃতভাবে সহবাস করলে।
লেখক : আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক