স্বাধীনতাপূর্ব তৎকালীন পাকিস্তান শাসনামল থেকে জামালপুরে গ্রন্থাগারের ইতিহাস পাওয়া যায়। বর্তমানে যা জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার নামে পরিচালিত হচ্ছে। শুরুতে ঘর ভাড়া নিয়ে গ্রন্থাগার পরিচালিত হলেও রয়েছে একতলাবিশিষ্ট নিজস্ব ভবন। তবে এক বছরেরও কম সময় নিয়ে নির্মিত এই ভবনের মেঝে ও সামনের খোলা অংশ ইতোমধ্যেই মাটিতে দেবে গেছে। তা ছাড়া গ্রন্থাগারে পর্যাপ্ত বইয়ের সংগ্রহ থাকলেও রয়েছে পাঠক স্বল্পতা।
১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে থেকেই জামালপুরে এই গ্রন্থাগারটি ছিল। ‘পাকিস্তান কাউন্সিল’ থেকে ‘বাংলাদেশ পরিষদ’ এবং বর্তমানে ‘জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার’ নামে ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম চলমান। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর থেকে ১৯৮২ সালের ৩১ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি ‘বাংলাদেশ পরিষদ, জামালপুর’ নামে বেসরকারিভাবে পাঠসেবা কার্যক্রম চালায়। ১৯৮২ সালের ১ সেপ্টেম্বর গ্রন্থাগারটি সরকারীকরণ করে ‘জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগার, জামালপুর’ নামকরণ করা হয়। ২০১২ সালে নিজস্ব ভবনে স্থানান্তরের আগ পর্যন্ত শহরের আমলাপাড়া এলাকায় বাড়ি ভাড়া নিয়ে চলত এই গণগ্রন্থাগারের কার্যক্রম।
এরপর শহরের শহিদ হারুন সড়কে ৩৩ শতক জায়গা অধিগ্রহণ করে জেলা পাবলিক লাইব্রেরিগুলোর উন্নয়ন (তৃতীয় পর্যায়) প্রকল্পের আওতায় জামালপুরে ২০১১ সালে জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারের ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয়। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অধিগ্রহণ করা জায়গাটিতে একটি ডোবা ছিল। সেপ্টেম্বরে সেখানে ভবন নির্মাণকাজ শুরু হয় এবং তিনতলা ভিতের ওপর একতলা ভবনের নির্মাণকাজ শেষ হয় পরের বছর ২০১২ সালের জুন মাসে। মাত্র ১০ মাসে নির্মাণকাজ শেষ করে ১ জুলাই নতুন ভবনে কার্যক্রম শুরু করে জেলা গণগ্রন্থাগার। কিন্তু গত ১৩ বছরেই নতুন এই ভবনটির বেহালদশা। গণগ্রন্থাগারের বাইরে প্রধান ফটকের খুব কাছেই রয়েছে উন্মুক্ত ডাস্টবিন, যেখানে স্থানীয়রা প্রতিনিয়ত ময়লা-আবর্জনা নিক্ষেপ করে। ভবনের ভেতর পাঠকক্ষে পর্যন্ত এর দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা গেছে, গণগ্রন্থাগারের ভবনের সামনে খোলা অংশের বেশখানিকটা মাটিতে দেবে গিয়ে নিচু হয়ে গেছে, এখানে বর্ষায় পানি জমে থাকে। প্রতি বছরই একটু একটু করে ভবনের মেঝে ও ভবনের সামনের খোলা অংশ দেবে যাচ্ছে। মূল ভবনে প্রবেশের সিঁড়ি দেবে গিয়ে একদিকে কাত হয়ে গেছে ও ভেতরের মেঝেও নিচু হয়ে গেছে। একতলা ভবনে স্থান সংকুলান না হওয়ায় পাঠকদের বই পড়ার জন্য মূল গ্রন্থাগারটি পরিচালিত হয় ভবনের মিলনায়তন কক্ষে। মিলনায়তন কক্ষের মঞ্চটিও অনেকাংশে দেবে নিচু হয়ে গেছে। এদিকে ভবনের বাইরের দেয়াল ও সীমানা প্রাচীরের পলেস্তারা খসে পড়ায় ভবনটির অবস্থা অনেকটাই জরাজীর্ণ।
এ ছাড়া গ্রন্থাগারের পর্যাপ্ত চেয়ার-টেবিলসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা থাকলেও পাঠকের সংখ্যা খুবই কম। জানা গেছে, জেলার প্রাণকেন্দ্রে গ্রন্থাগারটি অবস্থিত হলেও আশপাশে তেমন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় রয়েছে পাঠকস্বল্পতা। নতুন ভবনে ২০১২ সালে যাত্রা শুরুর সময় গণগ্রন্থাগারে বইয়ের সংগ্রহ ছিল ২৪ হাজার ১৪৮টি, বর্তমানে এখানে বইয়ের সংগ্রহ রয়েছে ৪৩ হাজার ৮৪টি। ২০২১ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নতুন করে বই সংগ্রহ করা হয়েছে ৪ হাজার ১৭৩টি। এ পর্যন্ত হারানো বইয়ের সংখ্যা ৪ হাজার ৭৬১টি ও পড়ার অনুপযোগী বা নষ্ট বইয়ের সংখ্যা ২৮২টি। এই পাঠাগারে শিশুসহ নিবন্ধিত পাঠক সংখ্যা মাত্র ৭৫ জন। তবে এর বাইরেও কিছু পাঠক পড়তে আসেন।
সম্প্রতি গণগ্রন্থাগারে গিয়ে দেখা যায়, যে কজন পাঠক নিয়মিত আসেন তাদের মধ্যে চাকরিপ্রত্যাশীই বেশি। শহরের মুসলিমাবাদ এলাকার সুজন মিয়া (৩০) বলেন, ‘আমি ২০১৪ সাল থেকে নিয়মিত পাঠক, তবে পাঠাগারের প্রাণ পুরনো বইয়ের সংখ্যা কম, নতুন বই এলে পুরনো বই সরিয়ে রাখা হয়। আমি এখন চাকরিপ্রত্যাশী হিসেবে পড়ি, তবে অন্যান্য বইও পড়া হয়। ভবনের বাইরের ডাস্টবিনে ময়লা-আবর্জনা ফেলার কারণে অনেক সময় দুর্গন্ধ ছড়ায়, যা আমাদের পীড়া দেয়। মেঝে দেবে যাওয়ায় আমরা কিছুটা শঙ্কায় থাকি, যদি হঠাৎ ভূমিকম্পে কিছু হয়ে যায়!’
