স্বাধীন বাংলাদেশ ৫৫ বছরে পা রাখল। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে মত ও পথের যত ব্যবধানই থাক না কেন, দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও বিজয়ের প্রশ্নে কোনো মতদ্বৈততা কিংবা বিতর্ক থাকা উচিত নয়। বাংলাদেশের এই স্বাধীনতা খুব সহজে অর্জিত হয়নি। প্রায় ৩০ লাখ শহিদের এক সাগর রক্ত এবং প্রায় ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই মহান স্বাধীনতা। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টির পেছনে ২৩ বছরের বহু ত্যাগ, দীর্ঘ সংগ্রাম ও অনেক কান্না এবং বেদনার ইতিহাস জড়িয়ে আছে। এ কথা অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মুক্তিযুদ্ধ হুটহাট শুরু হয়নি। দেশবিভাগের পর কর্তৃত্ববাদী পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব-পাকিস্তানের জনগণ, অর্থনীতি, উন্নয়ন, চাকরি, ব্যবসা-বাণিজ্য, ভাষা এবং সংস্কৃতির প্রতি যে বৈষম্যমূলক আচরণ করেছিল তার ফলে অসন্তোষ দানা বাঁধে। ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা, গণ-অভ্যুথান এবং শেষ অবধি অধিকারবঞ্চিত জনগণের আন্দেলনে বিস্ফোরণ ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ। প্রতিবাদী মানুষ অস্ত্র হাতে পথে নেমে এসেছিল। বিজয় অর্জনের পাশাপাশি, নয় মাসব্যাপী রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং সামাজিক সুবিচার প্রতিষ্ঠা।
যেভাবে ১৯৪৭ সালে ১৪ ও ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে পাকিস্তান ও ভারত মুক্তি লাভ করেছিল কিংবা আলাদা হয়েছিল, সেভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়নি। ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম শুরু হয়েছিল ১৯৪৮ সালের ভাষা আন্দোলনের মধ্যদিয়ে। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে উপমহাদেশের দুই প্রান্তে অবস্থিত দেড় হাজার মাইল ব্যবধানের দুই অঞ্চলের জোড়া লাগানো পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই সুবিধাবাদী রাজনীতিবিদ কায়েমি স্বার্থবাদী আমলা চক্র ও উচ্চাভিলাসী সামরিকজান্তার ধর্মীয় লেবাসে অগণতান্ত্রিক শাসন ও শোষণের প্রথম ও প্রত্যক্ষ আক্রমণ আসে বাংলা ভাষার ওপর। তখন থেকেই অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ আন্দোলন শুরু। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি পাকিস্তানি শাসনের প্রথম বলির শিকার হন ভাষা শহিদ রফিক, জব্বার, সালাম, বরকত প্রমুখ। ১৯৫৪ সালের মুসলিম লীগের বিরুদ্ধে যুক্তফ্রন্টের ২১ দফার জয়লাভ, ১৯৫৮ সালের আইয়ুব খানের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন থেকে ১৯৬৬ সালের ৬ দফা আন্দোলন, ১১ দফা দাবিতে ১৯৬৯ সালের ছাত্র গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণ-আন্দোলন ছিল মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তিভূমি। আমাদের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপটটি নানা কারণে গৌরবান্বিত। মানুষকে উদ্বুদ্ধ করে, তাদের প্রেরণা দিয়ে, সাহস দিয়ে একটা চূড়ান্ত বোঝাপড়ার দিকে নিয়ে যাওয়ার কৃতিত্ব যাদের, তাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তার সঙ্গে ছিলেন অনেক রাজনৈতিক নেতা। ছিলেন শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ব্যক্তিসহ বিভিন্ন পেশার আরও অনেক মানুষ। মূলত ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ছিল বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ।
