একটি সুস্থ ও সুন্দর সমাজের ভিত্তি হলো পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাস। কিন্তু যখন সেই বিশ্বাসে চিড় ধরে, তখন জন্ম নেয় সন্দেহ, সংশয় আর কুধারণা। ইসলামে এই কুধারণা বা খারাপ অনুমানকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে। এটি কেবল একটি পাপই নয়, বরং মানব অন্তরের এক নীরব ব্যাধি, যা সম্পর্কগুলোকে ধীরে ধীরে ধ্বংস করে দেয়। আমাদের মুসলিম সমাজে কুধারণা থেকে মুক্ত থাকা অত্যন্ত জরুরি।
পবিত্র কোরআনে আল্লাহতায়ালা স্পষ্ট ভাষায় মুমিনদেরকে এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন, হে মুমিনগণ, তোমরা অধিক অনুমান থেকে বিরত থাকো। নিশ্চয়ই কোনো কোনো অনুমান পাপ। (সুরা হুজুরাত, ১২)। এই আয়াতে যে অনুমানকে পাপ বলা হয়েছে, তা হলো ভিত্তিহীন বাজে অনুমান বা কুধারণা। কোনো সুস্পষ্ট কারণ বা প্রমাণ ছাড়া একজন মুসলিম সম্পর্কে খারাপ ধারণা করা ইসলামে সম্পূর্ণ অবৈধ। মানুষ জন্মগতভাবে নির্দোষ। তাই সামান্য সন্দেহের বশে কাউকে অভিযুক্ত করা উচিত নয়।
রাসুল (সা.) এ বিষয়টিকে আরও স্পষ্ট করেছেন। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। কেননা, (সুস্পষ্ট কারণ ও প্রমাণ ছাড়া কারও ব্যাপারে খারাপ) ধারণা হলো সবচেয়ে বড় মিথ্যা। (সহিহ বুখারি, ৬০৬৬)
মানুষ হিসেবে আমাদের মনে নানা সময়ে নানা ধরনের বাজে অনুমান আসতে পারে, বিশেষ করে যাদের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো নয়, তাদের ব্যাপারে। কিন্তু মুমিনের কর্তব্য হলো এসব সন্দেহকে মনে বাসা বাঁধতে না দেওয়া। একটি হাদিসে এই সমস্যার সমাধান দেওয়া হয়েছে। হারিসা ইবনু নুমান (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেছেন, তিনটি জিনিস আমার উম্মতের সহজাত বৈশিষ্ট্য—অশুভ লক্ষণ গ্রহণ, হিংসা ও মন্দ ধারণা। তখন এক ব্যক্তি জিজ্ঞাসা করল, হে আল্লাহর রাসুল, কারও মধ্যে এসব বৈশিষ্ট্য থাকলে সেগুলো দূর করার উপায় কী? রাসুল (সা.) উত্তরে বললেন-
১. যখন হিংসা করবে তখন (দেরি না করে দ্রুত) আল্লাহতায়ালার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে।
২. যখন (কারও ব্যাপারে মন্দ) ধারণা করবে তখন সেটাকে (দূর করে দেবে, নিজের অন্তরে তা) প্রতিষ্ঠিত করবে না।
৩. আর যখন কোনো কিছুকে অশুভ মনে করবে তখন (কাজ বন্ধ না করে) চালিয়ে যাবে।
এই হাদিস থেকে আমরা বুঝতে পারি, মনের মধ্যে বাজে ধারণা এলেও তাকে প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না। বরং সঙ্গে সঙ্গে তা মন থেকে ঝেড়ে ফেলতে হবে। কুধারণা কেবল ব্যক্তিগত পাপ নয়, এটি একটি সামাজিক সমস্যা। এটি পারস্পরিক আস্থা নষ্ট করে, সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে এবং মিথ্যাচারকে উৎসাহিত করে। আমাদের প্রত্যেকের উচিত, অন্যের প্রতি সুধারণা পোষণ করা এবং সন্দেহপ্রবণ মনকে পরিশুদ্ধ করা। যখন আমরা একে অপরের প্রতি বিশ্বাস ও সম্মান নিয়ে চলব, তখনই আমাদের সমাজ হবে সত্যিকারের শান্তিময়।