চাকরিপ্রত্যাশী নির্বাচন পালও, রেবেকা সুলতানাসহ কয়েকজন পাঠক বলেন, ‘প্রতিদিন গড়ে ৩০-৩৫ জন বিভিন্ন বয়সের পাঠক এখানে বই পড়তে আসেন। আমরা চাকরির প্রস্তুতি নিতে পড়াশোনা করি। পাশাপাশি গল্প-উপন্যাসও পড়ি। আমাদের চাহিদামতো প্রায় সব বই রয়েছে। নিরিবিলি ও পাঠ উপযোগী পরিবেশ হলেও একতলা ভবনের কারণে গরমকালে কিছুটা কষ্ট হয়।
ভবনটির স্টোররুম সংস্কার করে ২০২৩ সালে সুসজ্জিত রূপে গড়ে তোলা হয়েছে শিশু কর্নার। সেখানে শিশুদের পাঠাভ্যাস সৃষ্টিতে তাদের উপযোগী চেয়ার-টেবিল, বইয়ের পাশাপাশি রাখা হয়েছে খেলাধুলা ও বিনোদনের ব্যবস্থা। শিশু কর্নারে আগত স্থানীয় কয়েকজন শিশু পাঠক মিম ও স্ফটিক বলে, ‘স্কুলের অন্য শিক্ষার্থীদের মুখে শুনে প্রথমবারের মতো আমরা এখানে এসেছি। অনেক খেলনা আর বই দেখে আমাদের ভালো লেগেছে।’ শিশু রিফাত, আল জারা, রতি ও রমজান বলে, ‘স্কুল ছুটির পর আমরা নিয়মিত এখানে আসি। আমরা এখানে খেলাধুলা ও বই পড়তে পারি।
ভাষা ও স্বাধীনতা সংগ্রামী মতি মিয়া ফাউন্ডেশন পাঠাগারের সাধারণ সম্পাদক একেএম আশরাফুজ্জামান স্বাধীন বলেন, ‘এক সময় গ্রন্থাগারকেন্দ্রিক ও বিভিন্ন সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। তখন সেসব প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে গ্রন্থাগারে গিয়ে বই পড়ে নিজেকে প্রস্তুত করতে হতো। এখন মোবাইল ফোনে সার্চ করে সহজেই বিভিন্ন বই পড়া বা তথ্য জানার সহজলভ্যের কারণে পাঠক কমে গেছে। তাই শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি স্কুল-কলেজসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সামাজিকভাবে ও ব্যক্তি উদ্যোগে সৃজনশীল প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে হবে। জেলা সরকারি গণগ্রন্থাগারটির ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে পাঠক সংখ্যা কম। এত অল্প সময়ে ভবনের এই ত্রুটির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে আনা উচিত।’
জামালপুর জেলা গণগ্রন্থাগারের সহকারী লাইব্রেরিয়ান রামেন্দ্র সরকার সুমিত বলেন, ‘লাইব্রেরিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে দূরে হওয়ায় আমাদের পাঠক সংখ্যা কম। বিভিন্ন স্কুল-কলেজে গিয়ে পাঠক বৃদ্ধির চেষ্টা করছি। প্রতি মাসে গড়ে ১ হাজার ১০০ জন পাঠক এখানে পড়েন। এ ছাড়া ভবনের মেঝে দেবে যাওয়ায় উইপোকার আক্রমণে বই নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বইয়ের তাক কাত হয়ে পড়ে গিয়ে পাঠক আহত হওয়ার আশঙ্কাও আছে। ভবন মেরামত ও সংস্কারের জন্যে কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। স্থানীয় গণপূর্ত বিভাগের প্রকৌশলীরা গত বছর ভবন পরিদর্শন করে জানিয়েছেন, ডোবার ওপর ভবন নির্মিত হওয়ায় মেঝে দেবে গেছে, কিন্তু ভিতে কোনো সমস্যা হয়নি।’
তিনি আরও জানান, এখানে চাকরিপ্রত্যাশীরা কম আসেন, মননশীল পাঠকরাই বই পড়ার জন্য আসেন। পরিবেশ সুন্দর করতে একাধিকবার বাগান করা হয়েছিল, কিন্তু নৈশপ্রহরী না থাকায় বাগান ও ভবনের বাইরের অনেক জিনিস নষ্ট বা চুরি হয়ে গেছে। আগে ময়লা-আবর্জনা ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকত; এখন ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছে। তবে গণগ্রন্থাগারের সামনে ডাস্টবিন থাকা উচিত না। এ ছাড়া সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ ৯ জন জনবলের পদ থাকলেও বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র তিনজন।