প্রতি বছর ঈদুল আজহার সকালে এমন একটি দৃশ্য প্রায়ই চোখে পড়ে–ঈদের নামাজ তখনো শুরু হয়নি, অথচ পাড়ায় পাড়ায় কোরবানির পশু জবাই শুরু হয়ে গেছে। কেউ হয়তো ভাবছেন তাড়াতাড়ি করলে গোশত বেশি সময় রান্না করা যাবে, কেউ ভাবছেন ভিড় এড়ানো যাবে, কিন্তু এই তাড়াহুড়োর মধ্যে যা হারিয়ে যাচ্ছে–সেটি কোরবানির আসল মর্যাদা।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে নামাজের আগে পশু জবাই করল, সেটা তার পরিবারের জন্য সাধারণ গোশত হলো, যা সে তার পরিবারের জন্য তাড়াতাড়ি করে ফেলেছে।’ (বুখারি, হাদিস: ৯৬৮)। ভাবুন একবার–সারা বছর অপেক্ষা করে এত টাকা খরচ করে পশু কিনলেন, অথচ একটু ধৈর্য না ধরার কারণে সেটা আর কোরবানিই থাকল না। তাই কোরবানির ছুরি তোলার আগে জানুন–ঈদের নামাজের বিধান কী, কখন কোরবানি শুরু করা যাবে, কীভাবে এই মহান ইবাদত সঠিকভাবে আদায় হবে। কারণ সঠিক জ্ঞান ছাড়া সঠিক আমল হয় না।
আরো পড়ুন: ঈদ ও জুমা একই দিনে হলে করণীয় কী?
ঈদ মুসলমানদের জাতীয় উৎসব। শুধু আনন্দের দিন নয়–এটি আল্লাহর প্রতি আনুগত্য, ত্যাগ ও ভালোবাসার এক অনন্য প্রকাশ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন— إن لكل قوم عيدا، وهذا عيدنا
‘প্রত্যেক জাতির নিজস্ব উৎসব আছে, আর ঈদ হলো আমাদের উৎসব।’ (বুখারি, হাদিস: ৯৫২; মুসলিম, হাদিস: ৮৯২) এই হাদিসে গভীর একটি শিক্ষা আছে–মুসলমানের নিজস্ব আদর্শিক পরিচয় থাকতে হবে। এই স্বাতন্ত্র্যবোধ ছাড়া মুসলিম উম্মাহর মর্যাদাপূর্ণ অস্তিত্ব কল্পনাও করা যায় না।
ঈদুল আজহাকে ‘ইয়াওমুন নাহার’ও বলা হয়। আমাদের দেশে এটি ‘কোরবানির ঈদ’ নামে পরিচিত। এই দিনের প্রধান আমল হলো কোরবানি। কোরবানি ইসলামের অন্যতম একটি নিদর্শন। এর মূল হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর সেই অতুলনীয় ত্যাগের আদর্শে–যেখানে একজন পিতা প্রিয় সন্তানকে আল্লাহর রাহে উৎসর্গ করতে এক মুহূর্তও দ্বিধা করেননি। সেই ত্যাগের স্মৃতিকে বুকে ধারণ করেই প্রতিবছর পালিত হয় এই মহান উৎসব। এ কারণেই কোরবানিকে ‘সুন্নাতে ইবরাহিমি’ বলা হয়। পবিত্র কোরআন ও সহিহ হাদিস থেকে বিষয়টি স্পষ্টভাবে জানা যায়।
দুই ঈদের বিষয়ে হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত–রাসুলুল্লাহ (সা.) হিজরত করে মদিনায় আসার পর দেখলেন, মদিনাবাসী দুটি দিনে উৎসব পালন করে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, ‘এ দুটি দিন কী?’ তারা বলল, ‘জাহেলিয়াতের যুগ থেকে এ দিন দুটিতে আমরা উৎসব করে আসছি।’ তখন রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন–إِنّ اللّهَ قَدْ أَبْدَلَكُمْ بِهِمَا خَيْرًا مِنْهُمَا: يَوْمَ الْأَضْحَى، وَيَوْمَ الْفِطْرِ
‘আল্লাহ তোমাদেরকে এ দুটি দিনের পরিবর্তে এর চেয়ে উত্তম দুটি দিন দিয়েছেন–ঈদুল আজহা ও ঈদুল ফিতর।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১১৩৪; নাসায়ি, হাদিস: ১৫৫৬; মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ১২০০৬)
আরো পড়ুন: ঈদুল আজহার আসল সৌন্দর্য কী?
কী অসাধারণ এই বিনিময়! আল্লাহতায়ালা তার বান্দাদের জন্য জাহেলিয়াতের অন্ধকার উৎসব সরিয়ে দিয়ে এমন দুটি দিন দিয়েছেন–যার প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর স্মরণে ভরপুর, প্রতিটি আমল আখিরাতের পাথেয়। এই হাদিসের ব্যাখ্যায় মাওলানা মনজুর নোমানি (রহ.) তার বিখ্যাত কিতাব মাআরিফুল হাদিস-এ লিখেছেন–বিভিন্ন জাতির উৎসব আসলে তাদের বিশ্বাস, চিন্তা ও ঐতিহ্যের প্রতিচ্ছবি।
আল্লাহতায়ালা সেগুলো বাতিল করে এই উম্মতের জন্য ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা নির্ধারণ করে দিয়েছেন–যা তাওহিদি জীবনধারার সঙ্গে সম্পূর্ণ সামঞ্জস্যপূর্ণ। ঈদুল আজহা তাই কেবল পশু জবাইয়ের দিন নয়–এটি আত্মার কোরবানির দিন। নফসের চাওয়া-পাওয়াকে আল্লাহর ইচ্ছার সামনে বিসর্জন দেওয়ার দিন। যে মুমিন এই চেতনায় ঈদ পালন করেন, তার জীবনে এই দিনটি শুধু আনন্দের নয়–আত্মশুদ্ধির এক মহাসুযোগ।
ঈদুল আজহা আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশিত আমল। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى، جَعَلَهُ اللهُ عِيدًا لِهَذِهِ الْأُمّةِ ‘আমাকে ইয়াওমুল আজহায় কোরবানির আদেশ করা হয়েছে। এ দিনকে আল্লাহতায়ালা এই উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন।’ (মুসনাদে আহমাদ, হাদিস: ৬৫৭৫; সহিহ ইবনে হিব্বান, হাদিস: ৫৯১৪; আবু দাউদ, হাদিস: ২৭৮৯; নাসায়ি, হাদিস: ৪৩৬৫)। যে উৎসব স্বয়ং আল্লাহ দিয়েছেন–সেই উৎসবের মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি মুমিনের দায়িত্ব।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক