ব্রিটিশ লেখক ও উপন্যাসিক জর্জ অরওয়েল বলেছেন, ষড়যন্ত্রের সবচেয়ে বড় অস্ত্র হচ্ছে সত্যকে আড়াল করা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য নির্বাচনই যে সবচেয়ে উত্তম পথ, এ সত্যটিই কিছুদিন আগ পর্যন্ত নানা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব দিয়ে আড়াল করে রাখা হয়েছিল। আর হবে না বা কেন? কথায় আছে, রাজনীতি আর সন্দেহ মাসতুতো ভাই।
কিন্তু অবশেষে সব সন্দেহ, অবিশ্বাস এবং ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব মিথ্যা প্রমাণ করে নির্বাচনের পথে হাঁটতে শুরু করেছে দেশ। কথা রেখেছে সরকার। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস নির্বাচনের সময় ঘোষণা করেছেন। শুধু তা-ই নয়; গত ৫ আগস্ট এই ঘোষণার পরের দিনই তিনি নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিবকে চিঠি দিয়ে নির্বাচন আয়োজনের সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে নির্দেশনা দিয়েছেন। এই দুই ঘটনায় নির্বাচন নিয়ে কয়েক মাস ধরে চলা সন্দেহ-অবিশ্বাস দূর হয়েছে। জনমনে স্বস্তি ফিরেছে। দেশের প্রায় সব রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ব্যবসায়ী সমাজও সরকারের সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. দিলারা চৌধুরী বলেন, ‘আমি নির্বাচন চাই। কারণ নির্বাচন ছাড়া সংকট থেকে বেরিয়ে আসার আর কোনো উপায় নেই। তবে সঙ্গে এটাও বলব যে এক বছর সময় ক্ষেপণের পর আগামী ছয় মাসের মধ্যে নির্বাচনের প্রয়োজনীয় পরিবেশ তৈরি করতে সরকার পারবে কি না, সে ব্যাপারে সন্দেহ রয়ে গেছে। দ্বিতীয়ত, এখনো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়নি এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর শুদ্ধীকরণ হয়নি।
অধ্যাপক ড. মাহবুব উল্লাহ মনে করেন, নির্বাচন নিয়ে সরকারের ঘোষণায় সাময়িকভাবে জনমনে স্বস্তি ফিরেছে। তবে ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব পুরোপুরি শেষ হয়েছে এটি বলা যাবে না। নতুনভাবে নতুন আঙ্গিকে আসবে না তার নিশ্চয়তা নেই। তিনি বলেন, অধ্যাপক ইউনূস নিজেই বলেছিলেন নির্বাচন নিয়ে ষড়যন্ত্র হচ্ছে। সেই ষড়যন্ত্র উৎপাটিত হয়েছে কি না, সেটি বোঝা দরকার। তা ছাড়া ষড়যন্ত্র কী ছিল, সেটিও জনগণের জানার অধিকার আছে। সরকার এ বিষয়ে খোলামেলাভাবে জানালে জনগণ সরকারের পাশে দাঁড়াতে পারে।
গত বছরের ৮ আগস্ট অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তবর্তী সরকার গঠনের কিছুদিন পর থেকে নির্বাচন নিয়ে সন্দেহ-অবিশ্বাস শুরু হয়। এর একটি বড় কারণ ছিল, বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং পরে এনসিপিকে গুরুত্ব দেওয়া। ড. ইউনূস একবার বলেছিলেন, ‘ছাত্ররা আমার নিয়োগকর্তা। তারা যখন বলবে আমরা চলে যাব। সংস্কারসহ বিভিন্ন ইস্যুতে এনসিপি ও জামায়াতের সঙ্গে দেশের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বিএনপির বিরোধের কারণে পরিস্থিতি গত এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত এই চার মাসে ঘোলাটে হয়ে ওঠে। আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব বা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ কয়েকটি ইস্যুতে ওই তিনটি দলের পাশাপাশি চরমোনাই পীরের ইসলামী শাসনতন্ত্র আন্দোলনও বিএনপির বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। এর ফলে দেশে একধরনের সংঘাতময় পরিস্থিতি তৈরি হয়। এ ছাড়া ‘মব ভায়োলেন্স’ এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দখল ও চাঁদাবাজির ঘটনায় পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। এমন পরিস্থিতিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে বিএনপিও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেনের শপথ গ্রহণ এবং দুই ছাত্র উপদেষ্টার পদত্যাগের দাবিতে সরকারের ওপরে চাপ বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করে। ওই পরিস্থিতির পর নানা ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব চালু হয়। বলা হয়, নানা অজুহাত তুলে সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করতে চাইছে। টকশোতে আলোচনা হয়, ছাত্র-প্রতিনিধিসহ সরকারের কিছু উপদেষ্টা নির্বাচন দিতে আগ্রহী নন। এনসিপির পাশাপাশি জামায়াতও অন্য দলগুলোর সঙ্গে সুর মিলিয়ে জানায়, সংস্কার না হলে দেশে কোনো নির্বাচন হবে না। এমন পরিস্থিতিতে গুঞ্জন তৈরি হয়, চলমান অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে নির্বাচন সম্ভব নয়। এমনকি আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনও অস্বাভাবিক নয় বলে কেউ কেউ অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বলাবলি শুরু করেন।
অবশ্য এসব গুঞ্জন ও ষড়যন্ত্র তত্ত্বের কিছুটা অবসান ঘটে গত ১৩ জুন লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মধ্যে বৈঠকের পর। ওই বৈঠকে নির্বাচনের সম্ভাব্য দিনক্ষণ নিয়ে আলোচনা ওঠে। তারেক রহমান আগামী রমজানের আগে ভোটের প্রস্তাব করলে ড. ইউনূস তাতে সম্মতি জানিয়ে বলেন, সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে রমজানের আগেই নির্বাচন করা সম্ভব। বস্তুত, ওই বৈঠকের মধ্য দিয়ে ড. ইউনূসের সঙ্গে তারেক রহমানের আস্থার সম্পর্ক তৈরি হয়। দুই নেতা সম্মত হন যে, কোনো বিষয়ে সমস্যা বা ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হলে তারা আলোচনা করে নেবেন।
বৈঠকের পর জনমনে কিছুটা স্বস্তি তৈরি হলেও এনসিপি, জামায়াতসহ কয়েকটি দল এতে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করে। জামায়াত জানায়, ওই বৈঠকে ড. ইউনূসের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়েছে।
অবশ্য পরে জামায়াত আস্তে আস্তে ওই অবস্থান থেকে সরে আসে। তবে পিআর পদ্ধতি নিয়ে এনসিপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন বিএনপি ও সরকারের ওপরে চাপ অব্যাহত রাখে। দলগুলো পৃথক পৃথকভাবে নগরীতে শোডাউন করে। বিএনপিও এর বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য অব্যাহত রাখে। পাশাপাশি সংস্কার নিয়েও বিতর্ক অব্যাহত থাকে।
তবে শেখ হাসিনার সরকারবিরোধী আন্দোলনে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে এমন বিরোধে শুভাকাঙ্ক্ষী সুধী সমাজের প্রতিনিধিরা চিন্তিত হয়ে পড়েন। ভেতরে ভেতরে তারা দলগুলোর মধ্যে বিরোধ নিরসনের উদ্যোগ নেন। বোঝানোর চেষ্টা করেন যে, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বিরোধ বা সংঘাত তৈরি হলে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সুযোগ নেবে। নানামুখী এই বিরোধে তৃতীয় শক্তির উত্থানের গুজবও ছড়িয়ে পড়ে। পাশাপাশি ভূ-রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ সামনে নিয়ে সরকারের নিরাপদ প্রস্থানের বিষয়টি নিয়েও তারা আলোচনা করেন।
আমেরিকান শিক্ষাবিদ ও রাজনীতিবিদ বারবারা চার্লিন জর্ডানের কথা দিয়েই শেষ করতে চাই। তিনি বলেছেন, ‘এত অনিশ্চয়তার পরও আমরা ভবিষ্যৎ থেকে পালাতে পারি না। তাই তো সবদিক বিবেচনা করে সরকার ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের সময়সীমা ঠিক করেন। ফলে নির্বাচন নিয়ে কিছুদিন আগ পর্যন্ত যে সন্দেহ-অবিশ্বাস পুরো জাতিকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল তা দূর হয়েছে।