বাংলাদেশের বিজয় নিশ্চিত করার জন্য এই দেশের সব ধর্ম-বর্ণ ও শ্রেণি-পেশার মানুষ ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। জীবন বাজি রেখে অসংখ্য আত্মত্যাগের মধ্যদিয়ে আমাদের এই বিজয় ধরা দিয়েছিল। সাধারণ মানুষের কতগুলো সাধারণ স্বপ্ন ও প্রত্যাশার ভিত্তিতে নিজেদের জীবন বাজি রেখেছিল। মুক্তিযুদ্ধের আগের ধারাবাহিক আন্দোলন ও ঐতিহাসিক ঘটনাধারা এবং মুক্তিযুদ্ধের মধ্যদিয়ে সবার মধ্যে একটা অলিখিত দায়বদ্ধতা তৈরি হয়েছিল। এ কারণেই দেশের আনাচে-কানাচে, এ মাটির প্রতিটি অংশে প্রবল প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল পাকিস্তানি হানাদাররা। একাত্তরের সেই অগ্নিঝরা দিনগুলো দেখার সৌভাগ্য যাদের হয়েছিল তারাই জানেন কত অশ্রু, রক্ত আর ঘামে ভরা ছিল সেসব দিন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক ‘বেলুচিস্তানের কসাই’খ্যাত টিক্কা খান তার বাহিনীকে সদম্ভে বলেছিলেন, ‘এ দেশের মানুষের দরকার নেই আমার। দরকার কেবল মাটি।’ টিক্কার বিশ্বস্ত সেনাপতি রাও ফরমান আলী ও জাহানজেব আরবাবের নেতৃত্বে পাকিস্তানিরা এই বাংলাদেশে এমন নির্মম গণহত্যা চালিয়েছিল- এমন ইতিহাসে দেখা যায়নি। রাও ফরমান আলী তার দিনলিপিতে ‘পূর্ব পাকিস্তানের সবুজ মাটিকে রক্তে লাল’ করে দেওয়ার অঙ্গীকার করেছিল। মুক্তিযুদ্ধের নয় মাসে বর্বর পাকিস্তানিরা সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে চেষ্টার ত্রুটি করেনি। তবু এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বীর বাঙালি ছিনিয়ে এনেছিল স্বাধীনতার লাল সূর্য।
স্বাধীনতার ৫৪ বছরেও আমাদের প্রাপ্তি থেকে অপ্রাপ্তি ও হতাশার পাল্লাটা বেশ ভারী। দীর্ঘ সময় অতিক্রম করেও জনগণের শতভাগ মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার নিশ্চিতকরণে ব্যর্থ। আর আমরা প্রতি বছরই স্বাধীনতার এই মাসকে বিশেষ মর্যাদায় রাখি। সবাই নিজ নিজ জায়গা থেকে উদযাপন করি এবং সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু উদযাপনটি কেবল ভক্তি-শ্রদ্ধার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে আমরা লক্ষচ্যুত হব, বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উদ্দেশ্য হয়ে যাবে অবহেলিত। আজকের প্রজন্মকে জানাতে হবে কেন আমরা পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে থাকতে পারিনি। কোন স্বপ্ন সামনে রেখে এ দেশের দামাল ছেলেরা যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এবং সে স্বপ্নের প্রকৃত বাস্তবায়ন কতটুকু হয়েছে। আমাদের প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির ফারাক কতখানি।
আর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, রাষ্ট্র আয়ত্তাধীন সেবাখাতগুলোর অবস্থা খুব নাজুক, যা আমাদের স্বাধীনতার স্বাদকে ভূলুণ্ঠিত করে। আমাদের সমসাময়িক স্বাধীনতা অর্জনকারী দেশের তুলনায় আমরা অনেক পিছিয়ে আছি। দুর্নীতিমুক্ত, সন্ত্রাসমুক্ত, মাদকমুক্ত, স্বনির্ভর, সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্র না গঠন করতে পারলে আবার প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে পরাধীনতার অগ্নিকুণ্ডে পতিত হতে হবে। তাই স্বাধীনতার মাসে তরুণদের দৃঢ় সংকল্প হওয়া উচিত, রাষ্ট্র ও জনগণের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় সুন্দর, সমৃদ্ধশালী, স্বনির্ভর, দুর্নীতিমুক্ত, সত্যিকারের স্বাধীন দেশ গঠন করা।
বাংলাদেশের জন্ম নিয়ে সঠিক ইতহাস না জানা কিছু তরুণ প্রজন্মের হতাশাবোধ দেখে বিস্মিত হয়ে যাই। তাদের মধ্যে হতাশার কথা শুনি, তাদের প্রকাশ আমাদের অবাক ও বিষণ্ন করে। তরুণদের মনোজগতে বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও দর্শনের কার্যকারিতা সম্পর্কে আমাদের আরও কাজ করতে হবে। নতুন প্রজন্ম আদর্শিকভাবে হারিয়ে না যায়, জাতিগতভাবেও আমাদের অনেক কিছু করতে হবে তরুণদের জন্য। সব দেশে সব সময় তরুণ প্রজন্মের হাত ধরেই রাষ্ট্র বিকশিত ও প্রগতিশীলতার দিকে এগিয়ে যায়। স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টিতেও তরুণ প্রজন্মের অবদান অনন্য।
পরিশেষে বলতে চাই, আমরা মহান মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জন করেছি। আমরা বিজয়ী এবং স্বাধীন জাতি। বিজয়ী জাতি হিসেবে বিশ্বের দরবারে কারও কাছে আমরা মাথা নত করব না। আমাদের যতটুকু সম্পদ, সেই সম্পদটুকু কাজে লাগিয়েই আমরা বিশ্বসভায় আমাদের নিজেদের আপন মহিমায় আমরা গৌরবান্বিত হব, নিজেদের গড়ে তুলব এবং সারা বিশ্বের কাছে আমরা মাথা উঁচু করে চলব। এটাই হবে এ দেশের মানুষের জন্য সবদিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এভাবেই এগিয়ে যাবে আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।
ইমেইল: [email protected]